ঢাকা, সোমবার 16 April 2018, ৩ বৈশাখ ১৪২৫, ২৮ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র মজুদ স্থাপনায় ইঙ্গ মার্কিন ফরাসী বাহিনীর শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ

১৫ এপ্রিল,এপি, রয়টার্স: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের চালানো ৭০ মিনিট স্থায়ী যৌথ হামলায় সিরিয়ার স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া সেসব স্থাপনার ছবি প্রকাশ করতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে সিরিয়ার সন্দেহভাজন তিনটি রাসায়নিক অস্ত্র স্থাপনা লক্ষ্য করে মিসাইল হামলা শুরু করে পশ্চিমা দেশগুলো। ধোঁয়া উড়তে থাকা ধ্বংসস্তুপে সিরিয়ার আসাদ সরকার সমর্থিত বাহিনীর সদস্যদের কাজ করতে দেখা গেছে প্রকাশিত ছবিগুলোতে। সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের কাছে একটি রাসায়নিক অস্ত্র গবেষণাগার ও হোমস শহরের কাছের একটি রাসায়নিক অস্ত্র মজুদ স্থাপনা ও একটি রাসায়নিক হামলায় ব্যবহৃত কমান্ড সেন্টারে হামলা চালানো হয় বলে দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা। ওই হামলার ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ করতে গিয়ে মার্কিন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কেনেথ ম্যাককেনজি বলেছেন, কমান্ড সেন্টারটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে আর সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্রের কর্মসূচি অন্তত তিন বছর পিছিয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের হামলায় রাসায়নিক অস্ত্রের তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি বলে দাবি করেছেন সিরিয়ার সাবেক এক কর্মকর্তা। আবদুলসালাম আব্দুলরাজাক রাসায়নিক কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্য এই কর্মকর্তা বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে মার্কিন সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেসকে (এপি) সাক্ষাৎকার দেন। 

তিনি বলেছেন, ২০১৩ সালে রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার আগে সিরিয়ায় আনুমানিক ৫০টি গুদাম ছিল। এসব গুদামে রাসায়নিক অস্ত্র মজুত রাখা হতো। তিনি বিশ্বাস করেন, এসব গুদাম এখনও সেখানেই আছে নয়তো সামান্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট-ন্যাটোর প্রধান জেনস স্টোলেনবার্গ বলেছেন,  সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র স্থাপনা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের হামলায় ন্যাটোভুক্ত সব দেশ সমর্থন দিয়েছে। তিনি বলেন, সিরিয়ার সরকারের রাসায়নিক অস্ত্র সক্ষমতা কমানো ও দৌমার মতো বিভিন্ন এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আবার কোনও রাসায়নিক হামলা বন্ধ করার লক্ষ্যে এসব হামলা চালানো হচ্ছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূত নিকি হ্যালি বলেছেন, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকার যদি আবারও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে হামলা চালানোর জন্য একেবারে প্রস্তুত রয়েছে। শনিবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ বৈঠকে একথা জানান তিনি। নিকি হ্যালি বলেন, আমরা নিশ্চিত যে, আমরা সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচি খর্ব করতে পেরেছি। যদি সিরিয়ার শাসক আমাদের সংকল্প পরীক্ষা করতে চাওয়ার মতো বোকা হয় তাহলে আমরা এই চাপ অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত।

সিরিয়ার দৌমায় সরকারি বাহিনীর সন্দেহভাজন রাসায়নিক হামলার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের একযোগে চালানো বিমান হামলার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আনা রাশিয়ার প্রস্তাব খারিজ হয়ে গেছে। শনিবার মস্কোর আনা এ নিন্দা প্রস্তাবের পক্ষে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে বলিভিয়া ও চীন ছাড়া আর কেউ ভোট দেয়নি বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা  পেরু, কাজাখস্তান, ইথিওপিয়া ও একোয়াটোরিয়াল গিনি ভোটদানে বিরত ছিল; অপরদিকে তিন স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ আট সদস্য বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। দৌমায় সিরীয় বাহিনীর বিষাক্ত গ্যাস হামলার অভিযোগ ওঠার পর গত এক সপ্তাহে এ নিয়ে পাঁচবার নিরাপত্তা পরিষদ একত্রিত হল। সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচি লক্ষ্য করে ইঙ্গ-মার্কিন-ফরাসী বাহিনীর ১০৫টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া এদিন বৈঠক ডেকেছিল।

“যে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছিলেন, তার ফলের জন্য কেন আপনারা অপেক্ষা করলেন না,” প্রস্তাব খারিজ হয়ে যাওয়ার পর পরিষদের স্থায়ী তিন সদস্যের প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দেন জাতিসংঘে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসেলি নেবেনজিয়া।সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ‘আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন’ করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

“উত্তেজিত মাথাগুলো ঠা-া হয়ে আসবে বলে আশাবাদী আমি, সেটাই হওয়া উচিত,” সাংবাদিকদের বলেন নেবেনজিয়া।দৌমায় কোনো বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহৃত হয়েছে কি-না তা খতিয়ে দেখতে অর্গানাইজেশন ফর প্রোহিবিশন অব কেমিকাল উইপনের (ওপিসিডাব্লিও)তদন্ত কর্মকর্তারা সিরিয়ায় পৌঁছেছেন; শনিবার থেকেই দলটির কাজ শুরু করার কথা।পশ্চিমা দেশ ও বিভিন্ন সংস্থা বিদ্রোহীদের ওপর রাসায়নিক হামলার জন্য আসাদবাহিনীকে দায়ী করলেও সিরিয়া ও তাদের মিত্র রাশিয়া বলছে, দৌমায় বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শনিবার নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের সামরিক হামলাকে ‘বৈধ’ অ্যাখ্যা দিয়ে এর পক্ষে অবস্থান নেয়।

“সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচিকে পঙ্গু বানিয়ে দেয়া গেছে বলে আত্মবিশ্বাসী আমরা। সিরিয়ার শাসন ব্যবস্থা যদি আমাদের ইচ্ছার পরীক্ষা নেওয়ার মত বোকা হয়, তাহলে এই চাপ অব্যাহত রাখতেও প্রস্তুত আমরা,” বলেন জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি। সিরিয়া নতুন করে বিষাক্ত গ্যাস হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র ফের হামলায় ‘প্রস্তুত’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির লাগাম টানতে, সন্ত্রাসীদের নিশ্চিহ্ন করতে, সিরিয়াজুড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর ও সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিতে ইঙ্গ-মার্কিন-ফরাসী জোট নিরাপত্তা পরিষদে নতুন একটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে বলে শনিবার জাতিসংঘে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত ফ্রাঙ্কো দেলাত্রে জানিয়েছেন।জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের অনুরোধ জানিয়েছেন। নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি সিরিয়ার জনগণের দুর্ভোগ বাড়ে এমন কোনো পদক্ষেপ না নিতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।স্থায়ী পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের ভিটো ছাড়াই কোনো প্রস্তাব পাসের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত নয়টি দেশের সমর্থন লাগে।এর আগে মঙ্গলবারও সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলার ব্যাপারে তিনটি প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে খারিজ হয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবটি রাশিয়া ভিটোতে অকার্যকর হয়, প্রয়োজনীয় ৯ ভোট পেতে ব্যর্থ হয় রাশিয়ার করা বাকি দুটি খসড়া। 

রাসায়নিক স্থাপনার নামে ক্যান্সার গবেষণাগার ধ্বংস করেছে আমেরিকা: সিরিয়ায় রাসায়নিক স্থাপনা ধ্বংসের নামে আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্স একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে। এ প্রতিষ্ঠান থেকে ক্যান্সারের ওষুধ তৈরি করা হতো। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন বলেছে, শনিবার হামলা শুরুর প্রথম দিকেই দামেস্কের বারজাহ এলাকায় একটি গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রসহ তিনটি রাসায়নিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু তারা যেসব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে তার মধ্যে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ইনস্টিটিউট রয়েছে যা ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধ তৈরি করত। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে সিরিয়ায় ক্যান্সার ও জটিল কিছু রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ওষুধের মারাত্মক অভাব দেখা দিয়েছে। বারজাহ এলাকার ওই প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল দি ইনস্টিটিউশন ফর দ্যা ডেভলপমেন্ট অব ফারমাসিউটিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ।

ইনস্টিউটের প্রধান সাঈদ সাঈদ বলেন, এটা একসময় রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত কিন্তু এখন সেটা ওষুধ তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছিল। তিনি বলেন, “সিরিয়া সংকট শুরুর পর পশ্চিমা নিধোজ্ঞা আরোপের কারণে দেশে সবধরনের ওষুধের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিদেশি কোম্পানিগুলো সিরিয়ার কাছে উঁচু ক্ষমতাসম্পন্ন ওষুধ বিশেষ করে ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধ বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে আমরা ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধ তৈরির জন্য এই প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করে আসছিলাম এবং আমরা তিনটি ওষুধ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি।”

সাঈদ বলেন, আমেরিকার দাবি অনুসারে যদি এই প্রতিষ্ঠানে রাসায়নিক অস্ত্র থাকতো তাহলে হামলার পর তিনি এই প্রতিষ্ঠানে থাকতেন না। সাঈদ জানান, হামলার পর তিনি ভোর ৫টায় গবেষণাকেন্দ্র এসেছেন। কিন্তু যদি রাসায়নিক অস্ত্র থাকতো তাহলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তিনি ও তার সহকর্মীরা সেখানে যেতেন না এবং অবশ্য মুখোশ পরার প্রয়োজন হতো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ