ঢাকা, সোমবার 16 April 2018, ৩ বৈশাখ ১৪২৫, ২৮ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কাজিপুরে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা

কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) থেকে আব্দুল মজিদ: সিরাজগঞ্জের উত্তর জনপদের যমুনা নদীবেষ্টিত কাজিপুর উপজেলা। এই উপজেলায় ১২টি ইউনিয়ন, ১ টি পৌরসভা এবং সিরাজগঞ্জ সদরের ৪ টি ইউনিয়ন নিয়ে সিরাজগঞ্জ-১ সংসদীয় আসন গঠিত। স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল এ আসনে নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেনি। তবে ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে প্রতিবারের বিজয়ী আওয়ামী লীগকে আসন্ন নির্বাচনে ভোটে যুদ্ধ করেই বিজয় নিশ্চিত করতে হবে বলে বি এন পির দাবী। আর মহাযোটের শরীক দল জাসদও এ আসনে প্রার্থী দিতে প্রস্তুত। আওয়ামী লীগ: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবর রহমানের একান্ত সহচর শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর জন্মস্থান সিরাজগঞ্জ -১ (কাজিপুর) আসনে। স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন অসামান্য অবদান রয়েছে তার, তেমনি যত দিন তিনি বেঁচে ছিলেন ততদিন কাজিপুরের মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্ত ফ্রন্টের হয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি বিজয়ী হয়ে প্রাদেশিক পরিষদের মন্ত্রী হন। ৭০ এর নির্বাচনে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়ন পান। মহান মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কারনে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তীতে রাজনৌতিক পট পরিবর্তন হওয়ায় তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে দায়ীত্ব পালন করেন। তিনি বিপ্লবী সরকারের অর্থ মন্ত্রী এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের যোগাযোগ মন্ত্রী, স্বররাষ্ট্র মন্ত্রী এবং প্রধান মন্ত্রী হিসেবে দায়ীত্ব পালন করেন। যুদ্ধ বিদ্ধস্ত বাংলাদেশের উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি নিজ এলাকার উন্নয়নে ব্যক্তি গত ভুমিকার কারনে এখনও এলাকা বাসীর কাছে তিনি স্বরণীয়। সে সময় তিনি এ অঞ্চলের মানুষের জন্য চাকুরী দুর্দশা গ্রস্থ মানুষের পূনর্বাসন, নদীভাঙ্গন রোধে ব্যবস্থা নেয়ায় মানুষের অন্তরে ঠাই করে নেন। তার মৃত্যু পর তার মেঝ ছেলে মোহাম্মদ নাসিমকে এ অঞ্চলের মানুষ তার পিতার স্থানে বসিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে নাসিম সিরাজগঞ্জ -১ ও সিরাজগঞ্জ -২ এ ২টি আসন থেকে নির্বাচিত হন। মোহাম্মদ  নাসিম সিরাজগঞ-১  আসন টি ছেরে দিলে তার বড় ভাই ড. মোহাম্মদ সেলিম উপ নির্বাচন করে বিজয়ী হন। এর পর ২০০১ ও ২০১৪ সালে মোহাম্মদ নাসিম এ আসন  থেকে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। ২০০৮ সালে  মোহাম্মদ নাসিম মামলাজনিত কারণে নির্বাচনে অংশ গ্রহন করতে না পারায় তার ছেলে প্রকৌ: তানভীর শাকিল জয় নির্বাচিত হন। এ আসনের ইউনিয়ন থেকে মহল্লা পর্যন্ত আওয়ামী রাজনীতির একক আধিপত্য রয়েছে। তবে উপ জেলার রাজনীতিতে নেতৃত্ব নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা কোন্দলও রয়েছে। কিন্তু মোহাম্মাদ নাসিম ও তার ছেলে জয় শক্ত হাতেই তা মোকাবেলা করে থাকেন। মোহাম্মদ নাসিম ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এ আসন   থেকে নির্বাচিত হয়ে বর্তমান সরকারের স্বাস্হমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।পাশাপাশি কাজিপুরকে নতুন ভাবে সাজিয়েছেন তিনি। স্বাস্হ ও শিক্ষা বিভাগের পাশাপাশি এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ লাঘবে নদী ভাঙন রোধে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহন ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। যমুনা নদীর প্রত্যন্ত ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে  লেগেছে উন্নয়নের ছোয়া।পাকা সড়ক,বৈদ্যুতিক লাইন, সৌর বিদ্যুত, স্কুল-কলেজের স্থায়ী ভবন সহ চরাঞ্চলবাসীর জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। প্রতি সপ্তাহে তিনি এলাকায় আসেন এবং নেতা কর্মীদের নিয়ে রাজনৈতিক ও সরকারি কর্মকা- পরিচালনা করে আসছেন।

এরই মধ্যে সরকারের উন্নয়নের প্রচারণা ও এলাকার মানুষের সাথে মত বিনিময়ের মাধ্যমে আগামী নির্বাচনের নিজের প্রার্থীতার প্রচার চালিয়ে আসছেন। বিএনপি: আওয়ামী লীগের দুর্গ ভাঙতে এ আসনে বিএনপি তাদের মাঠ সাজাতে এবারও হিমশিম খাচ্ছে। এ আসনে বিএনপি’র রাজনীতি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। জাতীয় ও আঞ্চলিক আন্দোলন সংগ্রামের প্রভাব এখানে পড়ে না। উপজেলা বিএনপি’র প্রথম সারির নেতাদের অনুপস্থিতির কারনে এখানে বিএনপি’র সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল। তবে জেলা বিএনপি’র নতুন কমিটি ঘোষণার পর এ অঞ্চলে বিএনপি নেতা কর্মীরা কিছুটা উজ্জীবিত। তাদের দাবি, ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক আগ্রাসী মনোভাবের কারণে তারা  কোন প্রকার রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালিত করতে পারছে না। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে দলে নতুন কর্মী সংগ্রহ কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে স্হানীয় ভাবে দলীয় কার্যক্রম সক্রীয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা বিএনপির সহ সভাপতি নাজমুল হাসান তালুকদার রানা। ছাত্র রাজনীতিতে জেলা ছাত্র দলের নেতৃত্ব সহ টানা তিন বার জেলা সদরের পৌর বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এবার তিনি এ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশি বিএনপির পুরনো কমিটির সভাপতি সেলিম রেজার বাড়ি কাজিপুরে। এলাকায় তার মরহুম পিতা আফজাল হোসেন চেয়ারম্যানের একটা খ্যাতি রয়েছে। তারা এলাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ছেন। ফলে তিনিও এবারের সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনি জানান দলীয় কার্যালয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রমে বাধার কারনে চায়ের দোকানে, বাজার ও সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আগামী নির্বাচনে প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন আমার নেতাকর্মীরা। দলের যেকোনো প্রয়োজনে আমি আছি এবং থাকবো। তাই দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি সর্ব্বোচ চেষ্টা চালিয়ে যাব। সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপি’র সদস্য ব্যবসায়ী টিএম তহজিবুল এনাম তুষারও মনোনয়ন দৌড়ে থাকবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি জানান, দলের প্রয়োজনে আমি সব ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। আমার সাথে  দলের একঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ যুবকর্মী রয়েছে। তাদের নিয়ে পথ এগোতে চাই। তিনি আরও জানান, এই আসনে দল তাকে মনোনয়ন দিলে ভোটাররা তার প্রতি আকৃষ্ট হবেন এবং সেই লক্ষে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। অপরদিকে,এই আসনটিতে আওয়ামীলীগের একগুচ্ছ অধিপত্য এবং আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী থাকার কারনে বিএনপির অনেক নেতা কর্মীর ধারনা আসনটির দখল পেতে প্রার্থী নির্বাচনে আনতে হবে বৈচিত্র্যতা। যা সাধারণ ভোটারদের মনোযোগ করাবে। এরই ধারাবাহিকতায় গুঞ্জন     রয়েছে প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী কনক চাপা এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসাবে দেখা যেতে পারে। কনক চাপার জন্মস্থান এই উপজেলায় হওয়ায় এ গুঞ্জন এখন ডালপালা মেলছে। যদিও ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে এই আসনে কনক চাপার নাম শোনা গেলেও তাকে এলাকায় কখনো দেখা যায় নি। এ ছাড়াও এক সময়ের উদ্যোমী ছাত্র নেতা রবিউল হাসান এই আসনে দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন।তিনি জানান, তার জন্মস্হান কাজিপুর হওয়ায় এলাকায় তার বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। পাশাপাশি বিগত সময়ের রাজনৈতিক কোন কর্মকান্ডে কারণেও দলীয় নেতা কর্মীদের কাছে রয়েছে তার বাড়তি গ্রহণ যোগ্যতা। এছাড়া বিএনপি নেতা অধ্যাপক রহমতুল্লাহ আইয়ুব, জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি মকবুল হোসেন চৌধুরীর নামও সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছে। সদর উপজেলার যে ৪টি ইউনিয়ন কাজিপুর আসনে অন্তর্ভুক্ত তার বাড়ি ওই অঞ্চলেই।  তার মতে ভোটার আধিক্য এই ৪টি অঞ্চলেই তার ব্যাপক পরিচিতি। এছাড়া কাজিপুরেও তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। জাতীয় পার্টি: মহাজোটের শরীক জাতীয় পার্টি থেকে আবদুল মোমিন সমাজবাদী নিজ দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন।

২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পত্র জমা দিলেও পরে তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন।

জাসদ

মহাজোটের শরীক জাসদের সিরাজগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই তালুকদারের বাড়ি এ আসনের বাগবাটি ইউনিয়নে। আগামী নির্বাচনে মহাজোট হয়ে এ আসনে তাদের প্রার্থী চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে। এছাড়া এই দলের আরেক নেতা উপজেলা জাসদের সভাপতি ফজলুল হক মনোয়ারও মনোনয়ন চাইতে পারেন। এ কারণে ইতোমধ্যে সামাজিক অনুষ্ঠান ও নেতাকর্মীদের সাথে মতবিনিময় করছেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ