ঢাকা, শনিবার 14 April 2018, ১ বৈশাখ ১৪২৫, ২৬ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাংলা নববর্ষ ১৪২৫

আজ পহেলা বৈশাখ ১৪২৫ সন। কাল পরিক্রমায় শুরু হলো আরেকটি বাংলা নতুন বছর। বাংলাদেশসহ ভারতের পশ্চিমবাংলা, আসাম, ত্রিপুরা, উড়িষ্যা ও বিহারের কিছু অংশেও বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশের বাইরে ভারতের পশ্চিম বাংলা ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের বাংলা নববর্ষের দিনটা ভিন্ন। যেমন এবার বাংলাদেশে নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ ১৪ এপ্রিল, কিন্তু পশ্চিমবংগে ১লা বৈশাখ ১৫ই এপ্রিল। বাংলাদেশ অনুসরণ করে বংগাব্দ, আর ওরা পালন করে শকাব্দ। এই জন্যেই দুই দেশে পহেলা বৈশাখ ভিন্ন। বাংলা বছরের প্রথম দিনটিতে বাংলাদেশীরা নানা কার্যক্রম ও উৎসবের আয়োজন করে। আবহমান গ্রামবাংলায় বৈশাখী মেলা বসে। মাটির তৈরি হাঁড়িপাতিলসহ খেলনা এবং কাঠের আসবাবপত্র, তাঁতবস্ত্র ইত্যাদির পসরা বসে বৈশাখী মেলায়। কোনও কোনও মেলায় চাষাবাদের জন্য লাঙ্গল-জোয়াল, মই, বিধা, নিড়ানি, দড়ি এসব কৃষি উপকরণও পাওয়া যায়। তাই বৈশাখী মেলা গ্রামীণজীবনে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। এ মেলা কোথাও কোথাও সপ্তাহজুড়ে চলে। বেচাকেনাও ভালো হয়। আজকাল অবশ্য শহরেও ঘটা করে  বৈশাখী মেলা বসে। শহুরে বৈশাখী মেলায় জাঁকজমক থাকলেও গ্রামের মেলার যে প্রাণময়তা তা নেই। কোথাও কোথাও বিশেষত চট্টগ্রাম অঞ্চলে বলিখেলাসহ লাঠিখেল, সার্কাস ও যাত্রার ব্যবস্থাও থাকে। কয়েক দশক আগে হালখাতার প্রচলন ছিল বেশ। ব্যবসায়ীরা সারাবছর অনেককে বাকিতে বিভিন্ন পণ্যসহ অর্থ কর্জ দিতেন। বকেয়া পড়ে থাকতো দেনাদারের কাছে। হালখাতার দিন সাধ্যমতো পাওনা শোধ করে দেয়া হতো। মিষ্টিমুখের ব্যবস্থাও থাকতো। এরপর নতুন করে শুরু হতো ব্যবসা। অবশ্য এ প্রথা শুরু হয়েছিল জমিদারের খাজনা আদায় থেকে।
এখন পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান গ্রামের চেয়ে শহরে জাঁকজমকসহকারে উদযাপন করা হয়। ঘটা করে পান্তা-ইলিশের ব্যবস্থা থাকে। এদের কাছে পহেলা বৈশাখ বড় নয়, বাংলা সন বড় নয়, একটা উপলক্ষে উৎসবের আয়োজনটাই বড়। এর সাথে এখন যুক্ত হয়েছে ব্যবসায়িক স্বার্থ। বৈশাখ উপলক্ষে নতুন ডিজাইনের পোশাক আনন্দ-আয়োজনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। হালখাতা ও খাজনা আদায়-পরিশোধের অর্থনীতি এখন ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসায়-অর্থনীতিতে পরিবর্তিত হয়েছে।
পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের সব মানুষের একটা উৎসবমুখর দিন। গ্রাম বাংলায় বৈশাখী মেলায় সব জাতি ও সম্প্রদায়ের শিশুকিশোররা যোগ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খেলনা, মালা, বাঁশি, ঘুড়ি কেনে। আনন্দ করে। নানা ধরনের খাবার যেমন মোয়া-মুড়ি, মুড়কি, বাতাসা, খৈ ইত্যাদি কিনে নিয়ে বাসায় ফেরে। সবাই আনন্দ করে খায়। বৈশাখী মেলায় বিভিন্ন পণ্যের বেচাবিক্রিতে গ্রামীণ জনমানুষের হাতে কিছু অর্থেরও সমাগম হয়। আর পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে এসব নির্মল কার্যক্রম বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য হিসেবেই গণ্য। এসবে ধর্মবিশ্বাসের বাড়াবাড়ি নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন জীবজন্তুর মুখোশ পরে ঘটা করে মঙ্গল শোভাযাত্রার একটা অনুষঙ্গ দেখা যায়। এর ফলে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে যে সর্বজনীন আবহ ছিল তার একটা নিশ্চিত ব্যত্যয় ঘটতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষত একটি প্রতিবেশী দেশের ধর্মাচারের প্রবল প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রায়। এ দেশের সিংহভাগ নাগরিক পহেলা বৈশাখ তথা নববর্ষ উদযাপনের ঐতিহ্য কোনওভাবে ব্যাহত হোক তা প্রত্যাশা করেন না। বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশীদের আনন্দ-বেদনার একটা অনুষঙ্গ। পহেলা বৈশাখ ফসলি সন বাংলা সনের প্রথম দিন। আমাদের জীবনবোধের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি কামনার এই শুভদিন কোনওভাবে কলুষিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ হোক তা আমরা চাই না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ