ঢাকা, শুক্রবার 13 April 2018, ৩০ চৈত্র ১৪২৪, ২৫ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আলুর পর টমেটো এবং কৃষকের হাল

আশিকুল হামিদ : ছবিটি দেখে অবাকই হয়েছিলাম। গত ৭ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় ওপরের দিকে ছাপানো ছবিটি দেখে প্রথমে মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের না হলেও সেটা হয়তো অন্য কোনো দেশের বা বিশেষ কোনো অঞ্চলের মানচিত্র। নিচের দিকে কিছুটা সবুজ থাকলেও ছবির বেশিরভাগ ছিল লালÑ যেন সেই ‘লালে লাল’-এর মতো অবস্থা! কিন্তু ভুলের অবসান হলো ক্যাপশনের পাশাপাশি পুরো রিপোর্ট পড়ার পর। না, ওটা কোনো দেশ বা অঞ্চলের মানচিত্র নয়, হাজার হাজার টমেটোর ছবিÑ সংখ্যায় এমনকি কয়েক লাখও হতে পারে। টমেটোগুলোকে জামালপুর সদর উপজেলার শরীফপুরের একটি ডোবায় ফেলে দেয়া হয়েছে। রাগে-দুঃখে ফেলে দিয়েছে টমেটো চাষিরা। 

এর কারণ সম্পর্কেও তথ্য রয়েছে প্রকাশিত রিপোর্টে। ভোক্তা তথা সাধারণ মানুষ যখন প্রতি কেজি টমেটো ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দরে কিনে খাচ্ছে, চাষিরা তখন তিন-চার টাকায়ও বিক্রি করতে পারছে না। ফলে লোকসানই কেবল গুনতে হচ্ছে না, হতাশাও গ্রাস করছে তাদের। এরই প্রতিক্রিয়ায় শত শত মণ টমেটো চাষিরা আশপাশের ডোবায় এবং রাস্তার ধারে ফেলে দিচ্ছে। অনেকে আবার ক্ষেতেই পচিয়ে ফেলার পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা বলেছে, পচা টমেটো তাদের ক্ষেতের জন্য সারের কাজ করবে! 

উদ্বেগের কারণ হলো, শুধু জামালপুরে নয়, দেশের অন্য সব এলাকায়ও একই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কোনো হাট-বাজার বা মোকামেই টমেটো বিক্রি করতে পারছে না চাষিরা। টমেটোর সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় যে বগুড়া জেলায় সেখানকার পরিস্থিতি আরো খারাপ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও’র এক জরিপ রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ৭৫ হাজার একর জমিতে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে চার লাখ টন টমেটোর উৎপাদন হয়। ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজির দর ২০ টাকা ধরে এর গড় দাম হয় প্রায় আটশ কোটি টাকা। অন্যদিকে বিক্রি না হওয়া থেকে পচে যাওয়া পর্যন্ত সংগ্রহ পরবর্তী লোকসান বা পোস্ট-হারভেস্ট লস হয় প্রায় ৪৬ শতাংশের। সে হিসাবে প্রতি বছর প্রায় চারশ কোটি টাকার টমেটো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে এফএও’র জরিপ রিপোর্টে জানানো হয়েছে। এমন খবর চাষিদের স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে তো বটেই, জাতীয় অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও নিঃসন্দেহে ভীতিকর।

উদ্বেগের কারণ হলো, শুধু টমেটোর বেলায় নয়, কমবেশি একই অবস্থা চলছে অন্য সব সবজির ক্ষেত্রেও। মাত্র দিন কয়েক আগে আলু সম্পর্কে লিখেছিলাম। বেশ কিছুদিন ধরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে লেখা ওই নিবন্ধে বলেছিলাম, সব জানা সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে সমাধানের লক্ষ্যে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলে এবছরও আলু চাষিরা ভয়ংকর বিপদে পড়েছে। তাদের ক্ষয়ক্ষতিও বেড়ে চলেছে। গত ২০ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, প্রতি মণ আলু উৎপাদন করতে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ পড়লেও চাষিরা এবার ২০০ থেকে ২২০ টাকার বেশি দরে বিক্রি করতে পারছে না। ফলে প্রতি মণ আলুতে কৃষকের ক্ষতি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। 

স্মরণ করা দরকার, আলুর জন্য গত বছরও বিপুল পরিমাণ লোকসান গুণতে হয়েছিল। প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গেছে, গত বছর দেশের বিভিন্ন স্থানের ৩৯০টি হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজে ৫৩ লাখ টন আলু সংরক্ষণের জন্য রেখেছিল কৃষকরা। কিন্তু সরকার কোনো উদ্যোগ বা পদক্ষেপ না নেয়ায় বছরশেষে ১৫ লাখ টন আলু অবিক্রীত থেকে যায়। এর ফলে প্রতি বস্তায় ৬০০ টাকা হিসাবে কৃষকদের লোকসান হয়েছে ১২ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এমন অবস্থার প্রতিক্রিয়ায় চলতি বছরে আলু চাষের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল কৃষকরা। তা সত্ত্বেও যারা চাষ করেছে তারাও লোকসানের কবলে পড়েছে। সরকারের কাছ থেকে তারা যেমন কোনো সাহায্য পাচ্ছে না, তেমনি পাচ্ছে না কোল্ড স্টোরেজের মালিকদের কাছ থেকেও। অথচ নিয়ম হলো, বিরাট অংকের টাকা ভাড়া দিয়ে আলু রাখার বিনিময়ে কোল্ড স্টোরেজের মালিকরা পরবর্তী বছরের চাষাবাদের জন্য চাষিদের ঋণ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ বছর সে নিয়মও মানা হয়নি। ফলে কোনো ঋণ পায়নি আলু চাষিরা। একই কারণে প্রতি মণ আলুতে ৮০ থেকে ১০০ টাকা করে লোকসান দিয়ে প্রতি কেজি আলু এমনকি পাঁচ থেকে সাত টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে তারা। তা সত্ত্বেও হাটবাজারে ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।

এভাবে সবজি সংক্রান্ত বিভিন্ন খবরের পর্যালোচনায় দেখা যাবে, বাজারে নানা ধরনের সবজির আমদানি বাড়লেও এই সবজি বিক্রি করে কৃষকদের যেমন লাভ হচ্ছে না তেমনি ক্রেতা তথা সাধারণ মানুষও উপকৃত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। লাভের মুখ দেখার পরিবর্তে একদিকে কৃষকরা লোকসান গুনতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে ক্রেতাদের কিনতে হচ্ছে তিন-চার গুণ বেশি দাম দিয়ে। কারণ, ফড়িয়া ও পাইকার নামের মধ্যস্বত্তভোগীরা কৃষকদের অনেক কম দামে সবজি বিক্রি করতে বাধ্য করছে। ফলে লোকসানই কেবল গুনতে হচ্ছে না, অনেক সবজির এমনকি উৎপাদন খরচও ওঠাতে পারছে না কৃষকরা। কিন্তু বাজারে যেহেতু একই সবজি বেশি পরিমাণে আসছে এবং চাষিদের মধ্যেও যেহেতু বিক্রির জন্য প্রতিযোগিতা রয়েছে সে কারণে পাইকাররা নিজেদের ইচ্ছামতো দাম বলে বিদায় করছে কৃষকদের। পাছে বিক্রি না হয় এই ভয়ে কৃষকরাও ফড়িয়া ও পাইকারদের হাঁকানো দামে সবজি বিক্রি না করে পারছে না। 

খবরে জানানো হয়েছে, মাত্র মাস তিন-চার আগে সারাদেশের বাজার যখন শীতের সবজিতে ভরে গিয়েছিল, তখন বগুড়ার মহাস্থান হাটে কৃষকরা ছোট আকারের যে ফুলকপি চার টাকা দরে বিক্রি করেছে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সে ফুলকপিরই দাম নেয়া হয়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত। ১০ টাকার একটি বাঁধা কপি মানভেদে বিক্রি হয়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকায়। একইভাবে ১৭ টাকার বেগুন রাজধানীবাসীকে ৪০ টাকায় কিনতে হয়েছে। ১৫ টাকার এক কেজি বরবটি ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে এবং পাঁচ টাকা কেজি দরে কেনা মুলা বিক্রি হয়েছে ১৫ থেকে ২০ টাকা দরে। শসা, শিম, জলপাই ও ধনে পাতাসহ অন্য সব সবজির দরও ছিল আকাশচুম্বি। 

এ শুধু কারওয়ান বাজারের দর নয়, রাজধানীর অন্য সব বাজারেও একই রকম উচ্চ হারে সবজি বিক্রি করতে দেখা গেছে। একই অবস্থা ছিল দেশের সকল জেলা শহরের বাজারগুলোতেও। কোথাও কোনো বাজারেই শীতের সবজি কম দামে পাওয়া যায়নি। অথচ সবজির আমদানি কিন্তু যথেষ্টই ছিল। তাছাড়া বিগত শীতের মওসুমে সারাদেশেই সবজির চাষাবাদ অনেক ভালো হয়েছিল। সে কারণে এর দামও কম হবে বলে ধারণা করেছিলেন তথ্যাভিজ্ঞরা। 

কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো রকম। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদসহ বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেছিলেন, মূল কারণ আসলে ফড়িয়া ও পাইকার এবং ব্যবসায়ী নামের মধ্যস্বত্বভোগীরা। এমন দামই তারা হাঁকিয়ে থাকে কৃষকদের জন্য যা মোটেও লাভজনক নয়। কিন্তু যেহেতু নিজের সব সবজি বাজারে এনে ফেলেছে সেহেতু কৃষকরা দরকষাকষি করার সাহস পায় না। ফড়িয়া ও পাইকার তথা দালালদের হাঁকানো দামেই বিক্রি করতে রাজি হয়ে যায়। অন্য একটি বিশেষ কারণও রয়েছে। কৃষকরা যখন সবজি নিয়ে বাজারে আসে তখন তাদের স্ত্রী-পুত্র কন্য ও পরিবার সদস্যরা অনেক আশায় বাড়িতে অপেক্ষা করে। কারণ, সবজি বিক্রি মানেই টাকা পাওয়া, যা দিয়ে সংসারের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস কেনা সম্ভব। প্রত্যেকেরই চাল ডাল তেল মরিচ থেকে লবণ ও সাবান পর্যন্ত অসংখ্য জিনিসের চাহিদা থাকে। সে কারণে খালি হাতে ফিরে যাওয়ার চাইতে যে দাম পাওয়া যায় তা নিয়েই কৃষকরা বাড়িতে যায়। 

এভাবে শুধু কৃষককে নয়, ক্রেতা তথা সাধারণ মানুষকেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে। তাই বলে এজন্য আবার পাইকার ও ফড়িয়াসহ মধ্যস্বত্বভোগীদের দোষারোপ করার সুযোগ নেই। কারণ, তারা পরিবহন ব্যয় এবং পথে পথে চাঁদা দেয়ার কথা শুনিয়ে থাকে। এই চাঁদা শুধু গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের নয়, পুলিশকেও দিতে হয়। বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের এই অভিযোগ অস্বীকারও করা যায় না। কারণ, আসলেও সারাদেশে চাঁদাবাজি চলছে বাধাহীনভাবে। সে কারণেই মহাজন ও মধ্যস্বত্বভোগীরা চাঁদার জন্য দেয়া অর্থ হিসাবে ধরেই কোনো পণ্যের জন্য মোট বিনিয়োগের পরিমাণ নির্ধারণ করে। দামও তারা ওই হিসাবের ভিত্তিতেই আদায় করে থাকে।

বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চলে আসছে। প্রসঙ্গক্রমে কৃষক ও কৃষিখাত সম্পর্কে কিছু কথা বলা দরকার। কারণ, তৈরি পোশাকসহ রফতানির মাধ্যমে আয় বাড়ানোর প্রচারণা চালানো হলেও কৃষিখাতই এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এখনো এই খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি। আর কৃষককে বাদ দিয়ে যেহেতু কৃষিখাতের কথা কল্পনা করা যায় না, সেহেতু কৃষকের সমস্যাকে প্রাধান্য দিতে হবে। এখানে একটি কথা না বললেই নয়। দেশের বাজেটে সাধারণত কৃষিখাতের সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে প্রচারণা চালানো হয়। সরকার অর্থনীতিকে ‘গ্রামমুখী’ করার ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে কৃষিখাত ও কৃষকের অবস্থা সব সময় একই রকম থেকে যায়। বর্তমান সরকারের আমলেও পরিস্থিতিতে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্যযোগ্য হয়নি। সেচ থেকে সার পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছে চরমভাবে। কখনো চাল বা শাক-সব্জির মূল্য বেড়ে যাওয়ায় মনে হতে পারে যেন কৃষকরা লাভে রয়েছে। অন্যদিকে সত্য হলো, লাভবান হওয়া দূরে থাকুক, অনেক পণ্য বিক্রি করে কৃষকরা এমনকি খরচের অর্থও ওঠাতে পারে না। ফসল কাটার, ঘরে ওঠানোর এবং বিক্রি করার কোনো একটি ক্ষেত্রেই কৃষক নিজের ইচ্ছামতো কিছু করতে পারে না। লাভবান হওয়ারও সুযোগ পায় না। মহাজন ও এনজিওদের কাছ থেকে নেয়া ঋণের অর্থ ফেরৎ দেয়ার চাপ এত প্রত্যক্ষ ও প্রচন্ড থাকে যে, খুব কম সংখ্যক কৃষকের পক্ষেই কষ্টের ফসল বাড়ি পর্যন্ত নেয়া সম্ভব হয়। পরিবর্তে তাদেরকে ক্ষেত থেকে ফসল বিক্রি করে ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হয়। না হলে তার ওপর নির্যাতন নেমে আসে। 

বিক্রি করার প্রক্রিয়ায়ও পদে পদে রয়েছে প্রতিবন্ধকতা। সরকারের পক্ষ থেকে ক্রয়মূল্য বেঁধে দিয়ে আকর্ষণীয় অনেক প্রচারণা চালানো হলেও বাস্তবে কৃষকরা তার সুফল পেতে পারে না। সরকারি ক্রয়কেন্দ্র বা খাদ্য গুদামে যাওয়ার পথে ওঁৎ পেতে থাকে মিল মালিক, মহাজন ও ব্যবসায়ীদের দালালরা। তারা প্রলোভন ও ভয়-ভীতি দেখায়, কৃষকরা যাতে তাদের কাছে ফসল বিক্রি করে। বেশি অর্থ পাওয়ার আশায় কৃষকদের অনেকে কষ্টে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র পর্যন্ত ফসল নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে নিয়োজিত কর্মচারীরা আগেই মিল মালিক, মহাজন ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ খেয়ে বসে থাকে। কখনো ‘সরকারের টাকা আসেনি’ বলে, কখনো আবার ‘গুদামে জায়গা নেই’ বলে ঘুষখোর কর্মচারীরা কৃষকদের বিদায় করে। সারাদিন বসিয়ে রেখে বিদায়ও করে এমন এক সময়, যাতে সঙ্গে আনা ফসল নিয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়ার মতো সময়-সুযোগ কৃষকরা না পায় এবং যাতে মহাজন-ব্যবসায়ীর দালালদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কৃষকদেরও তখন উপায় থাকে নাÑ বাড়িতে অনেক আশায় বসে আছে স্ত্রী-সন্তানেরা, রয়েছে ঋণের অর্থ আদায়ের জন্য মহাজন ও এনজিওদের মারমুখী লোকজন। সুতরাং খালি হাতে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে কৃষকরা দালালদের কাছে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হয়। 

আর ঠিক এ পর্যায়েই ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় কৃষকদের। যেহেতু সরকারি গুদামে বিক্রি না করতে পেরে বিপদে পড়েছে, সেহেতু দালালদের ইচ্ছার কাছে নতিস্বীকার না করে কোনো উপায় থাকে না তাদের। দালালরাও সুযোগ নেয় যথেচ্ছভাবেÑ সকালে যার দাম বলেছে সাতশ’ টাকা, সন্ধ্যায় তারই দাম বলে বসে চার-সাড়ে চারশ’ টাকা। কিন্তু তারপরও কৃষককে ওই দামেই দালালদের হাতে নিজের কষ্টের ফসল তুলে দিতে হয়। শাক-সবজি এবং অন্য সব কৃষি পণ্যের বেলাতেও একই অবস্থার শিকার হয় কৃষকরা। ভোক্তা বা সাধারণ মানুষ যে দামে কৃষিপণ্য কেনে, তার খুব সামান্য পরিমাণই উৎপাদক কৃষকের হাতে পৌঁছায়। অর্থাৎ কৃষক যে দামে তার পণ্য বিক্রি করে বা করতে বাধ্য হয়, তার চাইতে অনেক বেশি দাম দিয়ে দেশের মানুষকে কিনতে হয়। কয়েক ধরনের মধ্যস্বত্বভোগীর বাধাহীন দৌরাত্ম্য এর কারণ। এদের মধ্যে রয়েছে মফস্বল বা জেলা পর্যায়ের পাইকার, রাজধানীর পাইকারী বাজারের আড়ৎদার, অবৈধ টোল আদায়কারী, দীর্ঘ পথের সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ এবং যথারীতি পুলিশ। এসব মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে উৎপাদন কেন্দ্র থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে গিয়ে প্রতিটি পণ্যের মূল্যই অনেক বেড়ে যায়, বহুগুণ বেশি অর্থ গুনতে হয় মানুষকে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, এভাবে চলতে থাকলে এমন সময় আসতে পারে, কৃষকরা যখন চাষাবাদ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেবে। সত্যিই তেমনটা ঘটলে ১৬ কোটি মানুষের খাবার কিভাবে জোগানো যাবে তা নিয়ে এখনই চিন্তা করা দরকার। প্রসঙ্গক্রমে একটি মাত্র তথ্যের উল্লেখই যথেষ্ট হতে পারে। জামালপুরের চাষিরা ন্যূনতম দাম না পাওয়ার কারণে যে টমেটো ডোবায় ফেলে দিয়েছে, সে একই টমেটো জুলাই-আগস্ট মাসের দিকে মানুষকে ১০০ টাকা পর্যন্ত কেজি দরে কিনে খেতে হয়। সেসব টমেটোর সম্পূর্ণ চালানই আসে ভারত থেকে, আসে চোরাচালানের অবৈধ পথে। অথচ চাষাবাদের তথা ফলনের মওসুমে কৃষককে লাভজনক মূল্য দেয়ার পাশাপাশি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে দেশকে সহজেই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কবল থেকে রক্ষা করা সম্ভব এবং ভোক্তারাও এতে উপকৃত হতে পারে। একই কথা ধান ও আলু থেকে সকল ফসল তথা সবজির বেলায়ও সমানভাবে প্রযোজ্য। লম্বা অঙ্গিকার ও আশ্বাসের কথা শোনানোর পরিবর্তে এসব বিষয়েই সরকারের উচিত মনোযোগ দেয়া। কিছুটা হলেও করে দেখানোও।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ