ঢাকা, মঙ্গলবার 17 April 2018, ৪ বৈশাখ ১৪২৫, ২৯ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

৩ নেতাকে চোখ বেঁধে ডিবি কার্যালয়ে নেয়ার অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার : সরকারি চাকরির কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা দাবি করেছেন, গোয়েন্দা পুলিশ তাদের চোখ বেঁধে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ না করেই ছেড়ে দিয়েছে। এ ঘটনাকে ‘অপহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করে গতকাল সোমবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ মিছিল করেছে আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ।
পরিষদের যুগ্ম আহবায়ক নুরুল হক নূর দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা ন্যায়ের পথে আন্দোলন করেছি, কিন্তু পুলিশ আমাদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে। নানাভাবে আমাদের হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। আমরা নিরাপদ বোধ করছি না।”
এই আন্দোলনকারীরা গতকাল সোমবার বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ ও উপাচর্যের বাসভবনে হামলার ঘটনায় দায়ের করা সব মামলা দুই দিনের মধ্যে প্রত্যাহার না করলে তারা আবার রাজপথে নামবেন। ওই সংবাদ সম্মেলনের পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে পরিষদের তিন যুগ্ম আহবায়ক নূরুল হক নূর, ফারুক হাসান, মুহম্মদ রাশেদ খানকে ডিবি পুলিশ ধরে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন আহ্বায়ক হাসান আল মামুন।
পরে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বিভিন্ন ‘সহিংসতার’ ঘটনায় যেসব তথ্যউপাত্ত পুলিশ পেয়েছে, সেগুলো যাচাই বাছাই করার জন্য ওই তিনজনকে তারা ‘ডেকে নিয়ে’ গিয়েছিলেন। “ভিসির বাসায় যে হামলা হয়েছিল, এই ঘটনায় যেসব ভিডিও ফুটেজ পেয়েছি সেগুলো যাচাই বাছাই করার জন্য তদন্তের প্রয়োজনে তাদের ডেকে এনেছিলাম। তারা চলেও গেছে।”
ডিবি অফিস ঘুরে এসে দুপুরের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের সামনে আবার সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বর্ণনা দেন আন্দোলনের নেতারা। সেখানে জানানো হয়, বেলা ১টা ২৫ মিনিটে ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের তিন যুগ্ম-আহ্বায়ককে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের সামনে থেকে ‘ধরে নিয়ে যায়’ ডিবি পুলিশ।
যুগ্ম আহবায়ক নুরুল হক নূর বলেন, “আমরা মেডিকেলে ভর্তি শিক্ষার্থীদের দেখে যাওয়ার সময় জরুরি বিভাগের সামনে থেকে ৩/৪টি মোটর সাইকেল এবং দুটো কালো কাচওয়ালা মাইক্রোবাস সেখানে আসে। রিকশা থামিয়ে টানা-হেঁচড়া করে তারা আমাদের মাইক্রোবাসে তুলে ফেলে।”
নূর বলছেন, মাইক্রোবাসে তোলার পর প্রথমে তাদের হেলমেট পরিয়ে দেওয়া হয়। গুলিস্তান এলাকায় নিয়ে ‘গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে’ ফেলা হয়। গাড়ি থেকে নামিয়ে চোখ খোলার পর তারা বুঝতে পারেন, তারা আছেন ডিবি কার্যালয়ে।  “পুলিশ আমাদের বলেছে, কিছু ভিডিও ফুটেজ দেখানোর জন্য তারা আমাদের তুলে নিয়েছে। পরে তারা আমাদের কিছুই দেখায়নি। নাম জিজ্ঞেস করে, দরকার হলে পরে ডাকা হবে বলে ছেড়ে দিয়েছে।”
ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আরেক যুগ্ম আহবায়ক মুহম্মদ রাশেদ খাঁন বলেন, “আমার বাবাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ঝিনাইদহ সদর থানায় আমার বাবাকে আটকে রাখা হয়েছে। আমার দিনমজুর বাবাকে থানায় আটকে রেখে বিশ্রী ভাষায় গালাগাল করা হচ্ছে। আমার শিবির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের জন্য তাকে চাপ দেওয়া হচ্ছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্সুরেন্স বিভাগের এই শিক্ষার্থী বলেন, “আমার পদ-পদবি নেই, তাই বলে কি আমি ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে পারব না? আমার বাবার কি অপরাধ ছিল?”
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঝিনাইদহ সদর থানার ওসি এমদাদুল হক শেখ বলেন, “ইত্তেফাকে আজ একটা খবর এসেছে যে ঢাকার কোটা আন্দোলনের নেতা রাশেদ শিবিরের সক্রিয় কর্মী। এ বিষয়ে তার বাবা সবাই বিশ্বাসকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
তবে চোখ বেঁধে জোর করে গাড়িতে তুলে ডিবি অফিসে নিয়ে যাওয়ার যে অভিযোগ আন্দোলনকারীরা করেছেন, সে বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইত্তেফাকে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মুরারীদহ গ্রামের রাজমিস্ত্রি সবাই বিশ্বাসের ছেলে রাশেদ ইসলাম ছাত্রশিবিরের ‘সক্রিয় কর্মী’। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সহিংস রূপ দেওয়া এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনে তান্ডবে তিনি ‘জড়িত’ বলে ‘তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সংস্থার নেটওয়ার্কে’ তথ্য এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, কোটা সংস্কার আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হল শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি হলেও এক সময় তিনিও ‘শিবিরের কর্মকান্ডে জড়িত’ ছিলেন এবং নেত্রকোণা সদর উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের নন্দীপুর গ্রামে তাদের পুরো পরিবার বিএনপির ‘রাজনীতির সঙ্গে জড়িত’।
আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন এক সময়। কিন্তু ঠাকুরগাঁও সদরে স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তাকে ‘শিবিরের কর্মকান্ডে জড়িত’ হিসেবে চেনে বলে দাবি করা হয়েছে ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে।
আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নূর সম্পর্কে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার বাবা পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের ইদ্রিস হাওলাদার এক সময় ইউপি সদস্য ছিলেন। তিনি এক সময় ‘বিএনপির সক্রিয় কর্মী’ ছিলেন। নূর বিয়েও করেছেন। তার শ্বশুর হাতেম মাস্টার গাজীপুরের চরবিশ্বাস ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। আর নূর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হল ছাত্রলীগের মানব সম্পদ বিষয়ক উপ সম্পাদক ছিলেন এক সময়।
সরকারি চাকরিতে কোটার পরিমাণ ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের সঙ্গে গত ৮ এপ্রিল রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যাপক সংঘর্ষ হয় পুলিশ ও ছাত্রলীগের। রাতভর ওই সংঘর্ষের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে হামলা চালিয়ে প্রায় সব কিছু ভাঙচুর করা হয়। এসব ঘটনায় পাঁচটি মামলা করা হয়।
টানা আন্দোলনের মধ্যে ১১ এপ্রিল সারা দেশে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে রাস্তায় নামে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীদের অবরোধে কার্যত অচল হয়ে যায় রাজধানীর রাজপথ। সেদিন সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে এই আন্দোলন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোটা নিয়ে যেহেতু এত কিছু, সেহেতু কোনো কোটাই আর রাখা হবে না। পরদিন দ্রুত কোটা সংস্কারের গেজেট প্রকাশসহ কয়েকটি দাবি রেখে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ।
তার চার দিনের মাথায় গতকাল সোমবার সকালে আবারও সংবাদ সম্মেলনে এসে দৈনিক ইত্তেফাকে ‘কোটা আন্দোলনের সেই চার নেতার একজন শিবিরের সক্রিয় কর্মী’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ প্রত্যাহারের দাবি জানান পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতারা।
যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক বলেন, “আজ বিকাল ৫টার মধ্যে যদি ইত্তেফাক সংবাদ প্রত্যাহার না করে এবং পত্রিকাটির সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক ও প্রতিবেদক যদি ভুলের জন্য ক্ষমা না চান, তাহলে আগামীকাল থেকে সারাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইত্তেফাক পত্রিকা বর্জন করা হবে।”
যার বিরুদ্ধে ওই প্রতিবেদনে শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে, সেই রাশেদ খাঁন বলেন, “আমার নামে এবং কেন্দ্রীয় কমিটিতে যারা আছেন তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।”
তার হলে থাকা নিয়ে ইত্তেফাকের প্রতিবেদেনে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’ ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে দাবি করে রাশেদ বলেন, “ওখানে অভিযোগ করা হয়েছে, উপাচার্যের বাসভবনে ভাংচুরের সাথে নাকি আমার সংশ্লিষ্টতা ছিল। কিন্তু সেখানে কারা ছিল, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।“আমরা আন্দোলনকারীরা সব সময় বলে আসছি যে, উপাচার্য স্যারের বাসায় যে হামলা হয়েছে, আমরা তার বিচার চাই।”
আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, “আমি হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি। ছোটবেলা থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতি করে আসছি। আমার বাবা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাত্রলীগের একটি ইউনিটের সভাপতি ছিলেন। আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।“সুতরাং যারা আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনছেন, তারা নেত্রকোনায় গিয়ে খোঁজ নিক, সেখানকার মুক্তিযোদ্ধারাই বলে দেবেন আমরা কোন আদর্শে বিশ্বাসী।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ