ঢাকা, শুক্রবার 13 April 2018, ৩০ চৈত্র ১৪২৪, ২৫ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পহেলা বৈশাখ প্রসঙ্গে

আজ ১৪২৪ বঙ্গাব্দের শেষদিন, ৩০ চৈত্র। আগামী কাল পহেলা বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী এই দিনটিকে বরণ করা হয় সর্বজনীন উৎসবের মধ্য দিয়ে। মানুষ মেতে ওঠে আনন্দে। এ বছরও উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন ধরে। প্রস্তুতি নিয়েছে এক শ্রেণীর মানুষ, যাদের মধ্যে শহুরে অবস্থাপন্নদের কথা উঠেছে বিশেষ কিছু কারণে। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার বিলাসিতা। এর জন্য নগদ অর্থে মূল্যও তারা যথেষ্টই গুনছেন বলে গণমাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে। 

যেমন গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পদ্মা পারের মাওয়ায় মৎস্য আড়তগুলোতে এরই মধ্যে প্রচুর ইলিশের মজুত তৈরি করেছে ব্যবসায়ীরা। এসব ইলিশ বিক্রিও করছে তারা যথেচ্ছ দামে। মঙ্গলবার একজন ব্যবসায়ী দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের এক হালি অর্থাৎ চারটি ইলিশ বিক্রি করেছে ২৭ হাজার টাকায়। সে হিসাবে প্রতিটি ইলিশের দাম পড়েছে ৬ হাজার ৭৫০ টাকা। মাছগুলো কিনে নিয়ে গেছেন ঢাকা থেকে আগত একজন, যার পরিচিতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলার অপেক্ষা রাখে না। 

অথচ পহেলা বৈশাখের ইতিহাস কিন্তু এই শ্রেণীর মানুষের বিলাসিতা ও অপসংস্কৃতি কর্মকান্ডকে সমর্থন করে না। প্রসঙ্গক্রমে বঙ্গাব্দ তথা বাংলা বর্ষের ইতিহাস স্মরণ করা দরকার। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, বাংলা এই সালের সূচনা করেছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর। উদ্দেশ্য ছিল  ফসলের ঋতুর ভিত্তিতে খাজনা আদায় করা। এর ফলে কৃষকের পক্ষে খাজনা দেয়ার সময় অর্থাৎ কখন খাজনা দিতে হবে তা মনে রাখা সহজ হতো। সরকারও বছরের বিশেষ সময়ে সহজে খাজনা আদায় করতে পারতো। নববর্ষের উৎসবও শুরু হয়েছিল তখন থেকেই। এই তথ্যের আলোকে বলা যায়, নতুন বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ সম্পূর্ণরূপেই কৃষিভিত্তিক একটি দিন। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে যে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল সেটাও ছিল কৃষিভিত্তিক। 

এদেশের মানুষের জীবনেও এর রয়েছে নানামুখী প্রভাব। দিনটিকে শুভ মনে করা হয় বলে অনেক কৃষক পহেলা বৈশাখে জমিতে হাল দেয়। অনেকে ফসলের বীজ বোনে, রোপণ করে শস্যের চারা। দোকানদার, মহাজন ও ব্যবসায়ীরা হালখাতার মাধ্যমে পুরনো হিসাব চুকিয়ে নতুন হিসাবের সূচনা করে। সমাজের অন্যান্য শ্রেণী ও পেশার মানুষও দিনটিকে আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে উদযাপন করে। গ্রাম থেকে শহর-নগর-বন্দর পর্যন্ত সর্বত্র আয়োজিত হয় বৈশাখী মেলা। এসব মেলায় হরেক রকমের পণ্য নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসে কামার-কুমার ও ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা। মেলায় থাকে মাটির পুতুলসহ খেলনা এবং দই ও মুড়ি-মুড়কির মতো উপাদেয় নানা খাবার। মেলা পরিণত হয় সাধারণ মানুষের মিলন মেলায়। 

অর্থাৎ পান্তা এবং ২৭ হাজার টাকা হালির ইলিশ খাওয়া কখনো গ্রাম বাংলার তথা বাংলাদেশের ঐতিহ্য ছিল না। এটা চালু করেছেন ফিলদি রিচেরা। বিষয়টিকে বাংলা নববর্ষের মূল চেতনার সঙ্গেও মেলানোর উপায় নেই। কারণ, গ্রাম বাংলার কোনো অঞ্চলেই বছরের এ সময়ে ইলিশ পাওয়া যায় না। তা সত্ত্বেও কিছু মানুষ নিষিদ্ধ সে ইলিশকে নিয়েই মেতে ওঠেন। সঙ্গে আবার খান পান্তা ভাত! অথচ গ্রাম বাংলার মানুষ কখনো ইলিশ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার কথা কল্পনা করতে পারে না। তারা পান্তা খায় নুন-পেঁয়াজ আর শুকনো মরিচ দিয়ে। সেটাও খায় বাধ্য হয়েÑ ভালো কিছু খাওয়ার উপায় নেই বলে। কেউই অন্তত ইলিশ খায় না, পায় না বলে খেতেও পারে না। অর্থাৎ পান্তা-ইলিশের সঙ্গে ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশের কৃষক ও সাধারণ মানুষের চিন্তা-বিশ্বাস ও সংস্কৃতির কোনো মিল নেই। 

আমরা মনে করি, নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের চিন্তা-বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী কর্মকান্ডের অবসান ঘটানো দরকার। একই দেশে নববর্ষ উদযাপনের এই বৈষম্য ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার এবং নববর্ষ উদযাপনের মূল অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সময় এসেছে বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ