ঢাকা, সোমবার 16 April 2018, ৩ বৈশাখ ১৪২৫, ২৮ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

উৎসবে নারীদের যৌন হয়রানিতে শাস্তির নজির  নেই

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অগ্রগতি আর অর্জন উল্লেখযোগ্য হলেও নির্যাতন ও সহিংসত থেকে তাদের মুক্তি মেলেনি আজও। নারীদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ,নির্যাতন,সহিংসতাসহ যৌন হয়রানিমূলক কর্মকান্ড ধারাবাহিকভাবে ঘটেই চলেছে। বিশেষ করে সার্বজনীন উৎসবে এসব ঘটনা যেন তাদের নিয়তি, কোনটাই পিছু ছাড়ে না।বরং তা আরো বেড়ে যায়।

নারীরা নানামুখী হয়রানির শিকার হয়, লাঞ্ছিত হয় কিন্তু জড়িতদের শাস্তির কোনো নজির নেই। ঘটনার আড়ালে ঘটনা চাপা পড়ে যায়। এক লাঞ্ছিতের অশ্রুতে আরেক নির্যাতিতার অশ্রু মুছে যায়। এসব ঘটনায় মামলা হয় তবে বিচার হয় না। শাস্তির কোনো নজির না থাকায় পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। এ কারণে দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে যৌন হয়রানিসহ নারী নির্যাতনের নানা ঘটনা।

সর্বশেষ চলতি বছরের ৭ মার্চ রাজধানীর ৬ টি স্থানে আওয়ামীলীগের সমাবেশগামী মিছিল থেকে নারীদের যৌন হয়রানির ঘটনার রেশ এখনও আলোচনায়। তোলপাড় করা ওই সব ঘটনার মধ্যে একটির ঘটনায় রমনা থানায় ভূক্ত ভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হলেও ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণের মধ্যেই তদন্ত থমকে আছে। বাকী ঘটনাগুলোর কোন ফলোআপ নেই থানা পুলিশের কাছে। এই তোলপাড় করা ঘটনার আগে গত বছরের ১৩ মার্চ পুরাতন ঢাকার শাঁখারীবাজারে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হোলি উৎসব চলাকালে দুই নারীকে লাঞ্ছিত করে কয়েকজন যুবক। এর আগে ২০১৫ সালের ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাংলা নববর্ষের উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটকে একদল যুবক নারীদের ওপর নিপীড়ন চালায়। ১৯৯৯ সালে এ ক্যাম্পাসেই থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপনের সময় বখাটেদের হাতে নির্যাতিত হন এক নারী।এ সব ঘটনার কোনটিরই বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি জড়িতদের।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ‘উৎসবে যৌন হয়রানির ঘটনায় যেসব মামলা হয় এর বিচার সঠিকভাবে হয় না। এসব ঘটনার সঠিক বিচার না হওয়ায় দিন দিন অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। আর পার পায়ে যাচ্ছে ঘটনার মূল অপরাধীরা।’

ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (সরকারি কৌঁসুলি) আব্দুল্লাহ আবু এ বলেন, ‘উৎসবে যৌন হয়রানি ঘটনার মামলাসমূহের তদন্ত আরো গুরুত্বসহকারে করা উচিৎ। তদন্ত সংস্থাকে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সঠিকভাবে তদন্ত হলে মূল অপরাধীরা পার পেতে পারবে না। অপরাধ করার প্রবণতাও কমে যাবে।’

 হোলি উৎসবে দুই নারী লাঞ্ছিত

২০১৭ সালের ১৩ মার্চ পুরাতন ঢাকার শাঁখারীবাজারে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হোলি উৎসব চলাকালে ঢাকা জেলা জজ কোর্টের মেইন গেটের সামনে কয়েকজন যুবক দুই নারীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে রঙ লাগিয়ে লাঞ্ছিত করে। এ ঘটনায় তাদের ভাই আহাদ ফেরদৌস বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর তিন আসামি আকাশ, সিফাত ও মামুনকে গ্রেফতার করা হলেও বর্তমানে তারা জামিনে আছেন। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।

সাক্ষী না আসায় ঝুলে আছে শ্লীলতাহানির মামলা

বাংলা নববর্ষের উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) টিএসসি এলাকায় নারীর শ্লীলতাহানির মামলায় ৯ মাসেও একজন সাক্ষী আদালতে হাজির করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। নির্ধারিত তিন ধার্য তারিখে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে না পারায় সময়ের আবেদন করেন। ফলে আলোচিত এ মামলাটির সাক্ষী না আসায় ঝুলে রয়েছে বিচার কার্যক্রম।

তিন বছর আগে বাংলা নববর্ষের উৎসবে ঢাবির টিএসসি সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটকে নারীদের উপর নিপীড়ন চালায় একদল যুবক। ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ৮ লাঞ্ছনাকারীকে শনাক্ত করলেও প্রায় দেড় বছর আগে একজনকে আসামি করে চার্জশিট দেয় পিবিআই।

২০১৫ সালের ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় ওই ঘটনায় শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বাদি হয়ে একটি মামলা করেন। নারীদের লাঞ্ছনার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ৮ জনকে শনাক্তের পর গণমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করে পুলিশ। তাদের ধরিয়ে দিতে লাখ টাকা পুরষ্কারও ঘোষণা করা হয়।

২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর এ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক দীপক কুমার দাস। প্রতিবেদনে আসামি খুঁজে না পাওয়ার কথা বলা হয়। তবে ওই প্রতিবেদন গ্রহণ না করে মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ্রদন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ এর বিচারক জয়শ্রী সমাদ্দার।

২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর পিবিআই-এর পুলিশ পরিদর্শক আব্দুর রাজ্জাক একমাত্র কামালকে আসামি করে চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, তদন্তে আট লাঞ্ছনাকারীদের মধ্যে একজন আসামিকে খুঁজে পাওয়্রাগছে। অপর সাত আসামিকে খুঁজে না পাওয়ায় তাদের চার্জশিটে নাম অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাদের খুঁজে পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে সম্পুরক চার্জশিট দেয়া হবে। মামলায় সাক্ষী করা হয় ৩৪ জনকে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৯ জুন কামালের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ এর বিচারক জয়শ্রী সমাদ্দার। এরপর গত বছরের ৩১ আগস্ট, চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি ও ১২ ফেব্রুয়ারি মামলাটির সাক্ষীর জন্য থাকলেও কোন সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। আগামী ৩ জুন মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। আলোচিত এ মামলার একমাত্র আসামি কামাল জামিনে রয়েছেন।

ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বলেন, মামলাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মামলার সাক্ষীরা কেন আদালতে হাজির হচ্ছেন না সে বিষয় আমরা দেখব। আমরা চেষ্টা করব যেন মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।

মানবাধিকারনেত্রী আইনজীবী সালমা আলী বলেন, এ ধরনের মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের উচিত এ ধরনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করার।

থার্টিফার্স্ট নাইটে নারী নির্যাতন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ১৯৯৯ সালের থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন করতে গিয়ে একদল বখাটের কবলে পড়ে নির্যাতনের শিকার হন এক নারী। ওই ঘটনার পরের দিন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে বিষয়টি ফলাও করে প্রকাশ পায়। সারাদেশে নিন্দা ও ধিক্কার ঝড় ওঠে। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ওই নারী ২০০০ সালের ৬ জানুয়ারি রমনা থানায় একটি মামলা করেন। কিন্তু বারবার সমন পাঠানোর পরও বাদী হাজির না হওয়ায় তার সাক্ষ্য নিতে পারেননি আদালত। দশ বছর পর ২০১০ সালের ৩১ আগস্ট এ মামলার রায়ে সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে সব আসামি খালাস পেয়ে যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ