ঢাকা, বৃহস্পতিবার 12 April 2018, ২৯ চৈত্র ১৪২৪, ২৪ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এমন উদ্ভাবনে জাতির আত্মবিশ্বাস বাড়বে

দূষণ কখনো মানুষের কাম্য হতে পারে না। আর মানুষতো শব্দদূষণ কিংবা পরিবেশ দূষণের মধ্যে বসবাস করার জন্য সমাজবদ্ধ হয়নি। কিন্তু আমাদের সমাজ যেন এখন মানুষের আকাক্সক্ষার বিপরীতে চলতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। আকাক্সক্ষার বিপরীতে কারা চলছে, কেন চলছে? এই উল্টো যাত্রায় অজ্ঞতা, স্বার্থপরতা, দম্ভ কিংবা ক্ষমতার দাপট কতটা দায়ী? এসব বিষয় নিয়ে গবেষণা হতে পারে। তবে প্রশ্ন জাগে- দেশে সরকার আছে, প্রশাসন আছে; তারপরও নাগরিকরা নানা দূষণে পীড়িত হবে কেন? এখানে আরও বলার মতো বিষয় হলো, অন্য গ্রহ থেকে কোন এলিয়ন এসে কিন্তু মানুষকে পীড়িত করছে না; মানুষকে পীড়িত করছে অপরাধপ্রবণ কিছু মানুষই। এ কারণেই বারবার উঠে আসছে যথাযথ আইন এবং তার সঙ্গত প্রয়োগের কথা।
‘শব্দদূষণে অসুস্থ শহর’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে পত্রিকান্তরে। ৭ এপ্রিলে মুদ্রিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর শাহবাগ মোড় দিয়ে যাতায়াত করছে শত শত যানবাহন। কার আগে কে যাবে এই প্রতিযোগিতার সঙ্গে চালকরা বাজিয়ে চলেছেন বিকট শব্দে হর্ন। রাস্তার দুই পাশে হাসপাতালের দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে ‘সামনে হাসপাতাল, হর্ন বাজাবেন না’। কিন্তু এদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই চালকদের। শুধু শাহবাগ নয়, পুরো রাজধানীর চিত্রই এটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শব্দদূষণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। শব্দদূষণের মাত্রা স্থানভেদে কেমন হবে সে ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে সংস্থাটির। তাদের হিসাব অনুযায়ী কোন এলাকায় ৬০ ডেসিবল মাত্রার বেশি শব্দ হলে তা দূষণের আওতায় পড়বে। অফিসকক্ষ ও শ্রেণীকক্ষে শব্দের মাত্রা ৩০-৪০ ডেসিবল, হাসপাতাল এলাকায় ২০-৩৫ ডেসিবল, রেস্তোরাঁয় ৪০-৬০ ডেসিবল শব্দমাত্রা সহনীয়। ৬০ ডেসিবলের বেশি শব্দে মানুষের শ্রবণশক্তি সাময়িক নষ্ট হতে পারে। ১০০ ডেসিবল শব্দে মানুষ চিরতরে শ্রবণশক্তি হারাতে পারে। শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত শব্দের কারণে মানুষ আক্রান্ত হয় বিভিন্ন ধরনের ব্যধিতে। সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মনিলাল আইচ লিটু বলেন, স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করলে ব্যস্ত জায়গায় শব্দ মাত্রা সর্বোচ্চ ৬০-৭০ ডেসিবল থাকতে হবে। কিন্তু আমরা বিভিন্ন সময় গবেষণা করে দেখেছিÑ ঢাকার ফার্মগেট, শাহবাগ, মিরপুর, পল্টন, মতিঝিল, কারওয়ান বাজার, গাবতলী, মহাখালীর মতো ব্যস্ত এলাকায় শব্দের মাত্রা সবসময় ৯০-১০০ এর বেশি থাকে। আর এ শব্দদূষণের কারণে মানুষের শ্রবণশক্তি কমে যাচ্ছে। এছাড়া আক্রান্ত হচ্ছে পেটের আলসার, উচ্চ রক্তচাপ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণসহ নানা রোগে। যারা বেশি সময় ধরে অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকেন তাদের আচরণ হয় সাংঘর্ষিক এবং মেজাজও খিটখিটে হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে উপলব্ধি করা যায়, শব্দ দূষণ মানুষের জন্য কতটা মারাত্মক। এ কারণেই হয়তো পত্রিকায় শিরোনাম করা হয়েছে ‘শব্দদূষণে অসুস্থ শহর’। আমরাতো অসুস্থ হতে রাজধানীতে আসিনি। মানুষ রাজধানীতে এসেছে কাজ করতে এবং তারা ট্যাক্সও প্রদান করছে। তাই শব্দদূষণসহ বিভিন্ন দূষণ থেকে নাগরিকদের রক্ষা করা প্রশাসন ও সরকারের দায়িত্ব। তারা এ দায়িত্ব কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারে না।
নানাবিধ দূষণের মধ্যে পরিবেশ দূষণ এখন মারাত্মক হয়ে উঠেছে। আর দেশের পরিবেশ রক্ষার কথা উঠলে সঙ্গতভাবেই সুন্দরবনের কথাও উঠে আসে। বর্তমান সরকারও ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন সময় সুন্দরবন ও দেশের পরিবেশ রক্ষায় নানা অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। কিন্তু পর্যবেক্ষক ও পরিবেশবিদরা ওইসব অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন তেমন লক্ষ্য করছেন না। প্রসঙ্গত এখানে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের অভিমত উল্লেখ করা যায়। ৭ এপ্রিল প্রথম আলো পত্রিকায় মুদ্রিত অভিমতে তিনি বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে সত্তর দশক থেকে সুন্দরবনে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার সমস্যা ছিল। ফলে সরকারের উচিত ছিল ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে সুন্দরবনসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যায়। কিন্তু আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার প্রথমবারের মত ক্ষমতায় এসেই ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প করার উদ্যোগ নেয়। সুন্দরবনের চারপাশের জমি ও জলাভূমি রক্ষা না করে উল্টো তা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে দিতে দেখি।
অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আরো বলেন, সবচয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে ধরনের কর্মকাণ্ড সুন্দরবন ও দেশের পরিবেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে, সরকার নিজেই তার নেতৃত্ব দিচ্ছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ছাড়াও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুন্দরবনের আধা কিলোমিটারের মধ্যে বড় খাদ্য গুদাম নির্মিত হয়েছে। ওই এলাকায় শিল্পকারখানা হওয়ার সুবিধা করে দিতে সড়ক, বিমান ও নৌচলাচলের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। আর দেশের যেসব বন ও জলাভূমিগ্রাসী গোষ্ঠী দেশে সক্রিয় আছে, তাদের থামানোর বদলে সরকার তাদের সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তাদের প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিয়ে আইন সংশোধন করছে। দেশের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এমনিতেই দুর্বল। তার ওপর এই আইন সংশোধন করে সরকার এলপিজি ও পেট্রোকেমিক্যালের মতো কারখানাকে লাল তালিকা থেকে বাদ দিয়ে সবুজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে সুন্দরবন ও পরিবেশ বিধ্বংসী হিসেবে নিজেদের ভূমিকাকে আরও স্পষ্ট করলো। এই সংশোধন পরিবেশ ও বনগ্রাসী শক্তিকে আর এক দফা প্রণোদনা ও উৎসাহ দিল। সরকার ইউনেসকোর কাছে গিয়ে অঙ্গীকার করে এসেছে, সুন্দরবন ও তার আশপাশের এলাকার ওপর একটি কৌশলগত, পরিবেশগত সমীক্ষা করার আগে কোনো শিল্পকারখানার অনুমতি দেবে না। কিন্তু দেশে এসে একের পর এক এলপিজি ও অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ওই এলাকায় কারখানা করার অনুমতি দিচ্ছে। এটা পরিষ্কারভাবে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে টিকিয়ে রাখার শর্তভঙ্গ। একই সঙ্গে সরকার জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) যে ১৩টি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করে এসেছে, সুন্দরবনের পাশে শিল্পকারখানা ও এলপিজি এবং পেট্রোকোমিক্যাল টার্মিনালকে সবুজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে সরকার কমপক্ষে আটটি অঙ্গীকার ভঙ্গ করলো। একই সঙ্গে সরকার প্যারিস চুক্তিতে কার্বন নিঃসরণ কমানো ও পরিবেশ রক্ষায় যে অঙ্গীকার করেছে, এটি তারও বরখেলাপ। এসব তৎপরতা সরকারকে সুন্দরবন বিনাশী ও অপরাধী হিসেবে দেশের ভেতরে-বাইরে পরিচয় করাবে; যা একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে।
আমরা জানি, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে যুক্ত আছেন। তিনি এবার সরকারের সুন্দরবন ও পরিবেশ বিধ্বংসী কিছু তৎপরতার কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। আমরা আশা করবো, সরকার বিষয়টি বিবেচনায় আনবে, আর আনু মুহাম্মদের বক্তব্যে যদি কোনো ভুল থাকে তাও জাতির সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরবে। কারণ বিষয়টি জাতীয় বিষয়।
পরিবেশ দূষণের দৌরাত্ম্যের মধ্যেও ইতিবাচক খবর আছে। ‘পাটের নতুন দিগন্ত’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে পত্রিকান্তরে। ৭ এপ্রিল মুদ্রিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, দেখতে হুবহু পলিথিনের মতো, কিন্তু এগুলো পলিথিনতো নয়ই, কোন রকম প্লাস্টিক উপকরণও এতে নেই। ব্যাগগুলো বানানো হয়েছে কেবলই পাটের আঁশ ব্যবহার করে। এই আঁশ থেকে পচনশীল পলিমার ব্যাগ তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খান। আমদানি করা যেসব পচনশীল পলিমার ব্যাগ বাজারে পাওয়া যায় তার ৫ ভাগের ১ ভাগ দামেই এটি পাওয়া যাবে। রাজধানীর ডেমরার লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে পরীক্ষামূলকভাবে স্বল্প পরিমাণে তৈরি হচ্ছে এ পলিমার ব্যাগ। আয়োজন চলছে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার। এরই মধ্যে দেশের ভেতরে, বিশেষ করে রফতানিমুখী শিল্প মালিকরা এ ব্যাগ কেনার জন্য বায়না দিতে শুরু করেছেন। দেশের বাইরে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকেও এই ব্যাগের চাহিদা আসছে।
পাটের তৈরি এই পলিব্যাগ সম্পর্কে বলা হয়েছে, এটি দেখতে বাজারের সাধারণ পলিথিন ব্যাগের মতো মনে হলেও আসলে তা অনেক বেশি টেকসই ও মজবুত। পাটের সূক্ষ্ম সেলুলোজকে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা এ ব্যাগ কয়েক মাসের মধ্যে পচে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। এটি এই ব্যাগের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ফলে এটি পরিবেশ দূষণের কারণ হবে না। এটিকে তাই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে। পাটের আঁশ থেকে পলিমার তৈরির এই পদ্ধতির উদ্ভাবক বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা অধ্যাপক মোবারক আহমদ খান গত ২০ বছর ধরে পাটের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করছেন। এই পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি তাকে ২০১৫ সালে স্বর্ণপদক দেয়। উল্লেখ্য যে, ২০০৯ সালে এই বিজ্ঞানী পাটের সঙ্গে পলিমারের মিশ্রণ ঘটিয়ে মজবুত, তাপবিকিরণরোধী ও সাশ্রয়ী ঢেউটিন ‘জুটিন’ তৈরি করেছিলেন।
চারদিকে নানা ব্যর্থতা ও হতাশার মধ্যে এমন উদ্ভাবন আমাদের আশাবাদী হতে অনুপ্রাণিত করে। এ জন্য আমরা কর্মবীর ও বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খানকে জানাই অভিনন্দন। তিনি জানিয়েছেন, দুবাইয়ে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মাসে ২৫ হাজার পলিব্যাগ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন সিটি কাউন্সিল কর্তৃপক্ষও এই পলিব্যাগ কিনতে চান। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বিপুল পরিমাণে এই ব্যাগ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই রকম ইতিবাচক উদ্ভাবনের প্রতিভাবানরা এগিয়ে এলে দেশ শুধু অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে না, জাতি হিসেবেও আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ