ঢাকা, সোমবার 16 April 2018, ৩ বৈশাখ ১৪২৫, ২৮ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিনিয়োগ স্থবিরতা অর্থনীতির জন্য অসনিসংকেত

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : বেপরোয়া ঋণ বিতরণ করে অর্থ সংকটে ভুগছে ব্যাংকিং খাত। মূলধন সংকটে পড়ে সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংক ঋণে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। শিল্প উৎপাদন বিঘিœত হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রীক অর্থনীতিতে। এ অবস্থা দেশের অর্থনীতির জন্য অসনিসংকেত বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থা ভাবিয়ে তুলেছে দেশের নীতিনির্ধারকদের। সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সকলের এটি মাথা ব্যাথার কারণ। সংকট কাটাতে চলছে দফায় দফায় বৈঠক। ইতোমধ্যে সুদের হার কমাতে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এক শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে নগদ অর্থ রাখার (সিআরআর) পরিমাণ। ব্যাংক ঋণে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনতে সরকার ব্যাংক মালিকদের সকল দাবি পূরণ করলেও এখনও কমেনি সুদহার। অবশেষে সুদ কমানোর তাগিদ দিলেন প্রধানমন্ত্রী। 

ব্যাংক ঋণের সুদের হার দুই অংকের ঘরে চলে যাওয়ায় তা সিঙ্গেল ডিজিটে আনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংক মালিকদের অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু পাল্টা শর্ত দেয় ব্যাংক মালিকরা। সরকারের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে ব্যাংক মালিকরা। অবশেষে বিশেষজ্ঞদের সাথে কোনো ধরণের আলোচনা ছাড়াই সরকার তাদের সব দাবি পূরণ করে। এরপর প্রায় একমাস হতে চললেও এখনও সুদের হার কমানো হয়নি।

সর্বশেষ গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুদের হার কমিয়ে ব্যাংকগুলোকে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা আপনাদের উত্থাপিত সব সমস্যার সমাধান করেছি, এখন আপনাদের অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে। সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, সুদের হার না কমালে দেশে বিনিয়োগ সম্ভব নয়। এটিকে অবশ্যই সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) অধীন ব্যাংকগুলো গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে ১৬৩ কোটি টাকা দান করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের শুরুর দিকে ব্যাংক ঋণে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে (১০ শতাংশের নিচে) চলে এসেছিল। অর্থবছরের প্রথমার্ধের পাঁচ মাস ঠিকঠাক চললেও ছন্দপতন ঘটে শেষ মাস ডিসেম্বরে। হঠাৎ করে বেড়ে যায় সুদের হার। যত দিন যায় ব্যাংকগুলো বাড়াতে থাকে সুদহারের পরিমাণ। গত তিন মাস শেষে তা বেড়ে কোনো কোনো ব্যাংকে ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংকগুলোর দাবি চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) সময়ে প্রচুর পরিমাণে ঋণ বিতরণ হওয়ায় ব্যাংকগুলো তহবিল সঙ্কটে পড়েছে। ফলে বেশি সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করায় ঋণের সুদের হারও বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, দেশের ৫৭টি তফসিলি ব্যাংকের সবগুলোতেই এখন দুই অঙ্কের (ডাবল ডিজিট) সুদ গুণতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এর মধ্যে শিল্প ঋণের বিপরীতে ১৫ শতাংশেরও বেশি সুদ নিচ্ছে বেশ কয়েকটি ব্যাংক। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে এমন অবস্থা ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে। তবে মার্চ মাসে এ হার আরো বেড়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় শিল্পসহ সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, সরকারি মালিকানার আটটি ব্যাংকের মধ্যে জনতা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি দুই ধরনের ঋণে ব্যবসায়ীরা সুদ গুণতে হচ্ছে ১৩ শতাংশ হারে। একইহারে ব্যবসায়ীদের সুদ গুণতে হচ্ছে শিল্পের মেয়াদি, চলতি ও এসএমই ঋণের ক্ষেত্রেও। সোনালী ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুদ নিচ্ছে ১১ শতাংশ হারে। অগ্রণী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) সুদ নিচ্ছে ১১ থেকে ১২ শতাংশ হারে। তবে শিল্প ঋণের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকের চেয়ে বেশি হারে সুদ আরোপ করছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। কোনো কোনো ব্যাংক ২০ শতাংশেরও বেশি হারে সুদ আরোপ করছে। যেসব ব্যবসায়ীরা ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন তাদের কেউ কেউ সুদ দিচ্ছেন ২২ শতাংশ পর্যন্ত। বেসরকারি অন্যান্য অধিকাংশ ব্যাংক এসএমই বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে সুদ নিচ্ছে ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ হারে। বড় উদ্যোক্তাদেরও দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি দুই ধরণের ঋণেই গুণতে হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ।

ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের শেষ মাস তথা ডিসেম্বর থেকে ঋণের সুদহার বাড়াতে থাকে ব্যাংকগুলো। সুদহার বাড়তে বাড়তে জানুয়ারিতেই দেশের সব ব্যাংকের সুদের হার দুই অঙ্কে উঠে আসে। যা ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে। এমতাবস্থায় সরকার প্রধান থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারকদের এখন মাথা ব্যাথার কারণ মাত্রাতিরিক্ত সুদহার। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক ঋণের সুদহার ঠিক করতে এবং ব্যাংকিং খাতে অর্থ সঙ্কট দূর করতে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের যৌথসভায় ব্যাংকের ঋণের সুদ হার এক অঙ্কে আনার তাগিদ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

এর অংশ হিসাবে গত ৩০ মার্চ (শুক্রবার) রাতে ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সেখানে ব্যাংকের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার বিষয়ে কিছু পদক্ষেপের কথাও জানান তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকের অর্থসঙ্কট মেটাতে, সুদ হার কমানো এবং ডলার সঙ্কট কাটানো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন থেকে সরকারি তহবিলের ৫০ শতাংশ অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা যাবে। বিদ্যমান সরকারি তহবিলের ৭৫ শতাংশ সরকারি ব্যাংকে এবং ২৫ শতাংশ অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা যায়।

সঙ্কট নিরসনে ১এপ্রিল (রোববার) আবারও বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাথে বৈঠকে বসেন অর্থমন্ত্রী। বৈঠকে ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণ (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও বা সিআরআর) সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে এক শতাংশ কমিয়ে সাড়ে ৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। 

এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, সুদের হার কমানোর চেষ্টা করছি। এরই অংশ হিসেবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত ৫০ শতাংশ রাখা হবে। ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। আর আজকের (রোববার) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জমা রাখা সিআরআর-এর ১ শতাংশ টাকা ব্যাংকগুলো ব্যবহার করতে পারবে। এর ফলে ১০ হাজার কোটি টাকার মতো বেসরকারি ব্যাংকগুলোর হাতে চলে আসবে। এতে তারল্য সংকট কমে গেলে সুদের হারও কমে যাবে। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সিআরআর সাড়ে পাঁচ শতাংশ বহাল থাকবে। তবে আগামী জুন মাসে সিআরআর বিষয়ে আবারও পর্যালোচনা করা হবে। তিনি বলেন, এটি নির্বাচনের বছর। আমরা চাই না, এ বছরে কোনোভাবে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হোক। আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে সুদহার এক অঙ্কে নেমে আসবে।

ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদহার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের কয়েকজন সদস্য নাম না বলার শর্তে বলেন, ব্যাংক ঋণে সুদের হার বেড়ে যাওয়া দেশের সামগ্রীক অর্থনীতির জন্য অসনিসংকেত।

এব্যাপারে এফবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, সুদের হার বাড়লে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। আর উৎপাদন খরচ বাড়লে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। তখন দেশের বিনিয়োগও কমে যাবে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের দাবি ছিল সুদের হার এক অঙ্কে নিয়ে আসা। তা এসেছিলও কিন্তু হঠাৎ আবার বাড়তে শুরু করায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের অথনৈতিক উন্নয়নে দ্রুত সুদহার কমানো দরকার। 

সুদের হার মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ ব্যাংকও। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ব্যাংক ঋণের সুদ হার বেড়ে যাওয়া ব্যবসার জন্য নেতিবাচক। এমনকি দেশের জন্যেও তা খারাপ। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, নিয়োম মেনে ব্যাংকিং না করায় কিছু ব্যাংক সঙ্কটে পড়েছে। আর এতেই বাড়ছে সুদহার। এ জন্য ব্যাংক মালিকদের সামনে গভর্নরকে বসানো হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি প্রথম। এ সংস্কৃতি ভালো নয়। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার চাইলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখতে পারে। তবে এ প্রক্রিয়াও স্বচ্ছ হতে হবে। আর্থিকভাবে ভঙ্গুর ব্যাংকে আমানত রাখলে সেটি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ