ঢাকা, মঙ্গলবার 10 April 2018, ২৭ চৈত্র ১৪২৪, ২২ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ক্ষীণ আশা নিয়েই নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ চলছে

বাংলাদেশে আসা একদল রোহিঙ্গা

৯ এপ্রিল, রয়টার্স, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল : বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের পরিবেশ মিয়ানমারে এখনও তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক উপ মহাসচিব উরসুলা মুলার।

ইয়াংগুনে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুলার বলেন, “আমি যা দেখেছি এবং লোকজনের কাছে যা শুনেছি তাতে সেখানে (রোহিঙ্গাদের) স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার সুযোগ নেই, তাদের সুরক্ষা নিয়েও উদ্বেগ আছে, এখনও তারা গৃহহীন হচ্ছে.. সেখানকার পরিস্থিতি কোনোভাবেই ফেরার উপযোগী নয়।”

রাখাইনে সেনাঅভিযান শুর হওয়া পর সেখানে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

এর মধ্যেই মুলার রাখাইনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি পান। তিনি মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি এবং কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন।

ইয়াংগুন থেকে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুলার বলেন, “আমি (মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের) রাখাইনে নৃশংসতার অবসান ঘটিয়ে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পর বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের ফেরত আনার আহ্বান জানিয়েছি।”

মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের ফেরার উপযুক্ত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি পরিস্থিতি নিয়ে সত্যিই উদ্বিগ্ন।

“আমি পুড়িয়ে দেওয়া ও বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া গ্রামগুলো দেখেছি। শরণার্থীদের নিজ নিজ বাড়িতে ফেরানোর কোনো ধরনের প্রস্তুতি আমি সেখানে দেখিনি বা শুনিনি।”

এ বিষয়ে কথা বলতে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে গত বছরের অগাস্টে বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। কয়েক মাসেই এই সংখ্যা ছয় লাখ ছাড়িয়ে যায়। বাংলাদেশে আগে থেকে আশ্রয় নিয়ে ছিল আরও চার লাখ রোহিঙ্গা।

 রেহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে মানতে নারাজ হলেও সর্বশেষ ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে মিয়ানমার তার দেশের এই মুসলিম বাসিন্দাদের ফেরত নিতে রাজি হয়। চার মাস আগে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটি সম্মতিপত্র সই হলেও এরপর তার অগ্রগতি নেই।

ওই সম্মতিপত্রের ভিত্তিতে দুই দেশ গত ১৯ ডিসেম্বর যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে। রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য একটি ফর্মও চূড়ান্ত করা হয় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রথম যে ৮ হাজারের তালিকা দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে মাত্র ৫০০ জনের পরিচয় যাচাই করে নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।

এই প্রক্রিয়ায় দেরি দেখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবারই জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে টেলি আলাপে মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগিতা চান।

মিয়ানমারের গড়িমসির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে শুক্রবার রেডিও ফ্রি এশিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির সমাজকল্যাণ এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী উইন মিয়াত আয়ে ফেরত নেওয়ার আগে রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাইয়ের আরও সময় নেওয়ার কথা বললেন।

তিনি বলেন, “শরণার্থীদের পূরণ করা ফর্ম চুক্তির আলোকে না হওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।

“যদি প্রক্রিয়াটি চুক্তি অনুসরণে চলে, যদি ফর্মটি চুক্তির আলোকে পূরণ হয়, তবে তো দেরি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এটা সেই পথে হচ্ছে না, যা আমরা প্রত্যাশা করছি। যদি শরণার্থীরা চুক্তি অনুযায়ী ফর্মটি পূর্ণ করে, তবে প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুততর হতে পারে।”

এদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাললের এক প্রতিবেদনে স্বজনহারা রোহিঙ্গাদের চিত্র তুলে ধরা হয়, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ধেয়ে আসা বন্দুকের ভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছিলেন নবী হোসাইন নামের এক রোহিঙ্গা তরুণ। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মা-হারানো ওই ব্যক্তির সঙ্গে ধান ক্ষেতের মধ্য দিয়ে পালিয়ে আসছিলো তার বোনটিও। শৈশবেই মা হারানো নবীকে এই বোনটিই মাতৃস্নেহে বড় করে তুলেছে। সেই বোনকে ধান ক্ষেতের মধ্যেই হারিয়ে ফেলেন নবী। বাধ্য হয়ে একাই আশ্রয় নেন শিবিরে ঢুকতে। সেই সেপ্টেম্বর থেকে পেরিয়ে গেছে ৬টি মাস। এখনও শিবিরের লাখ লাখ রোহিঙ্গার মুখে নিখোঁজ হওয়া নিজ বোনের ছায়া খুঁজে ফিরছে নবী। কেবল নবী নয়, নবীর মতোই হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে মরিয়া। তবে মিয়ানমার নিখোঁজদের খোঁজ পেতে কোনও উদ্যোগ নেয়নি। উল্টো বিভিন্ন গ্রামে সংঘটিত হত্যাকা-সহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত নিশ্চিহ্ন করতে সেখানে বুলডোজার চালিয়েছে। তারা বলছে, প্রত্যাবাসনের আগে নিহত ও নিখোঁজদের প্রকৃত সংখ্যা নিরুপণ করা সম্ভব না। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী অন্তত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অন্তত ৪৩ হাজার শিশু তার বাব-মা’র কোনও একজনকে হারিয়েছে। এছাড়া কেউ ভাই হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন বোন, কেউ স্বামী কিংবা স্ত্রীকে। মিয়ানমারের অসহযোগিতা আর অনিচ্ছায় তাদের ফিরে পাওয়ার আশা ফিকে হয়ে আসলেও স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশা জিইয়ে রেখেছে রোহিঙ্গারা।   

আর সবার মতোই কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা হয়েছেন নবী হোসাইন। বাংলাদেশে আসার পর থেকেই খুঁজে ফিরছেন বড় বোনকে। মুখে দাঁড়িসম্বলিত এই কৃষকের ছোটবেলায় মায়ের মৃত্যুর পর সঙ্গে বোনের সম্পর্ক অন্যরকম হয়ে ওঠে। ছোটবেলা থেকে তার বোনই তাকে লালন-পালন করেছেন। তার বাবা যখন মাঠে কাজ করতে যেতেন তখন বোনই তার দেখাশোনা করেছেন। নবী হোসাইন বলেন, তিনি তাকে সকালে গোসল করাতেন ও মাথার চুল ঠিক করে দিতেন। রোজার মাসে সারাদিন পর সন্ধ্যায় তাকে গুড়ের পিঠা তৈরি করে দিতেন। নবী বলেন, ‘তিনি আমাকে একই সঙ্গে বোন ও মায়ের ভালবাসা দিয়েছেন’।

পালিয়ে আসবার সময় ধানক্ষেতের ভীড়ে হারিয়ে ফেলা বোনকে আজও খুঁজে ফিরছে নবী। বুকের মধ্যে জমিয়ে রেখেছেন আশা। হয়তো তার বোনও নদী পার হয়ে বাংলাদেশে আসতে পেরেছে। হোসাইনের বোনের নাম সামারুক। তার কোনও ছবি বা অন্যকোনও পরিচয় নেই। শুধু বর্ণণা দিতে পারেন হোসাইন। তার ভাষায়, তিনি বয়স্ক কিন্তু এখনও সবল ও সবসময় হাসিখুশি থাকতেন। হোসাইল বলেন, ‘সে হয়তো বাংলাদেশে আছেন কিন্তু আমি এখনো তাকে খুঁজে পাইনি’।

বাংলাদেশের শিবিরগুলোতে থাকা শরণার্থীরাও তাদের পরিচিত মানুষকে খোঁজার জন্য মুখে মুখে প্রচার চালাচ্ছেন। তারা এজন্য বিভিন্ন বুথ স্থাপন করেছেন যেখানে মায়েরা তাদের সন্তানদের বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে নির্মিত অস্থায়ী মসজিদগুলো এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিমাল হোসাইন নামে একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী এ রকম একটি বুথ স্থাপন করেছেন। তিনি কয়েক পরিবারের সদস্যদের একত্র হতে সহায়তা করেছেন। যতগুলো পরিবারের তথ্য পেয়েছেন তাদের মধ্যে অর্ধেক কাজে তিনি সফল হয়েছেন। তারপরও গত ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি ওই বুথ বন্ধ করে দেন। কারণ তখন আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এখনও নিখোঁজদের সম্পর্কে কিমাল বলেন, ‘কয়েক মাস হয়ে গেছে, আমার মনে হয় তারা আর জীবিত নেই’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ