ঢাকা, মঙ্গলবার 10 April 2018, ২৭ চৈত্র ১৪২৪, ২২ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কোটা সংস্কার সময়ের দাবি 

স্টাফ রিপোর্টার : সরকারি চাকরিতে যে কোটা প্রথা রয়েছে তা সংস্কার করা সময়ের দাবি বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট জনেরা। গতকাল গণমাধ্যকে দেয়া বক্তব্যে তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। তারা বিষয়টির একটি সুষ্ঠু সমাধান চান। 

মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রাখতেই কোটা সংস্কার প্রয়োজন- জাফর ইকবাল

মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রাখতেই সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতিতে সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। কোটা পদ্ধতি সংস্কারে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের ব্যাপারে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) এই অধ্যাপক বলেছেন, আমাদের দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোটার অনুপাত ঠিক নয়। আর মানুষের মধ্যে বড় ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে। ঘুরে ফিরে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর, তাদের সন্তানের ওপর, তাদের পরিবারের ওপর অসম্মান হচ্ছে। দিনদিন এটা বেড়ে চলেছে। তারা অসম্মানের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেননি। তারা দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ যেন অসম্মান না করে। এখন যে অবস্থা তাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রাখার জন্যই কোটা সংস্কার প্রয়োজন। 

গতকাল সোমবার দুপুরে শাবিপ্রবির ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া আইআইসিটি ভবনে বিজ্ঞানের জন্য ভালোবাসা নামক একটি সংগঠনের এক সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন ড. জাফর ইকবাল। 

ড. জাফর ইকবাল বলেন, একটা সময় যেকোনো দেশ বা জাতির অনগ্রসর কোনো গোষ্ঠী যদি অবহেলিত হয় তাদের সামনে নিয়ে আসার জন্য কোটা দেওয়া হয়। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো জায়গায় যদি কোটার সংখ্যাই বেশি হয়; তা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়। কোটার অনুপাত অবশ্যই সামঞ্জস্যপূর্ণ ও যুক্তিযুক্ত হতে হবে।

কোটা প্রথার যৌক্তিক সংস্কার দরকার- এমাজ উদ্দিন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে যারা যোগ্য, যারা মেধাবী তাদেরকে নিয়োগ দিতে হবে। কোন দেশে কোটার নামে এ বৈষম্য আছে? কিছু দিনের জন্য হয়তো কোটা পদ্ধতি রাখা যেতে পারে। কিন্ত যুগ যুগ ধরে ছেলে মেয়ে, নাতি-পুতিদের জন্য বংশ পরম্পরা এ রকম ব্যবস্থা চালু রাখা সম্পূর্ণ অর্থহীন ও অযৌক্তিক।

তিনি বলেন, এক সময় এটির ব্যাপক দরকার ছিল। এখন তেমন প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে নাতি-নাতনি কোটার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। কেউ কোনো সুযোগ-সুবিধা লাভ করার জন্য মুক্তিযুদ্ধে যায়নি। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে গেছেন নিজের প্রয়োজনে। দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে নিজের দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে। সুতরাং এর জন্য তাদের ছেলেমেয়েদের পুরস্কৃত করতে হবে এ ধরনের চিন্তা ভাবনা যেন কারো মাথায় না আসে।

তিনি আরো বলেন, আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্য দিক সমস্যা নেই। কিন্তু শিক্ষার্থীদের তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। তবে কেউ যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে সে বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। সোজা কথা হচ্ছে, কোটা প্রথাটার একটা যৌক্তিক সংস্কার দরকার। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে একটি কমিটি করা যেতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাখা যেতে পারে। নদী ভাঙনে যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের জন্য দেয়া যেতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে এখন কোটার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আর মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রে নাতি-নাতনি বাদ দিতে হবে।

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক : কোটা সংস্কারের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্ব প্রথম পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠীর জন্য কোটার ব্যবস্থা করেছিলেন। পরবর্তীতে সামাজিক প্রেক্ষাপটের আলোকে সেটি বাড়ানো-কমানো হয়েছে। তবে তখনকার বাস্তবতা আর এখনকার বাস্তবতা এক বিষয় নয়। মেধাবীদের সুযোগদানের জন্য এ পদ্ধতির পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন আছে। একেবারে বাদ দেয়া যাবে না। তবে ধারাবাহিকভাবে তথ্যভিত্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে এটি সংস্কার করা যেতে পারে। মেধাবীদের বাদ দিয়ে কোটা পদ্ধতিতে প্রশাসনিক নিয়োগ দেশের জন্য আরো ক্ষতির কারণ হতে পারে। কোটার প্রয়োজন আছে। তবে সেটি মেধাবীদের বাদ দিয়ে নয়। মেধাবীদের প্রাধান্য দিয়েই কোটা প্রথা চালু রাখা যেতে পারে।

তিনি বলেন, মূলত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে তুলে আনার জন্য কোটা পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। সময়ে সময়ে সমাজের একটি অংশ এগিয়ে আসে। আবার অন্য অংশ পিছিয়ে পড়ে। এখন সময় এসেছে সেটি পুনর্মূল্যায়নের।

৫৬% কোটা জাতির জন্য লজ্জার -- জাবি ভিসি

সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা পদ্ধতিকে জাতির জন্য লজ্জার মন্তব্য করে ‘কোটা সংস্কার’ এর দাবিতে চলমান আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভিসি অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম। তবে শিক্ষার্থীদের আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবি তুলে ধরতে রাস্তা থেকে সরে আসারও আহ্বান জানান তিনি।

সোমবার বিকেল ৩টার দিকে কোটা সংস্কারের দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করার আহ্বান জানাতে গিয়ে তিনি এই একাত্মতা প্রকাশ করেন। এসময় তিনি বলেন, ৫৬ শতাংশ কোটা একটি জাতির জন্য লজ্জার। অবশ্যই এটি সংস্কার করা প্রয়োজন।

মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী : চাকরিতে কোটা সংস্কার দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছে গত রোববার থেকে। দ্বিতীয় দিনের মতো গতকাল সোমবার সকাল থেকে শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনে যোগ দিয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে স্লোগানে মুখর গোটা বিশ্ববিদ্যালয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও কোটা সংস্কার নিয়ে অনেকে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীও কোটা সংস্কার নিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন। তিনি বলেন, ‘অনেকগুলো চিঠি আসছে। কোটাসংস্কার আন্দোলন বিষয়ে। আমি জানি কখনো কখনো নীরবতা অপরাধের সামিল। বেশ কয় বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে কথা বলতে হয়েছিল। আরেফিন স্যারও ওই অনুষ্ঠানে ছিলেন। সেখানে কথা প্রসঙ্গে মেধাবী ছাত্রদের সরকারি চাকরিতে আকৃষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছি। কারণ সরকারি চাকরিতে যদি মেধাশূন্যতা তৈরি হয় তাহলে ভবিষ্যতে পলিসি নিয়ে আলোচনা এবং সময়োপযোগী পলিসি নির্ধারণে আমরা নিদারুণ ব্যর্থ হবো। সাম্প্রতিক সময়ের কোটা বিষয়ক আলোচনা দেখে সেই কথাটা আবার মনে পড়ল।’

ফারুকী আরো বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁদের নানান সুযোগ সুবিধা দেয়ার পক্ষে আমি। বাড়ি দেন, চিকিৎসাসেবা দেন, ভালো ভাতা দেন। 

কিন্তু সরকারি চাকরিতে নিয়োগ হওয়া উচিত মেধার ভিত্তিতে। এই বক্তব্যের সাথে আমি একমত। তবে অতি উৎসাহীদের কাছ থেকে সাবধান থাকা উচিত এই আন্দোলনে সামিল ভাই-বোনদের। মেধা ভিত্তিক নিয়োগের দাবির মধ্যে কেউ যেন এমন অপ্রয়োজনীয় কিছু না বলেন যাতে মনে হয় ‘মুক্তিযাদ্ধাদের’ ব্যাপারে কোনো অ্যালার্জি আছে। পরিশেষে, আমি আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোটার ব্যাপারটা একটা যৌক্তিক জায়গায় নিয়ে আসবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ