ঢাকা, শনিবার 14 April 2018, ১ বৈশাখ ১৪২৫, ২৬ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এরশাদের গরম হবার কি অর্থ আছে?

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে বেশ গরম মনে হচ্ছে। এর কি কোনও অর্থ আছে? কথায় কথায় ক্ষমতাসীন দলটিকে হুমকি দিচ্ছেন। অন্তত গৃহপালিত বিরোধী পার্টির প্রধান হিসেবে যা বলা মানানসই নয় তাও মাঝেমধ্যে বুক ফুলিয়ে দেশময় বলে বেড়াচ্ছেন। তিনি বলেছেন, দেশে কখন কে গুম আর খুন হচ্ছে আল্লাহ্ ছাড়া তা কেউ জানেন না। আরও বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী সবকিছুই জানেন। গত ৭ এপ্রিল বিকালে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সম্মিলিত জাতীয় জোট আয়োজিত মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এরশাদ সাহেব এসব কথা বলেন। এর মোটাদাগের অর্থ হচ্ছে, দেশের অভ্যন্তরে গুম, খুন, রাহাজানি, ছিনতাই, লুটপাট, ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি সবকিছু অবহিত আছেন প্রধানমন্ত্রী। হ্যাঁ, দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সবকিছু অবহিত হবারই কথা। এছাড়া তাঁকে এসবকিছু জানাবার বা ব্রিফ করবার জন্য লটবহর রয়েছে। যথাসময় তাঁকে সবঘটনার পূর্বাপর জানানো হয়ই। তবে এরশাদ সাহেব যা বলেছেন তা কিন্তু এই জানা বা অবহিত হওয়া বোঝাননি। তিনি যা বোঝাতে চেয়েছেন তার অর্থ আপত্তিকর। প্রশ্নবোধক। ক্ষেত্রবিশেষে মারাত্মকও। আর এমন কথা সাবেক প্রেসিডেন্ট না বুঝে বলেছেন, তা ভাববার অবকাশ নেই।
সেদিন তিনি আরও বলেন, দেশে আগে মহাসড়কের উন্নয়ন হতো। এখন উন্নয়নের মহাসড়ক দুর্নীতির মহাসড়কে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতির মহাসড়কে এখন শুধু খাল-বিল কেন? এ মহাসড়কে আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি। ঢাকা থেকে রংপুর যেতে এখন সময় লাগে ১৫ ঘণ্টা।
এরশাদ সাহেব যে দুর্নীতির মহাসড়কের কথা বলেছেন তার জন্য কি শেখ হাসিনার সরকার একাই দায়ী? তিনি সরকারের শরিক নন? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যা জানেন তাতো সাবেক প্রেসিডেন্টেরও অবহিত থাকবার কথা? তিনিতো এখন প্রধানমন্ত্রীর আবার বিশেষ দূতও। এজন্য তিনি বিরাট অংকের বেতন নেন। কিন্তু কাজটা কী করেন?
দেশের মানুষ নাকি পরিবর্তন চায়। এমন  দাবি করে এরশাদ বলেন, ‘আমরা একক সরকার চাই না। সব একজনের কথায় চলছে। দেশে কোনও নিরাপত্তা নেই। এখন তো নির্বাচন হয় না, সিল মারা হয়। তাই নির্বাচনকেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচনপদ্ধতি সংস্কার করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় লাভ করে সরকার গঠন করবে। কেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে থাকবার খায়েশ মিটে গেছে? সব মজা শেষ?
এরশাদ বলেন, বাংলাদেশের মতো ব্যাংক ডাকাতি বিশ্বের আর কোথাও হয়নি, কিছুদিন আগে বলা হতো, ব্যাংকের টাকা নেয়ার কেউ নেই। এখন বলা হচ্ছে, ব্যাংকে টাকা নেই। কোথায় গেল এতো টাকা? ব্যাংকের টাকা দিতে না পারলে কৃষককে জেলে যেতে হতো। আর এদের যেতে হয় না কেন? প্যারাডাইস পেপারসে এদের নাম আসে। এদের তো বিচার হয় না। কিন্তু কৃষকের বিচার হয়। কী অবাক করা প্রশ্ন কবি সাবেক প্রেসিডেন্টের? সরকারে থেকে সরকারের এমনতর সমালোচনা যে নিজের বিষ্ঠা নিজে ঘাঁটাঘাঁটি করবার শামিল তা কি তিনি বোঝেন না? বিষ্ঠা ঘাঁটাঘাঁটির কাজটা যাই হোক, সচেতন মানুষের কাজ নয়। এতে দুর্গন্ধ বাড়ে। পরিবেশ দূষিত হয়।
সম্মিলিত জাতীয় জোটের শীর্ষ নেতা ও ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান আল্লামা এম এ মান্নানের সভাপতিত্বে সমাবেশে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব এম এ মতিন, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক সিটি মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলু এমপি প্রমুখ জনসভায় বক্তৃতা করেন। -অনলাইন মানবজমিন: ৮ এপ্রিল, ২০১৮।
এরশাদ সাহেব এবার ভাবতে শুরু করেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেনই। রাজনৈতিক মামলায় বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়ার জেল হওয়ায় তিনি আর ইলেকশন করতে পারবেন না। বেগম জিয়া নেইতো বিএনপিও নেই। জামায়াতের শীর্ষনেতাদের তো ফাঁসি হয়েই গেছে। আর এরশাদ সাহেবের মতে ক্ষমতাসীনদের তো জনপ্রিয়তা নেই বললেই চলে। কাজেই এবার এরশাদ ছাড়া আর কে? এমন ভেবে তিনি এখন মনে হয় সুখস্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন। ক্ষমতাসীনদের বিদ্রƒপ করবার সাহস দেখাতে পারছেন।
অতীতেও ধমক খেয়ে এই সাবেক প্রেসিডেন্টকে সুড়সুড় করে আঁচলের তলে লুকোতে দেখা গেছে। এখন হাম্বিতাম্বি করে বেড়িয়ে আবোলতাবোল বকতে শোনা গেলেও ধমক খেলে ঠিকই খোঁয়াড়ে গিয়ে ঢুকবেন। কারণ ক্ষমতা দখল করে তিনি কী করেছেন তা সবার জানা আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও পুরোপুরি অবহিত আছেন এরশাদ সাহেব কী চিজ। তাঁকে নাকে দড়ি লাগিয়ে কীভাবে দৌড়ানো যায় সে কৌশলও তিনি খুব ভালো জানেন।
এরশাদ সাহেব অনেক সময় অনেক কথাই বলেন। কিন্তু কোনও কথা রাখতে পারেন এমন নজির বিরল। কয়েক দিন আগে রংপুরে তিনি বলেছিলেন, জাপার মন্ত্রীরা সরকার থেকে অচিরেই বেরিয়ে আসবে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন দূরে থাক, আশঙ্কাও নেই। আর তিনি বললেই কি হবে? যারা মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন তারা জাপা চেয়ারম্যানের কথা শুনলেতো? অন্যদিকে রওশন এরশাদ স্বামীর কথা শুনবেনই তার কি কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারেন তিনি? মনে হয় না। কাজেই এরশাদ যতো গর্জেন ততো বর্ষেণ না। মানে বর্ষাতে পারেন না। কথায় বলে না, অসারের তর্জনগর্জন সার? তিনি এখন সেইরকম। নিজের দলের কাছে তিনি যেমন অনেকটাই ঠুঁটো জগন্নাথ। তেমনই আওয়ামী লীগের কাছেও। আর দেশবাসীর কাছে তো তিনি ‘কচুপাতার জল’। একটুখানি নাড়া দিলেই করে টলমল।
তিনি বলেছেন, দেশ একজনের কথায় চলছে। তিনি একক সরকার চান না। তাহলে সমর্থন দিলেন কেন? সুড়সুড় করে গর্তে ঢুকলেন কী জন্য? বিএনপি-জামায়াত ঠেকাতে নির্বাচনে গিয়েছিলেন? তখন মনে ছিল না? আসলে তিনি যে গর্তে ঢুকেছেন, সেখান থেকে বেরুনোর পথ খুঁজে পাবেন বলে মনে হয় না। বেশি ত্যাড়ামো করলে আবার জেলের ঘানি টানতে হতে পারে। সব মামলা কিন্তু শেষ হয়নি। নতুন মামলা ঠুকতেও দেরি হবে না। কাজেই গরম হয়ে লাভ হবে না। যেই লাউ সেই কদু। যার কৃপায় গৃহপালিত বিরোধী দলের তকমা জুটেছে তাঁর বিরুদ্ধে গরম দেখালে ছেঁকা জুটবে কপালে। তখন বুঝবেন লাফালাফির রেজাল্ট কতটা খতরনাক হতে পারে।
ক্ষমতায় থেকে দেশের জন্য কোনও ভালো কাজ এরশাদ একদমই করেননি তা নয়। তবে যেভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন তা কাম্য ছিল না দেশবাসীর। স্বৈরাচারের তকমা কালোদাগ হয়ে কপালে যেভাবে সেঁটে আছে তা কখনও ঘুচবে না। এই কলঙ্কটিকা যতোই মোচনের চেষ্টা করা হোক ততোই তা গভীর থেকে গভীরতর হবে। এরপর বর্তমান সরকারের শরিক দল হিসেবে যেসব কর্মযজ্ঞের অংশীদার এরশাদ হয়েছেন তা গণতন্ত্রের কোনও বুলি দিয়েই ঘোচানো সম্ভব নয়।
আগেই উল্লেখ করেছি, ভালো কাজ তিনি করেছেন। তবে সব ভালো কাজ কালোর সঙ্গে এমনভাবে মিশেছে যে, সেগুলো আর মানুষের চোখে পড়ে না। তাঁর সব পজিটিভ এখন নেগেটিভ। ওই যে, প্লাস-মাইনাসের ফর্মুলায় পড়ে সব মাইনাসই হয়ে গেছে। হ্যাঁ, মাইনাসে মাইনাসে প্লাস হয়, তবে সেটা বীজগণিতে। রাজনীতিতে নয়। এটাকে তাঁর দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। তবে অনেকে একে যেমন কর্ম তেমন ফল বলতে চান।
প্রেসিডেন্ট এরশাদ মাঝেমধ্যে অন্যদের ‘রাজাকার’ বলে সুখানুভব করেন। কিন্তু তিনি কে? স্বাধীনতাযুদ্ধের দিনগুলোতে কোথায় ছিলেন তিনি? এসব কি দেশের মানুষ জানেন না বলে তিনি মনে করেন?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ