ঢাকা, মঙ্গলবার 10 April 2018, ২৭ চৈত্র ১৪২৪, ২২ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সংশোধন ছাড়াই বিতর্কিত ৩২ ধারাসহ ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল সংসদে উত্থাপন

 

সংসদ রিপোর্টার : বিতর্কিত তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বিলুপ্ত করে বহুল আলোচিত  ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করার লক্ষ্যে সংসদে এ সংক্রান্ত একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। বিলটিতে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতিবন্ধক ৩২ ধারা কোনো ধরনের সংশোধন ছাড়াই বহাল রয়েছে। বিলটি উত্থাপনের সময় বিরোধিতা করেছেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম। তিনি বলেন, এ আইন পাস হলে সারাদেশ জেলখানায় পরিণত হবে।

গতকাল সোমবার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল ২০১৮ সংসদে উত্থাপন করেন। আগামী ৪ সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

বিলটির বিরোধিতা করে ফখরুল ইমাম বলেন, বিতর্কিত ৫৭ ধারার পরিবর্তে ৩২ ধারা সংযোজন করা হয়েছে। এ ধারার ফলে সাংবাদিকতা আর থাকলো না। আইনমন্ত্রী বলেছিলেন সেফটি ক্লজ দিবেন, কিন্তু এখানে তা দেয়া হয়নি। আমরা সবাই মোবাইল ব্যবহার করি। এ আইনটি আরো সংশোধন না করলে সারাদেশ জেলখানায় পরিণত হবে। এ জন্য আইনটি উত্থাপন না করার জন্য অনুরোধ করছি।

জবাবে মন্ত্রী আব্দুল জব্বার বলেন, সংসদীয় কমিটিতে সংশোধনের সুযোগ আছে।

গত ২৯ জানুয়ারি খসড়া আইনটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। সমালোচিত ৫৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারা তথ্য প্রযুক্তি আইন থেকে সরিয়ে  সেগুলো আরও বিশদ আকারে যুক্ত করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হচ্ছে।

এ আইন পাস হলে হ্যাকিং; ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’; রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করতে বা ভয়ভীতি সৃষ্টির জন্য কম্পিউটার বা ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং ডিজিটাল উপায়ে গুপ্তচরবৃত্তির মত অপরাধে ১৪ বছরের কারাদ-ের পাশাপাশি কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদ- বা উভয় দ- দেয়া যাবে।

আর ইন্টারনেটে কোনো প্রচার বা প্রকাশের মাধ্যমে  ‘ধর্মীয় অনুভূতি বা মূল্যবোধে আঘাত’ করার শাস্তি হবে ১০ বছরের জেল, ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দ-।

খসড়া আইনটির মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর থেকে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে পড়ে। সাংবাদিকরাও প্রস্তাবিত আইনটির ৩২ ধারার সমালোচনা করছেন। এই আইনের ফলে প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হবে বলে মনে করছেন তাদের অনেকে।

ডিজিটাল আইনে ৫৪ ধারায় অপরাধের আমলযোগ্যতা ও জামিনযোগ্যতায়  বলা হয়েছে, (ক) ১৭, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪ ধারার অপরাধসমূহ আমলযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য হবে। 

এসব ধারায় যেসব অপরাধের কথা উল্লেখ আছে- ১৭ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বে-আইনি প্রবেশ, (১৯) কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম ক্ষতিসাধন, (২১) মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার আমলযোগ্যতা প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা, (২৩) ডিজিটাল বা ইলেক্ট্রনিক প্রতারণা, (২৪) পরিচয় প্রতারণা বা ছদ্মবেশ ধারণ, (২৬) অনুমতি ব্যতীত পরিচিত তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহার, (২৭) সাইবার সন্ত্রাসী কার্য সংঘটন, (২৮) ওয়েবসাইট বা কোনো ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন তথ্য প্রকাশ, (৩০) আইনানুগ কতৃত্ব বহির্ভূত ই-ট্রানজেকশন, (৩১) আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, (৩২) কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি (৩৪) হ্যাকিং সংক্রান্ত অপরাধ।

বিলে জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। ১১ সদস্য বিশিষ্ট ওই কমিটিতে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন প্রধানমন্ত্রী। সদস্য হিসেবে থাকবেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইজিপি, বিটিআরসি চেয়ারম্যান, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালক এবং সদস্য সচিব থাকবেন জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিলের মহাপরিচালক।

 এছাড়া বিলে ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সি গঠনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিলে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের জন্য এজেন্সির অধীনে একটি জাতীয় কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন করা হবে বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপনেরও বিধান রাখা হয়েছে। বিলে সাইবার সন্ত্রাসী কাজের জন্য ১৪ বছর কারাদ-ের বিধান করা হয়েছে। একই অপরাধ যদি দ্বিতীয়বার করা হয় তাহলে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিলে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, সম্প্রচার ইত্যাদির জন্য ৩ বছর কারাদ- ও ৫ লাখ টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন বলে বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করা হলে ৫ বছর কারাদ- দেয়া হবে। হ্যাকিং অপরাধের জন্য ১৪ বছর কারাদ- বা ১ কোটি টাকা অর্থদ-ের বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করা হলে যাবজ্জীবন বা ৫ কোটি টাকা অর্থদ- দেয়া যাবে। বিলে পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি, জব্দ ও  গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও ডিজিটাল অপরাধসমূহের প্রতিকার, প্রতিরোধ, দমন, শনাক্তকরণ, তদন্ত ও বিচারের উদ্দেশ্যে এ আইন প্রণয়ন অপরিহার্য। সাইবার তথা ডিজিটাল অপরাধের কবল থেকে রাষ্ট্র ও জনগণের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান এ আইনের অন্যতম লক্ষ্য। এতে আরও বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নকে প্রকারান্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলার পুনর্জাগরণ বলা যেতে পারে। এই মহান স্বপ্নদ্রষ্টার সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারই যোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রূপকল্প ২০২১ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ