ঢাকা, মঙ্গলবার 10 April 2018, ২৭ চৈত্র ১৪২৪, ২২ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কারাগারের বিরূপ ও নিপীড়নমূলক পরিবেশে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়েছে খালেদা জিয়ার

 

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে বিরূপ ও নিপীড়নমূলক পরিবেশে রাখার ফলে তার আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি বিভাগের সাবেক ডিন প্রফেসর ডা. সাইফুল ইসলাম। এছাড়া স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে রাখার ফলে বেগম জিয়ার ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম শূন্যতা দেখা দিতে পারে, যা তার হাড়ের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলেও তিনি জানান। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) গোলটেবিল মিলনায়তনে গতকাল সোমবার সকালে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক এক প্রেস কনফারেন্সে তিনি এসব কথা বলেন। বিশিষ্ট চিকিৎসক সমাজের ব্যানারে কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ড্যাব মহাসচিব প্রফেসর ডাঃ এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

লিখিত বক্তব্যে ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, বিগত কয়েক বছরে দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট গেল দু’ মাসে ক্রমশ ঘনীভূত হতে শুরু করেছে। একটি মহাদুর্যোগ সমাগত বলে অনেকেই আশংকা করছেন। বাংলাদেশের তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্রের ইতিহাস ও ভোটের রাজনীতিতে জনপ্রিয়তায় বিশ^ ইতিহাসে ক্রমাগত পরাজয়হীন সর্বোচ্চ ২৩টি আসনে বিজয়ের অনন্যদৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী, গণমানুষের অবিসংবাদিত নেত্রী ও দেশনেত্রী উপাধিপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ জোর দাবি করছেন এই মামলা মিথ্যা, বানোয়াট, প্রহসনমূলক ও প্রকৃত বাস্তবতায় সাজাপ্রাপ্তের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণহীন। তার তিন দশকের ভূমিকা বাংলাদেশকে আজ এক ঈর্ষাজনক উন্নতির অভিযাত্রায় শামিল করেছে। সেই মানুষটির সাথে কারাগারে নিদারুণ অমানবিক ও মানবেতর আচরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে নানা মহল থেকে।

তিনি বলেন, বেগম জিয়াকে একটি সূর্যালোকহীন, নির্জন, স্যাঁতস্যেঁতে পুরোনো ও বসবাস অযোগ্য ভবনে রাখা হয়েছে। ডিভিশন দেয়া হলেও বলা হচ্ছে যে তার বিছানা, বালিশ ও আসবাবও অত্যন্ত নি¤œমানের ও ব্যবহার অযোগ্য। একজন অসুস্থ মানুষ হিসাবে তার খাদ্য-খাবারের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কেউ কেউ তার এই বন্দী অবস্থাকে বীভৎস নির্যাতনের প্রতীক কনসানট্রেশন ক্যাম্পের সাথে তুলনীয় বলে মনে করছেন। এই পরিবেশে একজন সুস্থ মানুষেরও নানা মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে তারমত আগে থেকেই বয়সজনিত নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত একজন বর্ষিয়ান নারীর এই নির্জন মানবেতর করাবাস স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য কতটা ক্ষতিকারক হতে পারে তা’ সাধারণ মানুষকেও গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। এই পিচ্ছিল স্যাঁতসে্যঁতে পরিবেশে যে কোন সময়ে পড়ে গিয়ে তার হাঁটু, উরুসন্ধি, হাত ও মেরুদন্ডের হাড় ভাঙ্গাসহ মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডে আঘাতজনিত পক্ষাঘাত রোগ ঘটতে পারে। নির্জন, নিঃসঙ্গ, নিরাপত্তাহীন পরিবেশের কারণে নিদ্রাহীনতা, উদ্বেগ, বিষণœতাসহ নানা মানসিক রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিরূপ, নিপীড়নমূলক পরিবেশ ও অস্বাভাবিক মানসিক চাপের ফলে তার আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরোনো, পরিত্যক্ত দূষণযুক্ত ভবনের বিষাক্ত পরিবেশে তার মারাত্মক ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুদ্বারা ফুসফুসের সংক্রমণ বা নিউমোনিয়ার সম্ভবনা বেশ প্রবল হয়ে উঠতে পারে।

সাইফুল ইসলাম বলেন, সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে মধ্যযুগীয় কায়দায় রাখার কারণে কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এই কারাগারের বসবাস অযোগ্যতা ছাড়াও নিয়মিত চিকিৎসার কোনই সুযোগ সুবিধা নেই। হেফাজতে সাম্প্রতিক বছরকালে সাড়ে ছয় শতাধিক মৃত্যুর খবর ইতোমধ্যে নানাবিধ শংকা বাড়িয়েছে। ইতোমধ্যে অসুস্থতার কারণে কারা কর্তৃপক্ষ তাকে একটি মামলার হাজিরায় নিতে না পারায় বেগম খালেদা জিয়ার গুরুতর অসুস্থতার বিষয়টি সকল সন্দেহ ঘুচিয়ে পরিষ্কার হয়ে পড়েছে। সরকারও বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে তার নিজস্ব পছন্দের ৪ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড দিয়ে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা নেয়। 

দেশের বিশিষ্ট এ চিকিৎসক বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে জটিল নানা রোগে ভুগছেন। ইতোপূর্বে তার দুই হাঁটু প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। সম্প্রতি তিনি লন্ডনে চোখের অপারেশনও সম্পন্ন করেছেন। তিনি কোন সাধারণ রোগী নন। চিকিৎসকদের পরিভাষায় তিনি একজন বিশেষ পরিচর্যা সাপেক্ষ রোগী (চধঃরবহঃ রিঃয ঝঢ়বপরধষ ঘববফং)। সে হিসাবে সুচিকিৎসার স্বার্থে তার একান্ত ব্যক্তিগত পরিচর্যার সকল সুবিধা নিশ্চিত করা সকল সভ্য, গণতান্ত্রিক ও মানবিকতাবোধসম্পন্ন জাতির কর্তব্য। এর অভাবে, সম্প্রতি তিনি ঘাড়, মেরুদন্ড ও ¯œায়ুবিক সমস্যা আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তার এই দীর্ঘকালীন রোগ অবস্থা কেবলমাত্র দীর্ঘকাল তার চিকিৎসায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিগত চিকিৎসকদেরই ভালোভাবে জানা আছে। নতুন কোন চিকিৎসক দলের পক্ষে তার সম্পূর্ণ অবস্থা এক নজরে ও এক নিমেষে অনুধাবন ও নির্ণয় করা একেবারেই অবাস্তব কল্পনা। ফলে, সরকার বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল ও তার চিকিৎসার ব্যাপারে যতœবান প্রমাণ করতে হলে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক দলের ভূমিকা উপেক্ষা করা সমীচিন নয়। বিষয়টি উপেক্ষা করলে সকল পরিণতিতে সরকারের দায়ী হবার প্রমাণ মিলবে এবং তা’ না করলে দায় লাঘব হবে। 

তিনি বলেন, সরকারের পছন্দের নতুন চিকিৎসক-দল নিয়োগ করায় এই নতুন দল একেবারেই প্রাথমিক পর্যায় থেকে বেগম খালেদা জিয়র রোগ অবস্থা বোঝার চেষ্টা নেন। দীর্ঘকালের রোগ ইতিহাস ও উপাত্ত তাদের জানা নেই। বর্তমানে তার বর্তমান রোগাবস্থা বেশ অগ্রসর। এই স্তরে রোগমূল্যায়নে পুরনো তথ্য-উপাত্তের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি বলেন, সিটি-স্ক্যান, এম-আর-আই ইত্যাদি আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াও নিবিড় পর্যবেক্ষণ এ ক্ষেত্রে রোগনির্ণয় ও উপশমে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালে বিশেষ শারীরিক চাহিদাসম্পন্ন রোগীর গাড়ি থেকে নামা ও সাধারণ চলাচলের উপযুক্ত ন্যূনতম সুবিধেও তার জন্যে প্রস্তুত রাখা হয়নি। ফলে সকল সক্ষমতা সঞ্চয় করে তাকে সামান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যে পথ পরিক্রমা দীর্ঘ করা হয় ও তা’ হেঁটে পাড়ি দিতে এক রকম বাধ্য করা হয়। 

চিকিৎসা দেয়ার নামে মামুলী এক্স-রে ও রক্ত পরীক্ষা করার জন্য বেগম জিয়াকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, অনেকেরই বিশ্বাস যে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রশাসনিক তৎপরতার বিষয়টি এক রকম লোক দেখানো, হঠকারিতামূলক ও জনবিভ্রান্তি সৃষ্টির সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। বিষয়টি আরও পরিষ্কার মনে হয়, যখন গত ৭ এপ্রিল কোনোরকম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া, এক রকম হুট করে তাকে ইতিপূর্বে সরকারি চিকিৎসক দলের দেয়া মামুলী এক্স-রে ও রক্ত পরীক্ষার জন্য মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে আনা হয়। 

বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক দিয়ে করানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সরকারকে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল ও তার চিকিৎসার ব্যাপারে যতœবান প্রমাণ করতে হলে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক দলের ভূমিকা উপেক্ষা করা সমীচীন নয়।

ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাব এর মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ডা. আজিজুল ইসলাম, ডা. এ মান্নান মিয়া, অধ্যাপক ডা. মো. সাহাব উদ্দিন, অধ্যাপক ডা. শহিদুর রহমান, অধ্যাপক ডা. এম এ সালাম প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ