ঢাকা, সোমবার 16 April 2018, ৩ বৈশাখ ১৪২৫, ২৮ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রধান বাধা ভারত

গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আদর্শ নাগরিক আন্দোলন আয়োজিত গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য : আগামী নির্বাচন কোনপথে শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন -সংগ্রাম

# সুবিধাভোগী মুক্তিযোদ্ধারা দলীয় হয়ে গেছেন--- ব্যারিস্টার মইনুল 

# জনগণের দাবি সামনে এনে আন্দোলন করতে হবে--- মান্না

স্টাফ রিপোর্টার : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে চরম ভোগান্তি হয়েছে। ৩০ লাখ লোক অসহায় হয়ে মারা গেছেন। আর কিছু মুক্তিযোদ্ধাকে টাকা পয়সা সুযোগ সুবিধা দিয়ে এমন অবস্থা করা হয়েছে তারা এখন দলীয় লোক হয়ে গেছেন। তারা মূলত সুবিধাভোগী। তাদের কেউ বিএনপির পক্ষে, কেউ এখন আওয়ামী লীগের পক্ষে। ভুলেই গেছেন যে একদিন তারা জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। একই অনুষ্ঠানে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রধান বাধা ভারত। কারণ এখানে গণতন্ত্র এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা হলে ভারতের স্বার্থে আঘাত লাগে। সুশাসন ছাড়া গণতন্ত্র ভাওতাবাজি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না জনগণের স্বার্থ নিয়ে আন্দোলন করার আহ্বান জানান। 

গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন ‘জাতীয় ঐক্য: আগামী নির্বাচন কোন পথে? শীর্ষক এই গোল টেবিল বৈঠকের আয়োজন করে আদর্শ নাগরিক আন্দোলন নামের একটি সংগঠন।

ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন বলেন, বলতে খারাপ শোনায় তবুও বলি, যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তারা টাকা পয়সার জন্য দৌড়াদৌড়ি করে না। এটাও ঠিক, কিছু মুক্তিযোদ্ধাকে টাকা পয়সা সুযোগ সুবিধা দিয়ে এমন অবস্থা করা হয়েছে তারা এখন দলীয় লোক হয়ে গেছেন। তারা মূলত সুবিধাভোগী। তাদের কেউ বিএনপির পক্ষে, কেউ এখন আওয়ামী লীগের পক্ষে। ভুলেই গেছেন যে একদিন তারা জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন

 বৈঠকে ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে চরম ভোগান্তি হয়েছে। ৩০ লাখ লোক অসহায় হয়ে মারা গেছেন। আমাদের সাধারণ মানুষের সঙ্গে শুধু ধোঁকাবাজি করা হয়েছে।

‘মুক্তিযুদ্ধের মুক্তি কই’ এমন প্রশ্ন করে তিনি বলেন, আমি এটা আশা করেছিলাম যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তারা জনগণের একটি শক্তি হবেন। কিন্তু যেসব মুক্তিযোদ্ধারা বেতন ভাতা সুবিধাদি নিয়েছেন তারা জনগণের কথা বলেন না। তাহলে কেন আপনারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। আমাদের দেশটা স্বাধীন করার জন্য ভারতই তো যথেষ্ট ছিল। তাহলে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করলাম কেন? মুক্তিযুদ্ধের সেই মুক্তিটা কই?

মইনুল হোসেন বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা বলেন দেশ স্বাধীন করেছি মুক্তির জন্য, স্বাধীনতার জন্য। আসলে দেশ স্বাধীনের পর থেকে আমরা মুক্তির পথে তো যাচ্ছিলাম না। সাংবাদিক, আইনজীবীরা দলীয় কর্মী হবেন এটা তো প্রত্যাশিত নয়। এঁরা হলো সুশীল সমাজের নাগরিক সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি। জনগণের আস্থা ভরসার জায়গা।

 কোটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্প্রতি যে ঘটনাটি ঘটেছে তা আমাদের মনে খুব লেগেছে। ঠিক আছে আমাদের গালিগালাজ দেয়া হয়, আমরা বয়স্ক বুড়া হয়ে গেছি। এই যে ছাত্ররা কোটা নিয়ে আন্দোলন করলো তাদেরকে বললো তারা রাজাকারের বাচ্চা। এতে আমি এতো কষ্ট পেয়েছি যে তা বলার মতো না। যে বলেছে উনি দেশের জনগণের জন্য বিপদ ডেকে রাতের মধ্যে ভারত চলে গেছেন। তার মুখে শুনতে হয় আমাদের ছেলেমেয়েরা রাজাকার। আজকে আমাদের সম্মান নেই। আমরা আমাদের ছেলেমেয়ের মর্যাদা এবং দেশপ্রেম রক্ষা করতে পারছি না। এখানে সবাই বলছে কোটার আন্দোলন ন্যায্য আন্দোলন। আমি গর্বের সঙ্গে বলবো তারা কোনও দলীয় রাজনীতির দিকে যায়নি। তারা নির্দলীয় থেকে আন্দোলন করেছে।

বৈঠকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দেশে গনতন্ত্র না থাকার কারণে ভারতের গোয়েদা সংস্থা ও দেশের প্রতিষ্ঠিত বাহিনী এবং ছাত্রলীগ বা ছাত্রলীগ নামধারী যারা আছেন তারাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির বাসভবনে হামলা চালিয়েছেন। এখানে কোটাধারী আন্দোলনরত সাধারণ ছাত্ররা এ হামলা চালায়নি।

তিনি বলেন, দেশে যদি আজ গণতন্ত্র থাকতো তাহলে ভিসির বাসভবনে হামলা চালানোর কেউ সাহস পেতো না। আমি এ হামলার তীব্র নিন্দা জানাই এবং সঠিক তদন্তের মধ্য দিয়ে হামলাকারীদের গ্রেফতার করে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিতের আহ্বান জানাই।

তিনি বলেন ভারতের অখ-তা ভ্রান্ত ধারণা। ভারত ভাঙ্গা সময়ে ব্যাপার মাত্র। বাংলাদেশ যদি সহযোগিতা করে তাহলে কাশ্মির এবং আসাম দ্রুত স্বাধীন হয়ে যাবে। তাতে বাংলাদেশের লাভ হবে। তারা পড়াশোনা করতে বাংলাদেশে আসবে। তিনি বলেন শেখ মুজিব ক্ষমতায় থাকতে বাংলাদেশে উলফার লোকজন ট্রেনিং অব্যাহত ছিল। 

খালেদা জিয়ার কারাবাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি খালেদা জিয়ার মুক্তি চাইনা। ন্যায় বিচার চাই। ন্যায় বিচার পেলে খালেদা জিয়া এমনিতেই মুক্তি পাবেন। উচ্চ আদালতের বিচারকদের বিতর্কিত ভূমিকার সমালোচনা করে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, বিচারকদের উচিত প্রতি বছর আয়-ব্যয়ের হিসাব দেওয়া। তারা খুব হীন স্বার্থের জন্য প্রধান বিচারপতি সিনহার সঙ্গে বিচার কাজে বসতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। বিচারকরা বিবেকবান না হলে দেশের ভবিষ্যত খারাপ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, জাতীয় ঐক্য রাজনৈতিক দলের ঐক্য নয়। জাতীয় ঐক্য হলো জনগণের ঐক্য। আমাদের যত রাজনৈতিক দল আছে তারা সবাই একটি বিষয় নিয়ে ঐক্যবব্ধ, সেটি হচ্ছে গণতন্ত্র। গণতন্ত্র মানে একদিনের ভোট না। গণতন্ত্র মানে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা তথা জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। গণতন্ত্রই পারে একটি দেশকে সামনের দিকে দ্রত এগিয়ে নিয়ে যেতে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, জাতীয় ঐক্য কখনো সকল মানুষকে নিয়ে হয় না। আমাদের জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের সময়ও রাজাকার-আলবদররা ছিল। কিন্তু জাতীয় ঐক্য ঠিক ছিলো। কিন্তু আজ তা নেই। এই শতাব্দীর এই হালের রাজাকার হচ্ছে আওয়ামী লীগ।

 আ স ম আবদুর রবের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, আ স ম আবদুর রব বলেছেন আওয়ামী লীগ যদি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হয়ে থাকে বা আওয়ামী লীগ যদি স্বাধীনতার মূল উৎস শক্তি হয়ে থাকে তাহলে আমি শহীদ মিনারে গিয়ে ফাঁসি নেবো।

আলাল আরও বলেন, আমরা তখন বেশি ছোট ছিলাম না। যারা ছোট ছিলেন তারা জানেন না মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কিভাবে বিকৃত করা হয়েছে। শেখ মুজিবর রহমান অনেক বড় নেতা এটা অবিশ্বাস করার কিছু নেই। কিন্তু তাঁর শাসনামল ৭২ থেকে ৭৫। বঙ্গবন্ধুর শাসনামল নিয়ে যদি আমি সমালোচনা করতে না পারি তাহলে আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী-এটা কোন দুঃখে বলতে যাব। যদি জিয়াউর রহমানের শাসনকাল নিয়ে সমালোচনা হয় তাহলে শেখ মুজিবের শাসনামল নিয়ে কেন সমালোচনা হবে না।

আলাল বলেন, শেখ মুজিব নেতা হিসেবে অনেক বড়। আমরা তাঁকে সেলুট করি। কিন্তু তাকে দলীয়করণ করে একটি মূর্তির মধ্যে আবদ্ধ করেছে আওয়ামী লীগ। মুজিব যেন আওয়ামী লীগের নিজস্ব সম্পত্তি। আর কারো কোনও অধিকার এখানে নেই। এমনটি করে শেখ হাসিনা ও তাঁর ভাবশিষ্যরা শেখ মুজিবকে বড় করছেন না। বরং খাটো ও খ-িত করছেন।

খালেদা জিয়ার কারাবাস প্রসঙ্গে বিএনপির এই নেতা বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন। আইনের মাধ্যমে হোক বিচারের মাধ্যমে হোক যেকোনো কারণেই হোক উনি কারাগারে আছেন। ওনাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে মানুষের মাঝে ফিরিয়ে আনা যেমন দায়িত্ব, একইভাবে রাজাকার বাদে গণতন্ত্রবিরোধী বাদে অন্য যারা আছে তাদেরকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যও অপরিহার্য। এখানে বরেণ্য ব্যক্তি যারা আছেন তাদের কাছে আমার আবেদন- দেশ-জাতির স্বার্থে আপনারা একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলুন।

তিনি বলেন, এই জাতীয় ঐক্য বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়। দেশে মাতুব্বর হিসেবে বিএনপিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নয়। এই জাতীয় ঐক্য হবে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার জন্য। দেশের মুক্তিযুদ্ধের যে মূল ভিত্তি ছিল যে স্বপ্ন ছিল তা বাস্তবায়নের জন্য।

গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন নাগরিক ফোরামের চেয়াম্যান আব্দুল্লাহিল মাসুদ, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়াম্যান এজাজ হোসেন প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ