ঢাকা, বৃহস্পতিবার 12 April 2018, ২৯ চৈত্র ১৪২৪, ২৪ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ফুটবল, ক্রিকেটের হতাশা মোহামেডান কাটাবে হকিতে?

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : খেলাধুলায় দেশের পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোর মধ্যে অন্যতম মোহামেডান। ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অনেক ইতিহাস আর খেলোয়াড় তৈরির কাজটি বেশ দক্ষতার সহিত করে আসছে তারা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যেন সেই ধারা আর বজায় থাকছেনা। ফুটবল, ক্রিকেট আর হকিতে বছরের পর বছর ধরে পরিচয় দিচ্ছে ব্যর্থতার। সর্বশেষ ফুটবল ও ক্রিকেট মৌসুমে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফুটবলে তার আগে মৌসুমে কোনরকমে রেলিগেশন এড়ালেও এবার পঞ্চম হয়েছে। আর ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো সুপার লিগে খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এখন হকিতে সেই ব্যর্থতা কাটানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ক্লাবটি। যদিও শুরুতে প্রিমিয়ার ডিভিশন হকির দলবদলে অংশ না নেওয়ার ইঙ্গিতই ছিল। অনেকটা নীরবে এবং শেষের দিকে এসে খেলোয়াড় বদল করেছে। কিন্তু কতটা সফল হবে সেই সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
কারণ ভালমানের দল গড়ে এরই মধ্যে আলোচনায় আবাহনী লিমিটেড ও মেরিনার ইয়াংস। তবে ক্রিকেটে ব্যর্থতটা ভুলতে পারছেনা দর্শক সমর্থকরা। ঢাকার ক্রীড়াঙ্গনে ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। এক দশকেরও বেশি সময় আগে নামের সাথে যুক্ত হয়েছিল লিমিটেড শব্দটি। এরপর সাফল্যের পথে আরো বেশি ও দ্রুতগতিতে ছোটার কথা থাকলে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি এই তিন ইভেন্টে নামের প্রতি সুবিচার করতে পারছেন না ক্লাবটি। দেখা যাচ্ছে ভাল দল গড়েও সাফল্য পাচ্ছেনা মতিঝিল ক্লাব পাড়ার দলটি। সর্বশেষ ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে সুপার সিক্সে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে শামসুর রহমান শুভ’র দল। অথচ দলবদলের সময় যে দল গড়েছিল তাতে চ্যাম্পিয়ন ফাইটেই থাকার কথা ছিল তাদের। কিন্তু মাঠের ক্রিকেট বলছে অন্য কথা। ফুটবল আর হকির ব্যর্থতা যে এখানেও টেনে এনেছে দলটি। আর সমর্থকরা চাইছেন বড় ধরনের পরিবর্তন। কারণ শিরোপা জয় যেন সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। সাকিব আল হাসানের মতো খেলোয়াড় দলে নিয়ে কোচিং স্টাফও মানসম্পত নিয়েছিল দলটি। কিন্তু পরিণত খেলোয়াড়দের কাছ থেকে ভাল পারফরম্যান্স পাওয়ার বিপরিতে খারাপ ফলই পাওয়া গেছে। যেভাবে চলছে তাতে কবে নতুন পথের দিশা পাবে মোহামেডান সেটি এখন বলার মতো মানুষও খুজে পাওয়া যাচ্ছেনা। ফুটবলে তো শিরোপা যেন দূরের বাতিঘর হয়ে গেছে। পেশাদার যুগে প্রবেশের পর এখনো পর্যন্ত শিরোপাশূন্য তারা।
প্রথম তিন আসরে টানা তিনবার রানার্সআপ হওয়াটাই এখন পর্যন্ত বড় সাফল্য হয়ে আছে। এরপর থেকে তো গড়পড়তা সাফল্য আসছে। সর্বশেষ আসরে সেরা তিনে থাকতে পারেনি দলটি। সে কারণে বেশিরভাগ ম্যাচেই গ্যালারী ফাকা তাকে। তবে ক্রিকেটে ভাল দল গড়ার পরও সাফল্য না পাওয়ায় বেশি হতাশা ছড়িয়েছে। ফুটবলের মতো ক্রিকেটেও মোহমেডানের খারাপ সময়ের পথচলা কি শুরু হয়ে গেছে এই প্রশ্নও রাখছেন কেউ কেউ। ঢাকার সবচেয়ে মর্যাদার আসর প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে সর্বোচ্চ নয়বারের চ্যাম্পিয়ন তারা। আগে কখনও সুপার লিগে উঠতে না পারার নজির ছিল না। এবার সেই দৃষ্টান্তও স্থাপন করা হয়ে গেছে। ২০০৯ সালে সর্বশেস শিরোপা নিয়ে উল্লাস করার মতো সুযোগ হয়েছিল সাদা কালো প্রতিনিধিদের। এখন খেলোয়াড়দের ক্লাবের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব, নাকি যোগ্য কর্মকর্তার সংকট- মোহামেডানের ব্যর্থতা কি কারণে সেটাও খোজা শুরু হয়েছে। দলটির সাবেক খেলোয়াড়রা মনে করেন, পেশাদার কাঠামো তৈরি করতে না পারার কারণেই এমন অবস্থা। মৌসুমের শুরুতে মোহামেডান দল গোছানোর পরই শিরোপার আলোচনা থেকে তাদের বাদ দিয়েছিলেন অনেকেই। যদিও মাঝপথে প্রথম বিভাগে অবনমনের শঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তারা অবনমন এড়াতে পারলেও সুপার লিগে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে। টুর্নামেন্টে সপ্তম দল হিসেবে লিগ শেষ করেছে মোহামেডান। মাঝের তিনটি দলের জন্য এবারের মতো শেষ হয়ে গেছে প্রিমিয়ার লিগ। তাদেরকে সুপার লিগের পাশাপাশি রেলিগেশন লিগও খেলতে হবেনা। কেন এই ব্যর্থতা জানতে চাইলে দলের অধিনায়ক শামসুর রহমান শুভ বলেন, ‘টিম কম্বিনেশনই প্রধান সমস্যা ছিল এবার। আর আমরা যে খারাপ খেলছিলাম তেমনটা নয়। তবে দল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমরা ভালো খেলতে পারিনি। মোহামেডানের মতো দলের সুপার লিগে না উঠতে পারায় আমি নিজেও হতাশ’।
একটি দল হয়ে খেলতে না পারার প্রমাণটা এবার বেশ কয়েকটি ম্যাচেই পেয়েছে মোহামেডান। এই যেমন গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্সের বিপক্ষে ম্যাচে ১৩৮ রান তাড়া করতে নেমেও মাত্র ১০৮ রানে অলআউট হয়েছিল সোহেল ইসলামের শীষ্যরা। সেটাই দলকে পিছিয়ে দিয়েছে। আর লো স্কোরিং সেই ম্যাচটি জিতে সুপার লিগের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল গাজী। অথচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের দলের সামনে চোঁখ রাঙ্গাচ্ছিল রেলিগেশনের শংকা। সেখান থেকে দলীয় পারফরসম্যান্সের উপর ভিত্তি করেই দল পৌছে গিয়েছিল সুপার লিগে। আর তাতে করে রক্ষা হয়েছে গত আসরে চ্যাম্পিয়ন দলের মানও। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক এএসএম ফারুকের হাত ধরে ১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে ঢাকা লিগের প্রথম শিরোপা জিতেছিল মোহামেডান। আর সর্বশেষ শিরোপা জিতেছিল খালেদ মাসুদ পাইলটের নেতৃত্বে। এ অবস্থা থেকে উত্তোরণের উপায় কি জানতে চাইলে দলটির সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসান বলেন, ’আমি ম্যাচ রেফারী হিসেবে মোহামেডানের পারফরম্যান্স দেখেছি। এটি শুধু একটি ক্লাব নয়, এটা একটি ইন্সটিটিউশনের মতো। সুপার পাওয়ারের ক্লাব।
এবারের লিগে সুপার সিক্সে উঠতে না পারায় আমি বেশ হতাশ হয়েছি। সত্যি কথা বলতে কি পেশাদার কাঠামো তৈরি হয়নি মোহামেডানে। সাফল্য পেতে হলে পেশাদারী হবে হবে অন্য কিছু নয়।’ আরক সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট বলেন, ‘এবারের লিগে মোহামেডান যে দল গঠন করেছিল তাতে সুপার সিক্সে খেলার কথা ছিল। কিন্তু প্লেয়ার্স বাই চয়েজে যেভাবে দল গঠন হচ্ছে তাতে আসলে কারও কিছু করার নেই। এখানে সব দলই সমান হয়ে যায়। তারপরও কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতে দল গঠনে চিন্তাভাবনার পরিবর্তন আনতে হবে, তাহলেই সাফল্য আসবে।’ অন্যসব খেলার মতোই মোহামেডানের ক্রিকেট দলের অবস্থা। হতাশা থেকে মুক্তির পথ খুজছে ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্লাবটি। দলটির যেমন রয়েছে দর্শক সমর্থন তেমনি ঐতিহ্য। কিন্তু কোন কিছুই এখন আর শিরোপা জেতাতে পারছেনা ক্লাবটিকে। মাঝমধ্যে শিরোপা জয় থেকে অবনমনের শংকাও তৈরি হয়। সে কারণে দলে খেলা সাবেক ক্রিকেটারদের মধ্যে বিরাজ করেছে চমরম হতাশা। বিশেষ করে দলটির সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসান ম্যাচ রেফারি হিসেবে খুব কাছ থেকে দলের পরাজয় দেখেছেন। তার কাছে দলের পরাজয়ের কারণ জানতে চাওয়া হলে বলেন, ’আমি আসলে সেভাবে মূল্যায়ন করতে পারবনা। তবে দলের অধিনায়ক শামসুর রহমান শুভ’র কথা যদি ধরি তাহলে আরো বেশি হতাশ হতে হয়। দলের কেলোয়াড়দের কমিটমেন্ট নিয়ে যে কথা শুব বলেছেন সেটাকে আমলে নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা আমি খুব বেশি হতাশ দলের এই পারফরম্যান্সে’।
রকিবুল হাসানের পর আশির দশকে দলের দায়িত্বভার তুলে নিয়েছিলেন মিনহাজুল আবেদিন নান্নু। বর্তমানে প্রধান র্নিাচকের দায়িত্ব পালন সাবেক এ ক্রিকেটার বলেন, ’এবার যে ধরনের ক্রিকেট খেলেছে দলটি তাতে হতাশ না হয়ে উপায় নেই। এটাকে অর্জনের বিসর্জন দেওয়ার মতো বিষয়। এমন একটি দলের সুপার লিগে খেলতে না পারাটা হতাশা ছাড়া আর কিছুই নয়’। দলে খেলা জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল বলেন, ‘প্লেয়ার্স বাই চয়েজের কারণে দলগুলোর মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য থাকেনা। মোহামেডানের মত ঐতিহ্যবাহি দল সুপার লিগের বাইরে, মনে হলেই কষ্ট লাগে। এ থেকের বের হতে হবে’। এখন এই অবস্থা থেকে আসলে উত্তরণের উপায় কি সেটা নিয়েই বেশি আলোচনা হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ