ঢাকা, বৃহস্পতিবার 12 April 2018, ২৯ চৈত্র ১৪২৪, ২৪ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সংসদে নারী কোটা প্রসঙ্গে

দেশে যখন সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বিরোধী দুর্বার আন্দোলন চলছে ঠিক তেমন এক জটিল সময়ে সংবিধান ও আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদে কোটা বিষয়ক নতুন একটি বিল বা প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। এই কোটা সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসন সংক্রান্ত। গত ১০ এপ্রিল আইনমন্ত্রী সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় সংশোধনী হিসেবে উত্থাপিত প্রস্তাবে বলেছেন, ২০১৮ সালের তথা বর্তমান সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর আরো ২৫ বছর পর্যন্ত কোটার ভিত্তিতে সংসদে নারীদের জন্য ৫০টি আসন সংরক্ষিত থাকবে। উত্থাপিত বিলটিকে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। এটা যাচাই-বাছাই করে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে পেশ করা হবে। গৃহীত হলে বিলটি সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনীর অংশ হিসেবে পরিগণিত হবে। 
উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য আসন সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাটি শুরু হয়েছিল ১৯৭২ সালের সংবিধানে। তিনশ’ আসনের সংসদে ১৫টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার বিধান ছিল ওই সংবিধানে। বিধানটি করা হয়েছিল ১০ বছরের জন্য। ১৯৭৮ সালে আসন সংখ্যা দ্বিগুণ অর্থাৎ ৩০ করা হয়। মেয়াদও ১৫ বছর বাড়ানো হয়। এরপর ২০০৪ সালে চার দলীয় জোট সরকারের সময় সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে একদিকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৫ করা হয়, অন্যদিকে সময়সীমা করা হয় ১০ বছর। সে অনুযায়ী ২০১৪ সালে এই কোটা ব্যবস্থার অবসান ঘটার কথা ছিল।
কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার আবারও সংবিধানে সংশোধনী আনে এবং ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০-এ উন্নীত করে। সংবিধানের ৬৫ (৩) অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী বর্তমান দশম সংসদের অবসান ঘটার সঙ্গে সঙ্গে অর্থাৎ ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারির পর সংরক্ষিত নারী আসনের বিধানটিও আর কার্যকর থাকতো না। এমন অবস্থার মুখোমুখি এসেই আওয়ামী লীগ সরকার আবারও সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
নারী আসনের কোটার ব্যাপারে কথা উঠেছে অনেক কারণেই। একটি কারণ তাদের নির্বাচনের পন্থা বা প্রক্রিয়া। সংবিধানের নির্দেশনা হলো, এসব নারী এমপিকে নির্বাচিত করবেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসা এমপিরা। কিন্তু বাস্তবে কখনো, কোনো পর্যায়েই পৃথকভাবে ভোটের আয়োজন করা হয়নি। বিষয়টি শুরু থেকেই ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন সে দলের মনোনীত নারীরাই কেবল সংরক্ষিত আসনে এমপি হওয়ার সুযোগ পান। এখনো সে ব্যবস্থাই চলছে।
আপত্তির দ্বিতীয় কারণ হলো, নারী এমপিদের নির্বাচিত করার পন্থাটি মোটেই গণতন্ত্রসম্মত নয়। নামে এমপি হলেও যেহেতু জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেন না, সেহেতু দেশ ও জনগণের প্রতিও তারা কোনো দায়দায়িত্ব বোধ করেন না। জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিতারও কোনো বিধান নেই। মনোনয়ন পাওয়া থেকে সংসদে ভূমিকা পালন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে নারী এমপিরা সব সময় ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন। এই প্রক্রিয়ায় জনগণের তথা সাধারণ ভোটারদের কোনো ভূমিকাই থাকে না। প্রধান ভূমিকা থাকে ক্ষমতাসীন দলের।
আপত্তির তৃতীয় কারণ হলো, নারী এমপিদের জন্য কোনো নির্বাচনী এলাকা নির্দিষ্ট করা নেই, যেমনটি রয়েছে সাধারণ এমপিদের জন্য। জনগণের ভোটে নির্বাচিত তিনশ’ এমপির নির্বাচনী এলাকার জনগণ যে কোনো সমস্যায় বা প্রয়োজনে নিজ নিজ এলাকার এমপিদের কাছে যাওয়ার এবং গিয়ে সমাধান চাওয়ার সুযোগ ও অধিকার ভোগ করেন। অন্যদিকে নারী এমপিদের কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা না থাকায় জনগণের প্রতি তাদের কোনো দায়দায়িত্ব থাকে না। তারা ব্যস্ত থাকেন শুধু সংসদে বসে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের সমর্থনে টেবিল চাপড়ানোর জন্য। ঘটনাক্রমে মাঝেমধ্যে বক্তব্য রাখলেও সেসবও তারা রাখেন সরকারের পক্ষেই। সবই করেন তারা নিজেদের এমপির পদ টিকিয়ে রাখার জন্য। এর বাইরে জনস্বার্থে আর কোনো কারণে তাদের কোনো চেষ্টা চালাতে দেখা যায় না।
এসব কারণেই নারীদের জন্য জাতীয় সংসদে আসন সংরক্ষিত রাখার কোটা বা বিধানটির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠেছে। এমনকি অনেক নারী নেত্রীও সম্প্রতি সোচ্চার হয়ে বলেছেন, নারীদের ‘ক্ষমতায়ন’ সত্যি উদ্দেশ্য হলে সংরক্ষণের বিধানটিই তুলে দেয়া উচিত। তেমন অবস্থায় রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকান্ডে সক্রিয় নারীরা নিজেদের যোগ্যতায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসতে পারবেন। এটাই হতে পারে নারীদের ‘ক্ষমতায়ন’ এবং জাতীয় জীবনে ভূমিকা পালন করতে দেয়ার প্রধান পন্থা।
নারী নেত্রীসহ বিশিষ্টজনেরা আরো বলেছেন, রাতারাতি তেমন আয়োজন না করা গেলে এমন বিধান করা দরকার, যার মাধ্যমে নারীদের জন্য পঞ্চাশটি পৃথক নির্বাচনী এলাকা সৃষ্টি করা হবে। এসব আসনে কেবল নারীরাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। ভোটও দেবেন শুধু নারী ভোটাররা। তেমন অবস্থায় নারীদের মর্যাদা অনেক বেড়ে যাবে এবং কারো পক্ষে নারী এমপিদের অন্তত ব্যঙ্গ করার সুযোগ থাকবে না।
নারী নেত্রী এবং বিশিষ্টজনদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আমরাও মনে করি, বিষয়টি নিয়ে সরকার তথা ক্ষমতাসীন দলের এখনই উদ্যোগ নেয়া দরকার। পরিকল্পিত সপ্তদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই সরকারের উচিত নারীদের জন্য নির্বাচনের বিধান তৈরি করা। এভাবেই নারীদের সত্যিকারের ‘ক্ষমতায়ন’ সম্ভব। একই সঙ্গে সম্ভব নারীদের মর্যাদা বাড়ানোও। না হলে যতো বেশি সময়ের জন্য এবং যতো বেশিসংখ্যক আসনই তাদের জন্য বরাদ্দ করা হোক না কেন, নারীরা কেবল ‘অবলা’ই থেকে যাবেন না, একথাও বলা হবে যে, তারা আসলে ক্ষমতাসীনদের ‘দয়া-দাক্ষিণ্যে’ সংসদে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন! এজন্যই নারী এমপিদের ব্যাপারে সংবিধানে সংশোধনী আনার আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি নারী আন্দোলনের নেত্রীদের সঙ্গেও মত বিনিময় করে সরকারের উচিত সকলের অভিমতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া। আমরাও নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে। কিন্তু সে পন্থা হওয়া উচিত গণতন্ত্রসম্মত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ