ঢাকা, বুধবার 11 April 2018, ২৮ চৈত্র ১৪২৪, ২৩ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কোটাবিরোধী আন্দোলন

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রচন্ড আলোড়ন তুলেছে। কয়েক মাস ধরে মিছিল সমাবেশ ও মানব বন্ধনসহ শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করার মধ্য দিয়ে নিজেদের দাবি জানানোর এক পর্যায়ে গত ৮ এপ্রিল রোববার শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বড় ধরনের মিছিল ও সমাবেশ করার চেষ্টা করেছিল। মিছিল শুরু করার আগে শাহবাগ এলাকায় অবস্থানরত পুলিশ সদস্যদের তারা এমনকি ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতেও গিয়েছিল, যাতে পুলিশ তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বুঝতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা না চালায়।

অন্যদিকে সরকারের পুলিশ বাহিনী শুরু থেকেই মারমুখী হয়ে উঠেছিল। শুভেচ্ছার ফুল গ্রহণের উদারতা দেখানোর পরিবর্তে পুলিশ সদস্যরা বেধড়ক লাঠিপেটা তো করেছেই, নির্বিচারে টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ার পাশাপাশি পানি কামানেরও যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে। ছুঁড়েছে অসংখ্য রাবার বুলেটও। এর ফলে শত শত মিছিলকারী আহত হয়েছে। পুলিশের হামলা ও ধাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা শিক্ষার্থীরাও পুলিশের উদ্দেশে ইট-পাটকেল ছুঁড়েছে, রাস্তায় কাগজপত্র ও আবর্জনা  জড়ো করে সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এভাবে সব মিলিয়েই মাত্র এক-দেড় ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। মিছিলকারীরা ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। বিশেষ করে শাহবাগ মোড় থেকে টিএসসি এলাকা পর্যন্ত চলেছে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। এসব দৃশ্য বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত সাধারণ মানুষও দেখেছে এবং দেখে ভীত ও আতংকিত হয়েছে। 

ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে আপত্তিকর হিসেবে এসেছে ভাইস চ্যান্সেলরের বাসভবনে চালানো সশস্ত্র হামলা। প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, সরকারের পক্ষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য গভীর রাতে এসেছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি নাকি পরদিন সকালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরাও নাকি সম্মত হয়েছিলেন। মিস্টার নানকের সঙ্গে কথা হওয়ার পর আর কোনো মিছিল বা কার্যক্রম চালানো হবে না বলেও তারা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু ঠিক সে সময়ই গণজাগরণ মঞ্চের স্বঘোষিত নেতা ডা. ইমরান এইচ সরকার নাকি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেয়া এক স্ট্যাটাসে জানিয়েছিলেন, পুলিশের গুলীতে একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘটেছে। 

এই খবরে সঙ্গত কারণেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। তারা শাহবাগ অভিমুখে এগিয়ে যেতে শুরু করেছিল। আর তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের বাসভবনে হামলা চালিয়েছিল একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত। ভিসি প্রফেসর আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, হামলা চালানো হয়েছিল তাকে এবং তার পরিবার সদস্যদের হত্যার ভয়ংকর উদ্দেশ্যে। দুর্বৃত্তদের মুখ ও মাথা কাপড়ে মোড়ানো ছিল, যাতে কাউকে চেনা না যায়। দেড় থেকে দুইশ’জনের এ সশস্ত্র দলটি ভবনের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে। বাইরের দুটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করার পর ভবনের ভেতরেও তারা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তারা সিসিটিভি বা ক্লোজ সার্কিট টিভি ক্যামেরার সকল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে এবং ভিসি ও তার স্ত্রী-সন্তানদের খুঁজে বেড়িয়েছে। পেছনের দরজা দিয়ে আগেই বেরিয়ে যাওয়ায় তারা অবশ্য প্রাণে বেঁচে গেছেন। ড. আক্তারুজ্জামানকেও পায়নি দুর্বৃত্তরা। 

পরদিন ভিসি অত্যন্ত জোরের সঙ্গে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল না। তাদের বরং পিলখানা হত্যাকান্ডের ঘাতকদের মতো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং দুর্ধর্ষ বলে মনে হয়েছে। অন্যদিকে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরাও বলেছে, ভিসির বাসভবনে হামলা যারা চালিয়েছে, তাদের কাউকে তারাও চেনে না। বড়কথা, শিক্ষার্থীদের কেউই মুখোশ পরেনি। মুখোশ পরার কোনো কারণই ছিল না। এর মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়ে গেছে, হত্যাসহ নাশকতা চালানোর ভয়ংকর উদ্দেশ্য নিয়েই সশস্ত্র ওই দুর্বৃত্তরা ভিসির বাসভবনে হামলা চালিয়েছিল। অন্য একটি কারণেও বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সে কারণটি হলো, প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত কোনো পর্যায়েই কোটার ব্যাপারে ভিসি জড়িত নন, ছিলেনও না। তা সত্ত্বেও তার বাসভবনে সশস্ত্র হামলা চালানোর ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে, বাস্তবে দুর্বৃত্তদের উদ্দেশ্য ছিল অরাজকতা সৃষ্টি করা। বড়কথা, তারা অবশ্যই কোনো বিশেষ মহলের নির্দেশেই সেখানে গিয়েছিল। 

আমরা বিষয়টিকে গুরুতর মনে করি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ সরকারের উচিত সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের খুঁজে বের করা এবং আইনের আওতায় বিচার করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা। আমরা একই সঙ্গে কোটা ব্যবস্থার নামে চাপিয়ে দেয়া বৈষম্যের অবসান ঘটানোর জন্যও দাবি জানাই। কারণ, কোটার আড়ালে সরকার যে ব্যবস্থা করেছে সে অনুযায়ী দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধার পরিবার সদস্যদের জন্য ৩০ শতাংশ, ২০ লাখ (+) প্রতিবন্ধীর জন্য এক শতাংশ, ১৬ লাখ (+) উপজাতির জন্য ৫ শতাংশ এবং নারী ও জেলাসহ অন্যান্যের জন্য ২০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ রয়েছে। প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা গেছে, সব মিলিয়ে দেশের মাত্র ২ দশমিক ৬৩ শতাংশের জন্য বরাদ্দ রয়েছে সরকারি চাকরির ৫৬ শতাংশ। অন্যদিকে ৯৭ দশমিক ৩৭ শতাংশের জন্য রয়েছে মাত্র ৪৪ শতাংশ। বিশ্বের কোনো দেশেই এ ধরনের চরম বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা নেই। থাকাও উচিত নয়। আমরা তাই কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করি এবং অনতিবিলম্বে তাদের দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ