ঢাকা, মঙ্গলবার 17 April 2018, ৪ বৈশাখ ১৪২৫, ২৯ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দেশ কি ভোটারবিহীন নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে?

আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করেন, সরকারী ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৮ সালে কি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে? উল্লেখ্য যে, কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া তার ভাষণে চলতি বছরের শেষের দিকে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন এবং এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে জনসভা করে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং উপস্থিত শ্রোতাদের কাছ থেকে আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কায় ভোট চাচ্ছেন এবং ভোটের প্রতিশ্রুতি নিচ্ছেন। সংবিধান অনুযায়ী এই সংসদের পাঁচ বছর পূর্তির আগেই নির্বাচন হতে হবে এবং ২০১৯ সালের ১০ জানুয়ারি এর মেয়াদ শেষ হবে। ক্ষমতাসীন দলের অভিলাস অনুযায়ী বিজয়ের মাসেই নির্বাচন হবে এবং তাদের কথাবার্তা ও নির্বাচন কমিশনের হাবভাবে নির্বাচন না হবার কোনও আভাস পাওয়া যায় না। কাজেই আমিও বলি, অবশ্যই নির্বাচন হবে। তবে এখানে একটা কথা আছে, প্রস্তুতির কথা। সরকারী দল সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কিন্তু প্রস্তুত হবার জন্য বিরোধী দলের যা দরকার তা নেই। তাদের জন্য Level playing ground এখনও তৈরি হয়নি। লাখ লাখ নেতাকর্মীকে মামলায় জড়িয়ে সরকার একদিকে তাদের পঙ্গু করে রেখেছে অন্যদিকে শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে জেলে পুরে স্থবির অবস্থার সৃষ্টি করেছে। তাদের মধ্যে কোন দলই স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পারছে না। পক্ষান্তরে সরকারী দল কারণে-অকারণে রাজনৈতিক সমাবেশ করে অবাধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে এবং বিরোধী দলকে ধোলাই দিচ্ছে। সম্ভবত: এ কারণেই অনেকে নির্বাচন হওয়া না হওয়ার প্রশ্নটি তুলছেন। আরো কিছু কথা আছে।
বিএনপি চেয়ারপার্সন ও ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জামিন এখন অনিশ্চিত। তার মুক্তির জন্য যখন কিছু বিএনপি নেতা স্বেচ্ছাকারাবরণ ও গণঅনশনের ঘোষণা দিয়েছেন তখন মধ্যম সোপান ও তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে অনুপ্রেরণার একটা আবহ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু পর্যবেক্ষক মহলের মতে, যখন তা কাজে লাগিয়ে দেখানোর সময় এলো তখন গণঅনশন ও স্বেচ্ছায় কারাবরণকারীদের মাঠে খুব একটা দেখা গেল না। অর্থাৎ বেগম জিয়ার মুক্তি আন্দোলন হঠাৎ করে নিভে গেল। মাঠে-ময়দানে হোমিওপ্যাথি ধরনের ছিটে- ফোঁটা যে আন্দোলন দেখা গিয়েছিল তাও অদৃশ্য হয়ে গেল। বিএনপি ২০ দলীয় জোটকেও এতে সামিল করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। এর মধ্যে দুদক কর্তৃক বিএনপি’র সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে নথি চালাচালি শুরু করায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে বেগম জিয়ার সুনির্দিষ্ট ছয়টি শর্তও বলিষ্ঠভাবে জনগণের কাছে নিয়ে যাবার লোকের অভাব দেখা দিয়েছে বলে মনে হয়। শর্তগুলো হচ্ছে: (১) নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন; (২) নির্বাচনকালীন সরকারকে অবশ্য অবশ্যই ভোটারদের নির্বাচন কেন্দ্রে আসার জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে; (৩) নির্বাচনের পূর্বে বিদ্যমান সংসদ ভেঙে দিতে হবে; (৪) সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে; (৫) নির্বাচনের প্রাক্কালে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে এবং তারা মোবাইল ফোর্স হিসাবে কাজ করবে; (৬) ভোটের কাজে ইভিএম/ডিভিএম মেশিন ব্যবহার করা চলবে না। এই শর্তগুলোর সাথে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের আরোপিত তিনটি শর্ত যোগ করলে শর্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯টি। অতিরিক্ত তিনটি শর্ত হচ্ছে: (১) বেগম জিয়ার মুক্তি (২) বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলের সকল নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে রুজুকৃত সকল মামলা প্রত্যাহার এবং (৩) গ্রেফতারকৃত সকল নেতাকর্মীর মুক্তি।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য উপরোক্ত শর্তগুলো পূরণ অপরিহার্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শর্তগুলো পূরণ করবে কে? সকল বিবেচনায় সরকার। কিন্তু সরকার প্রধান, তার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা এবং দলীয় শীর্ষ কর্মকর্তারা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা কোনও প্রকার আলোচনায় বসবেন না। তাহলে বরফ গলবে কিভাবে? অনেকে মনে করেন যে, সন্ত্রাস ও ফ্যাসিবাদ নির্ভর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে আলোচনার টেবিলে বসাতে হলে তাদের চেয়ে শক্তিশালী আন্দোলন প্রয়োজন। কিন্তু সে আন্দোলনের লক্ষণ তো দেখা যাচ্ছে না। এর একটি বিকল্প হয়তো হতে পারে। সেটি হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক ও কূটনৈতিক চাপ। বুদ্ধিবৃত্তিক চাপ দেয়ার জন্য দেশে বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। কিছু আছেন যারা ভয়ে মুখ খুলতে চান না। আবার কিছু আছেন তারা মাথা বিক্রি করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের বেচা-কেনার এই হাটে বিএনপি বা তার জোট খুব একটা সুবিধা করতে পারছেন বলে মনে হয় না।
সরকারী টেলিভিশন তো আছেই, বেসরকারী প্রায় সবগুলো টেলিভিশন চ্যানেলই এখন আওয়ামী লীগের বন্দনায় ব্যস্ত। দুই-একটি ছাড়া সারাদেশের সকল দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকা সরকার ও সরকারী দলের মুখপত্রে পরিণত হয়েছে। মাঝে-মধ্যে কিছু কিছু জাতীয় দৈনিক পাঠক ধরে রাখার কৌশল হিসাবে কিছু কিছু বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে। পার্সেন্টেজের দিক থেকে কম হলেও বিরোধী দলের আন্দোলনের উপাদান হিসেবে এগুলো খুবই মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে এগুলোকে কাজে লাগানোর লক্ষণ খুব কম। অনেক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী আছেন যারা এখন সংসার চালাতে পারছেন না। তারা যেসব পত্র-পত্রিকায় কাজ করেন তাদের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ; বেতন দেয়ার অবস্থায় নেই। এসব পত্রিকা সরকারী বিজ্ঞাপন পায় না; বেসরকারী বিজ্ঞাপন ও সরকার নিয়ন্ত্রণ করায় সাংঘাতিকভাবে তা নেমে এসেছে। বিরোধী দলসমূহের সমর্থক যেসব ব্যবসায়ী শিল্পপতি আছেন তারা যদি পত্রিকাগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা করতেন তাহলে এই ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা অনেক উপকৃত হতেন। তার অবর্তমানে তারা জনগণের সমস্যা ও সরকারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও দার্শনিক পরিবেশ সৃষ্টি করছেন তারাও সীমিত অবস্থায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে। বুদ্ধিবৃত্তিক চাপ দেয়ার জন্য বুদ্ধিজীবীদের যে অবস্থানে থাকার কথা তার থেকে তারা অনেক দূরে। আবার বুদ্ধিজীবীরা যদি দুর্বল হন তাহলে চাপ সৃষ্টির জন্য বিদেশী কূটনীতিকদের উপাত্ত সংগ্রহ ও Mobilize করার জন্য যা দরকার তা করার লোক খুব কমই থাকে। এক্ষেত্রে দলীয় কূটনীতিকদের অগ্রগামী থাকতে হয়। কিন্তু বিরোধী দলের কূটনীতিকদের এক্ষেত্রে দৃশ্যপটে খুব একটা দেখা যায় না। বেগম জিয়ার অবৈধ শাস্তি এবং সরকার বিরোধী রায় দেয়ায় প্রধান বিচারপতিকে সরকারিভাবে অপমান, তার দেশ ত্যাগ ও চাপের মুখে পদত্যাগ এবং তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, বিরোধী দলকে শৃঙ্খলিত রেখে সরকারি দলের নির্বাচনী প্রচারণা, দমন-নিপীড়ন, সরকারি সন্ত্রাস, দুর্নীতি প্রভৃতি সম্পর্কে বিদেশী কূটনীতিকদের অবহিতকরণ, বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার করানোর ব্যাপারে তারা অদ্যাবধি কোনও সাফল্য দেখাতে পারেননি। সরকারি দল ৬৫০ জন বৃটিশ এমপি ছাড়াও বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই বিএনপি-জামায়াতকে সন্ত্রাসী জঙ্গি আখ্যায়িত করে অপ-প্রচার ছড়িয়েছে। তার মোকাবেলার এই দলগুলোর তরফ থেকে ফলপ্রসূ ও কার্যকর কোনও প্রচারণা চালানো হয়েছে বলে মনে হয় না। এটা খুবই দরকার কেন না উদ্ধত স্বভাবের একটি সরকারকে আলোচনার টেবিলে বসানোর জন্য বিদেশী চাপের প্রয়োজন রয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ছিল বাংলাদেশে ভোটারবিহীন একটি প্রহসনের নির্বাচন। ৩০০ আসনের ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচন একটি অবিশ্বাস্য বিষয়। আওয়ামী লীগ কিন্তু তা হজম করে ফেলেছে। বিশ্ব সম্প্রদায়কে বিরোধী দলগুলো Convince করতে পারেনি। এতে দলটির সাহস অনেক বেড়ে গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সকল দলকে নিয়ে আরেকটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতাসীন দল এখন বেগম জিয়াকে মাইনাস করেই শুধু নির্বাচন করতে চেষ্টা করছে না তারা জোট ভেঙে এমনকি বিএনপিকেও ভেঙে প্রয়োজনে একতরফা নির্বাচন করতে চায়। এই উদ্দেশ্যে তারা তাদের যুব গ্রুপগুলোকে (ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ) ইতোমধ্যে অস্ত্র ও অর্থসজ্জিত করেছে। সরকারি কর্মচারী, বুদ্ধিজীবী প্রমুখসহ বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষকে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের সমর্থনে ক্ষমতা পাকা পোক্ত করার সকল আয়োজনও সম্পন্ন করেছে। এতে তাদের আত্মম্ভরিতা বেড়ে গেছে এবং নির্বাচন সংক্রান্ত বিরোধী দলের দাবি-দাওয়া ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোকে তারা অব্যাহতভাবে উপেক্ষা করতে শুরু করেছেন।
নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশে সংকট সৃষ্টি হয়ে আসছিল। এই সংকট এবং সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে এই দেশে গণ-আন্দোলন হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গণ-আন্দোলনে গণ-নাশকতায় হাজার হাজার কোটি টাকার জাতীয় সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে। বহু মানুষ জীবন দিয়েছেন। গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার প্রচলনের মাধ্যমে সমস্যার সুরাহা হয়েছে। কিন্তু এই কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ এই মীমাংসিত বিষয়টিকে আবার অনিশ্চয়তায় দিকে ঠেলে দিয়েছে। ব্রুট মেজরিটিতে সংবিধান সংশোধন করে তারা শুধু দলীয় সরকারই ফিরিয়ে আনেনি পার্লামেন্ট বহাল রেখে নির্বাচনের প্রথাও চালু করেছে। ২০১৪ সালে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ হয়েছে, বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করেছে। অবস্থার এখনো পরিবর্তন হয়নি। নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আওয়ামী লীগ আলাপ-আলোচনায় রাজী নয়। সরকারের অবস্থান বিরোধী আন্দোলন এখনো দানা বেঁধে উঠেনি। এই অবস্থায় বিরোধী দল নির্বাচন করতে পারে না। এতে এটাই প্রতীয়মান হওয়া স্বাভাবিক যে, আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে নির্বাচন হবে তবে তা ২০১৪ সালের নির্বাচনের ন্যায় বিরোধী দল এবং ভোটারবিহীন হবার সম্ভাবনাই বেশি। সরকার জানে যে, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচন হলে তারা পুনরায় ক্ষমতায় আসতে পারবেন না। কাজেই এই ঝুঁকি তারা নিতে পারেন না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ