ঢাকা, বুধবার 11 April 2018, ২৮ চৈত্র ১৪২৪, ২৩ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে উত্তপ্ত রাজপথ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যোগ দিয়েছে

 

স্টাফ রিপোর্টার : কোটা সংস্কারের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজপথ। কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে ফের সমন্বিত আন্দোলনে নেমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মিছিল করেছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী। বিকেল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে বিভিন্ন দিক থেকে মিছিল জড়ো হয়। এই আন্দোলন এখন শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, রাজধানীর বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এবার যুক্ত হয়েছে। তারা দিনভর সড়ক অবরোধ করে রাখে। অর্থমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রীর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তব্য প্রত্যাহারের আলটিমেটাম দেয় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেন, অনির্দিষ্টকালের জন্য বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকবে। সারা দেশের সড়ক অবরোধ করা হবে।

গতকাল বিকেল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে বিভিন্ন দিক থেকে মিছিল জড়ো হতে থাকে। সরেজমিনে দেখা গেছে, শহীদ মিনার, ফুলার রোড, ভিসি চত্বর, ভিসি অফিসের সামনে দিয়ে সূর্যসেন হল, বিজনেস ফ্যাকাল্টি, কলা ভবন হয়ে টিএসসি অভিমুখে মিছিল জড়ো হয়। তাদের স্লোগানে কেঁপে উঠছে টিএসসি। সেখানে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর কুশপুত্তলিকা হাতে নিয়ে বিক্ষোভ করছেন আন্দোলনকারীরা। কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে নানান স্লোগান দিচ্ছেন তারা।

 অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর বক্তব্যের প্রতিবাদে ফের সমন্বিত আন্দোলনে নেমেছেন তারা। গতকাল বিকেল ৫টার মধ্যে কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা। অন্যথায় বিকেল ৫টার পর তারা ফের আন্দোলনে যাবেন বলে সকালে ঘোষণা দিয়েছিলেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা। যদিও মঙ্গলবার সকাল থেকে তারা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। আন্দোলনকারী সংগঠন ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’-এর বাইরেও আরও দু’টি গ্রুপ তৈরি হয়।

কিন্তু সোমবার জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলায় এবং মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী ‘বাজেটের আগে কোটা সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া সম্ভব নয়’- এমন ঘোষণা দেয়ায় ফের উত্তেজিত হয়ে পড়েন কোটা সংস্কারের আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা। এরপর তারা বিভক্তি ভুলে এক হয়ে গতকাল বিকেল ৫টা থেকে আবার আন্দোলনে নামেন।

 কোটা সংস্কার আন্দোলন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. রাশেদ খান ও নুরুল হক নুর বিকেল ৫টায় ঢাবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, কোটা সংস্কারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সুনির্দিষ্টভাবে ঘোষণা দিতে হবে। ঘোষণায় কবে নাগাদ কোটা সংস্কার করা হবে সেটি উল্লেখ করতে হবে। এছাড়া গ্রেফতারকৃতদের অবিলম্বে মুক্তি এবং আহতদের সরকারি সহায়তায় চিকিৎসা দাবি জানান তারা। এসব দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকাল অবরোধ, ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন চলবে। 

নুরুল হক নূর বলেন, গতকাল সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনুরোধে আমরা কর্মসূচি ৭ মে পর্যন্ত স্থগিত করার ঘোষণা করেছিলাম... কিন্তু আমাদের মধ্যে আলোচনা চলাকালে গতকাল সংসদে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের কোটাবিরোধী হিসেবে আখ্যা দেন। আমাদের রাজাকার বলেন। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীদের ৮০ শতাংশই রাজাকারের বাচ্চা। এমন বক্তব্যে আমরা মর্মাহত। আমরা অধিকার আদায়ে আন্দোলন করতে গিয়ে রাজাকারের বাচ্চা হলাম।

রাশেদ বলেন, ‘বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ মতিয়া চৌধুরীকে ক্ষমা চাইতে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি ক্ষমা চাননি। উল্টো অর্থমন্ত্রী সচিবালয়ে বললেন, আগামী বাজেটের আগে কোটা সংস্কারের দাবি পূরণ করা সম্ভব নয়। এরপর আর গতকালের আলোচনা ও এক মাস আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণার কোনো গুরুত্ব থাকে না। 

পরিষদের আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান বলেন, সচিবালয়ে নেয়া সিদ্ধান্ত সারাদেশের ছাত্রসমাজ মেনে নেয়নি। আজ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকবে। অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা বাংলাদেশের রাস্তা অবরোধ করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা।

গত কয়েক দিনের আন্দোলনের মধ্যে গ্রেফতার শিক্ষার্থীদের মুক্তি, রোববারের সংঘর্ষে আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং কোটার বিষয়ের প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট ঘোষণার দাবি জানিয়ে রাশেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে আমরা বলতে চাই, আপনার সন্তানদের এই বিপদের মুখে রাস্তায় ফেলে দেবেন না, দয়া করে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিন। শিক্ষার্থীরা এ সময় ‘চাইলাম অধিকার হয়ে গেলাম রাজাকার’, ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়  বৈষম্যের ঠাই নাই’, ‘কোটা সংস্কার চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।

এই রাশেদই সকালে একই জায়গায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, সচিবালয়ের সমঝোতার সিদ্ধান্ত না মেনে যারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তারা ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠী’।

বিকালের সংবাদ সম্মেলনের পর সহস্রাধিক শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে রাজু ভাস্কর্যে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিলিত হয়। 

মতিয়া চৌধুরী যা বলেছিলেন: গত সোমবার সংসদে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আসল সমস্যা মুক্তিযোদ্ধা কোটায়। পৃথিবীর দেশে দেশে মুক্তিযুদ্ধে, দেশের সার্ভবৌমত্বের কারণে যারা জীবনবাজি রাখে তাদের জন্য সুযোগ আছে, সুযোগ দেয়া হয়। যারা জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছে তাদের সন্তানরা সুযোগ পাবে না, তাদের বাদ রেখে রাজাকারের বাচ্চাদের সুযোগ দিতে হবে? তারা যাতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সে জন্য রাজধানীকেন্দ্রীক একটি এলিট শ্রেণি তৈরি করার একটা সুপরিকল্পিত চক্রান্ত, তারই মহড়া কাল রাতে দেখলাম।’

‘আমি পরিষ্কার বলতে চাই, মুক্তিযুদ্ধ করেছি, এই রাজাকারের বাচ্চাদের আমরা দেখে নেব। আর ছাত্রদের প্রতি আমাদের কোনো রাগ নেই। কিন্তু স্ট্যাটাস যারা দিয়েছে, তারা তো ছাত্র না, তারা তো জামায়াত শিবিরের এজেন্ট। তাদের প্রতি সামান্যতম শৈথিল্য দেশবাসী আর দেখতে চায় না। হয় ওরা থাকবে, নয় আমরা থাকব। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলব, তাদের প্রতি কোনো শৈথিল্য নয়, উপযুক্ত ব্যবস্থা নিন, যুদ্ধ ঘোষণা করুন, হয় এরা থাকবে নয় আমরা থাকব, এই হোক আজকের প্রতিজ্ঞা।’

অর্থমন্ত্রী যা বলেন: গতকাল সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘কোটা থাকতেই হবে। তবে কত শতাংশ থাকবে সেটা আলোচনার বিয়ষ। এখন কোটার শতাংশ অনেক বেশি। এটা সংস্কার হওয়া উচিত। তবে কোটা সংস্কারের বিষয়টি আমার মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। তারপরও আমি প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দিয়েছি এটিকে সংস্কারের জন্য।’

‘বাজেটের পর ৫৬ শতাংশের কোটা অবশ্যই সংস্কার করা হবে। কারণ কোটায় প্রার্থী পাওয়া যায় না।’

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে কোটা কত অংশ থাকবে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতেই কোটা প্রথা থাকতে হবে। আসন্ন বাজেটের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

‘তবে এখন যেটা হয়েছে সেটা বোধ হয় একটু বেশিই হয়ে গেছে। এটা সংস্কারের উচিত। এ বিষয়ে এক মন্ত্রী আমাকে বলেছে যে, সংস্কারের চিন্তা-ভাবনা হচ্ছে। এটা আমার মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়, বাট আমাদের কন্ট্রিবিউশন যেটুকু দরকার সেটুকু দেয়া হবে।’

দিনভর রাস্তায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা: কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজধানীর কয়েকটি সড়ক অবরোধ করেছে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এর ফলে গতকাল দুপুর থেকে রামপুরা থেকে বসুন্ধরা পর্যন্ত বীর উত্তম রফিকুল ইসলাম এভিনিউ এবং প্রগতি সরণিতে পাঁচ ঘণ্টা এবং ধানম-ির সোবহানবাগ হয়ে মিরপুর রোডে তিন ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। এর প্রভাবে আশপাশের বিভিন্ন সড়কে ব্যাপক যানজট তৈরি হয়। বিকালে রাস্তা ছেড়ে ফিরে যাওয়ার সময় আন্দোলনকারীরা বলে গেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীরা বুধবার আন্দোলন চালিয়ে গেলে তারাও আবার রাস্তায় নামবেন। 

ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গতকাল দুপুর ১২টার দিকে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসের সামনে রামপুরা ব্রিজে অবস্থান নিলে মালিবাগ থেকে বাড্ডাগামী সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

একই সময়ে ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেসের (ইউআইটিএস) শিক্ষার্থীরা ভাটারা থানার সামনে থেকে শুরু করে বাড্ডা-রামপুরাগামী সড়কে অবস্থান নেন। ফলে রামপুরা থেকে নতুন বাজার হয়ে কুড়িলের দিকে যাওয়া আসার পথও আটকে যায়।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সকাল ১০টা থেকে বসুন্ধরায় নিজেদের ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। বেলা ১২টার দিকে তারা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রধান গেইটে এসে সড়ক অবরোধ করেন। পরে ইনডিপেন্ডেন্ট, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ও এআইইউবির শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে যোগ দিলে প্রগতি সরণির দুই দিকেই যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

নর্থ সাউথের এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী তাজিন মাহমুদ আশিক বলেন, কোটা সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে এবং সব ধরনের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত ভাই-বোনদের সাথে আমরা একাত্মতা প্রকাশ করছি। আশিক জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরুর পর ফেসবুকে ইভেন্ট খুলে মঙ্গলবার তারা আন্দোলনে নামেন।

এদিকে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দুপুরের পর সোবহানবাগে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করে। শুরুতে খ- খ- মিছিল নিয়ে তারা আন্দোলন চালিয়ে গেলেও বেলা ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়কে অবস্থান নিলে মিরপুর রোডের এক পাশে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় বলে মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার জানান। বিকাল পৌনে ৫টার দিকে ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নিয়ে রাস্তা থেকে সরে যান। তারপর ওই সড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী তানজিন আহম্মেদ বলেন, জনদুর্ভোগের কথা চিন্তা করে আজকের মত আমরা সরে যাচ্ছি। তবে এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা থাকবে। বুধবারও সড়ক অবরোধের কর্মসূচি আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বরেন, এ ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি, পরে জানিয়ে দেয়া হবে।

ওই সময়ই রামপুরা ব্রিজ থেকে ইস্ট ওয়েস্ট, ভাটারা থেকে ইউআইটিএস এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রধান গেইটে অবস্থান নেয়া চার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন থামিয়ে ফিরে যান।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হেড অব সিকিউরিটি মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) ইমরান বিকেল ৫টার দিকে শিক্ষার্থীদের জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করে উঠে যেতে বললে আন্দোলনকারীরা তা মেনে নিয়ে রাস্তা থেকে উঠে যান। এরপর বাকি তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ধীরে ধীরে সড়ক ছেড়ে গেলে যান চলাচল শুরু হয়।

লাশ ফেলে দেয়ার পরিকল্পনায় হামলা বললেন ঢাবি ভিসি: লাশ ফেলে বিভীষিকা সৃষ্টি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারকে অচল করার পরিকল্পনায় নিজ বাসভবনে হামলা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ভিসি প্রফেসর আখতারুজ্জামান। গতকাল সকালে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের ভিসি বাসভবন পরিদর্শনে যাওয়ার পর সাংবাদিকদের সামনে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, দুর্বৃত্তরা চেয়েছিল একটি লাশের রাজনীতি করতে, রক্তের রাজনীতি করতে। এটি একবারেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে... হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে রক্তপাত ঘটিয়ে একটি বিভীষিকাময় পরিবেশ সৃষ্টি করে বিশ্ববিদ্যালয়কে অচল করা, সরকারকে অচল করা, অস্থিতিশীল একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা। এটাই আমার কাছে সকল আলামত মনে হয়। এর সাথে কোটার কোনো সম্পর্ক নেই।

এই হামলার সময় দুর্বৃত্তদের দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাল্টা ‘অ্যাকশনে’ না গিয়ে কেন নিরব ছিল তার যৌক্তিকতাও তুলে ধরেন ভিসি। তিনি বলেন, সিন্ডিকেট যথার্থই বলেছে, রাত ২টার দিকে যদি পুলিশ র‌্যাব অ্যাকশনে যেত তবে অনেক প্রাণহানি হতো, যেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়- দুর্বৃত্তদের এটাই ছিল প্রত্যাশা। পুলিশ এবং র‌্যাবের শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে দিয়ে আমরা এই দুর্বৃত্তকে দমন করিনি এবং সেটার জন্য আমরা যে প্রজ্ঞা এবং সাহসী একাগ্রতা এবং নৈতিক মানে উজ্জীবিত থেকেছি এবং বড় আকারের প্রাণহানি যে ঘটেনি সে কারণে সিন্ডিকেট সন্তোষ প্রকাশ করেছে।

ঢাবি ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ সদস্যদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইউনিফর্ম পরে ক্যাম্পাসে প্রবেশ না করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে এই তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে ডিএমপি'র রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার মারুফ হোসেন সরদার জানান, পুলিশ শাহবাগ ও ক্যাম্পাসের বাইরে কাছাকাছি এলাকায় অবস্থান করছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ঢাবি ক্যাম্পাসের কাছেই প্রয়োজনীয় স্থানগুলোয় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন আছে। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, ক্যাম্পাসের কোথাও পুলিশ নেই। ক্যাম্পাসের বাইরে মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ, দোয়েল চত্বর, শাহবাগ, চানখাঁর পুলের মোড় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আশেপাশে পুলিশ রয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফের উত্তেজনা শুরু হয়। সংসদে মতিয়া চৌধুরীর বক্তব্য, হলে হামলা ও পুলিশী হামলার প্রতিবাদে একটা গ্রুপ রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান নেয়। তারা সরকারের কাছ থেকে কোটা সংস্কারের লিখিত দাবি করেছে তিন দিনের মধ্যে। সকাল থেকে একটি গ্রুপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রথমে মানববন্ধন করে। পরে তারা রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে।

গভীর রাতে ঢাবির হলে ছাত্রলীগের তল্লাশি: কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের খুঁজতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিভিন্ন আবাসিক হলে তল্লাশি চালিয়েছে ছাত্রলীগ। এ সময় কয়েকটি হল থেকে অংশ নেয়া আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মারধর করার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। গত সোমবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত আটটি হলে এই ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, হলের যেসব শিক্ষার্থী কোটা সংস্কার আন্দোলনে গিয়েছিল তাদের রুমে গিয়ে হেনস্থা ও মারধর করেছে ছাত্রলীগ। হল শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের নেতৃত্বেই এ কাজ করে তারা।

জানা যায়, ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই হলের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাদের অনেককেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকায় তাদেরকে এ মারধর করা হয়। কেন্দ্রীয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের নির্দেশেই শিক্ষার্থীদের নির্দেশেই শিক্ষার্থীদের মারধর ও হেনস্থা করা হয়।

জানা যায়, রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীমউদদীন হলে এক শিক্ষার্থীকে মারধর করে ছাত্রলীগ। তাছাড়া হলের যেসব শিক্ষার্থী কোটা সংস্কারের আন্দোলনে গিয়েছিল তাদের রুমে গিয়ে হেনস্থা করা হয়। স্যার এ এফ রহমান ও মুহসিন হলেও এই ঘটনা ঘটে।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের মূল গেইটে হল শাখার সভাপতি বরিকুল ইসলাম বাধন ও সাধারণ সম্পাদক আল আমিনের নির্দেশে ছাত্রলীগ অবস্থান নেয়। ওই গেইট দিয়ে পরিচয় দিয়েই হলে প্রবশে করতে হয় শিক্ষার্থীদের। কোটা সংস্কারের আন্দোলনের সাথে কেউ যুক্ত থাকলে তাদরেকে বিভিন্নভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে।

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া ও সুফিয়া কামাল হলেও ছাত্রলীগ নেতারা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত করে। অভিযোগ উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. শহিদুল্লাহ ও ফজলুল হক হলে বহিরাগতদের নিয়ে ছাত্রলীগের হল সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হেনস্থা করা হয়, অনেক শিক্ষার্থীকে মারধর করে বলেও জানা যায়।

উল্লেখ্য, সরকারি চাকরির কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ এর ব্যানারে আন্দোলনরতদের সঙ্গে রোববার সারা রাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষ চলে। এরপর সোমবার বিকালে সচিবালয়ে সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধি দলের বৈঠকে ৭ মের মধ্যে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সিদ্ধাস্ত আসে। বৈঠকে অংশ নেয়া ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ৭ মে পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দিলেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থানে থাকা আন্দোলনকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

গত সোমবার সচিবালয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে দলটির একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কোটা সংস্কারের বিষয়ে বৈঠকে বসেন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা। আলোচনা শেষে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সব ধরনের আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। যদিও সাধারণ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা এ সিদ্ধান্ত না মেনে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। মঙ্গলবার সকাল থেকে বিক্ষিপ্তভাবে আন্দোলন কর্মসূচি পরিচালিত হলেও কৃষিমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ফের সমন্বিত আন্দোলন কর্মসূচিতে নামেন শিক্ষার্থীরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ