ঢাকা, মঙ্গলবার 17 April 2018, ৪ বৈশাখ ১৪২৫, ২৯ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

স্বাধীনতার স্বপ্ন

মাইমুনা সুলতানা : গভীর রাত, চারপাশ নিস্তব্ধ। দূরে থেমে থেমে শেয়ালর ডাক শোনা যাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছেন চল্লিশোর্ধ আয়েশা বেগম। আজ কিছুতেই ঘুম আসছে না তার। অনেক্ষণ ধরে ঘুমানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে উঠে বসলেন বিছানায়। অন্ধকারে হাতরে ছোট টর্চ লাইটটা বের করে আলো জ্বাললেন। ঘরির কাটা প্রায় ১টা ছুঁই ছুঁই। নাহ্ এভাবে সময় আর কাটছে না। খোলা জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। কী ঘুটঘুটে অন্ধকার! নিকশ আঁধারে আকাশের তারাগুলো মিটমিট করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে ভাবনায় ডুবে গেলেন আয়েশা বেগম।
আজ তিন মাস হয়ে গেল আসলাম বাড়ি আসে না। একটা চিঠিও সে পাঠায়নি। এমনটা তো কখনোই হয়নি। ক’মাস আগে পরীক্ষার কারণে বাগি আসতে না পারায় চিঠিতে মাকে জানিয়েছিল। আসলাম আয়েশা বেগমের বড় ছেলে। ভার্সিটির অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র হলেও মায়ের কাছে সে ছোট্ট খোকা। বছর চারেক আগে যখন বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিল অবোধ শিশুর মত ডুকরে কেঁদেছিল সে। আয়েশা বেগম বুকে পাথর চাপা দিয়ে নিজেকে সংযত রেখেছিলেন। কিন্তু আজ তিনি অধীর হয়ে পড়েছেন ছেলের জন্য। নানা আশংকা উঁকি দেয় মনের মাঝে। আজকাল দেশের অবস্থা ভাল যাচ্ছে না। নাহ্ তার এমন শান্ত, সুবোধ ছেলেটির কিছু হতেই পারে না, নিজেকেই সান্ত¡না দেন তিনি।
এসব ভাবতে ভাবতে বিছানা ছেড়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলন কাঠর আলমিরাটার দিকে। বের করে হাতে নিলন সযত্নে রাখা পারিবারিক অ্যালবামটা। পাতাটা উল্টাতেই বুকটা ধুক করে উঠে। একটা পুরনো কষ্ট আচ্ছন্ন করে দিয়েছে তার সমস্ত সত্তাকে। প্রায় ছ’টি বছর পেরিয়ে গেছে, বড় অকালেই তাকে রেখে চলে গেছে প্রিয় মানুষটা। সেই থেকে জীবন সংগ্রামে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়েছেন তিনি। ৩টি সন্তানকে মানুষ করতে বিরামহীন লড়ে গেছেন নিজের সাথে। ছেলেকে শহরে পাঠিয়েছেন, ভার্সিটিতে পড়ে বড় মানুষ হবে। ছোট দু’টি ভাই-বোন আর বৃদ্ধা মায়ের আশ্রয় হবে সে। এই তো ক’দিন পরই অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দেবে। কিন্তু কি হল তার? আবারো ঝাপসা হয়ে আসে আয়েশা বেগমের দৃষ্টি। আঁচলে চোখ মুছে পলকহীন চেয়ে থাকেন ছেলের ছবিটার দিকে। অবিকল বাবার মত হয়েছে। বুদ্ধিদীপ্ত চেহারায় দৃঢ়তর ছাপ স্পষ্ট। ছোটবেলা থেকেই আর দশটা ছেলের চেয়ে ব্যাতিক্রম ছিল সে। একেবারে বাধ্য ছেলেটির মত বাবা-মায়ের সব চাওয়া পুরণ করতে কখনো চেষ্টার ত্রুটি করেনি। বাবার বড় স্বপ্ন ছিল, ছেলেটি তার প্রতিভায়-যোগ্যতায় দেশটাকে গড়ার দায়িত্ব নেবে। অবহেলিত, নিষ্পেষিত মানুষের মুখে হাসি ফোঁটাবে। এসব ভেবে আর স্থির থাকতে পারেন না আয়েশা বেগম। চোখ বেয়ে নেমে আসা তপ্ত অশ্রুর ধারা মাটি ভিজিয়ে দিচ্ছে। বুকে চেপে ধরেন তার নাড়ি ছেড়া সন্তানের নিশ্চল ছবিটা।
স্কুল থেকে ফিরে বাড়ির আঙ্গিনায় এসেই শিং মাছের ঝোল আর ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ পায় আফিয়া। তাহলে কি ভাইয়া এসেছে! মনটা তার আনন্দে নেচে উঠে। ভাইয়ার প্রিয় খাবারগুলোর সাথে সেও পরিচিত। ভাবছে সে, এবার নিশ্চয়ই ভাইয়া জলরং আনতে ভুল করেনি।
একদৌড়ে ভাইয়ার রুমে ঢুকে আফিয়া। কই? ভাইয়া তাহলে রন্নাঘরে মায়ের সাথে গল্প করছে। আবার ছুট দেয় রান্নাঘরে। এবার মনটাই খারাপ হয়ে যায়। ঘরে এসে দেখে মা শুয়ে আছে। তার উদাস দৃষ্টি জানালার গরাদের ফাঁকে শূন্যের পানে, কী যেন খুঁজে ফিরছে। আফিয়া জড়িয়ে ধরে মাকে। মা ভাইয়া কোথায়? সম্বিত ফিরে পেয়ে তিনি কাছে টেনে নেন মেয়েকে। কপালে আলতো চুমু খান। পাগলি, তোকে কে বলেছে ভাইয়া এসেছে? তুমি যে তাহলে শিং আর ইলিশ রেধেছ? বিষণœতায় ছেয়ে যায় তার মুখটা। কী জবাব দেবেন মেয়েকে? তিনিও যে আনমনে অপেক্ষা করছেন ছেলের জন্য! বললেন, এগুলো তো তোরও প্রিয়! এবার ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে আফিয়া। প্রচন্ড রাগ হয়, ভাইয়াটা এমন পাষাণ হল কেমন করে! সে যে প্রতিদিন চুলে লাল ফিতার ঝুঁটি বেঁধে, ঠোঁটে লিপস্টিক পরে বসে থাকে তার জন্য। ভাইয়া এসে কোলে তোলে আদরে আদরে ভরিয়ে দেবে, অনেক গল্প শুনাবে। ভাইয়ার কাছে গল্প শুনেই তো সে তার সবুজ-শ্যামল দেশটাকে গভীর ভালবাসে। রংতুলিতে আপন মনে সবুজে ঘেরা পল্লি গ্রামের ছবি আঁকে।
বিকালে আফিয়া আর খেলতে যায় না। অনেক অভিমান নিয়ে তার কাঁচা হাতে ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দে চিঠি লিখে। মনের সব আকুলতা ঢেলে ভাইয়াকে বাড়ি আসার আবদার করে।
দিন দিন দেশের পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে থাকে। এক কালো রাত্রিতে শত্রু সেনারা আঘাত হানে বাংলার ঘুমন্ত মানুষের উপর। চারিদিকে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠে। আফিয়ার আর স্কুলে যাওয়া হয়না। এদিকে আয়েশা বেগম ছেলের পথ চেয়ে বিনিদ্র রাত কাটান, দু’চোখের পাতা তার এক করতে পারেন না। হঠাৎ এক রাতে দরজায় মৃদু আওয়াজ পেয়ে ধড়মড় করে উঠে বসেন তিনি। নিঃশব্দে বাইরে উঁকি দেন। এ যে তার আসলাম! দুরু দুরু বুকে দরজা খুলেন তিনি। আসলাম মাকে জড়িয়ে ধরে। ভাল আছ তো মা? এত রাতে তুমি জেগে আছ? আমার বুড়িটা কোথায়? একশ্বাসে প্রশ্ন করে যায় সে। আয়েশা যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। অতিকষ্টে বললেন, বাবা তুই কেমন আছিস? এতদিন পরৃ মাকে থামিয়ে দিয়ে বলে সে মা ক্ষুধা পেয়েছে, খাবার দাও। সব বলব তোমায়। খেতে খেতে আসলাম একে একে বলে যায়, দেশের দুরাবস্থার কথা, দেশের মুক্তি সংগ্রামে মানুষের আত্মত্যাগের গল্প। সে আরো বলে তার স্বপ্নের কথা, মা আমরা কখনো হেরে যাব না। দেখো মা, তোমার জন্য, দেশের মানুষের জন্য স্বাধীনতার একটি রক্তিম সূর্য এনে তবেই ফিরব আমরা। এরপর ঘুমন্ত বুড়িটাকে, আদরের ছোট ভাইটাকে এক পলক দেখে নিয়ে জলরঙ এর বক্সটা মায়ের হাতে দিয়ে যাবার প্রস্তুতি নেয়। মায়ের দোয়া নিয়ে দ্রুত বেড়িয়ে পড়ে। আর পেছন ফিরে তাকায় না। মায়ের অশ্রুসজল দৃষ্টি যে তাকে বড় দুর্বল করে দেয়!
এমনি করে কয়েকটা মাস পেরিয়ে গেছে। ছোট্ট আফিয়াও আর বসে থাকেনা ভাইয়ার অপেক্ষায়। এই ক’দিনেই সে অনেক বড় হয়ে গেছে। অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে। আয়েশা বেগম বুকে পাষাণ বেধে নিজেকে স্হির রাখার চেষ্টা করেন ছেলে-মেয়ে দু’টির দিকে তাকিয়ে। এরই মধ্যে দেশ শত্রুমুক্ত হয়। জন্ম নেয় এক নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ। আসলাম ফিরে এসেছে লাল সাজে সজ্জিত হয়ে। সে মাকে দেয়া তার কথা রেখেছে। আয়েশা বেগম আর আফিয়া বার বার জ্ঞান হারাচ্ছিল। তার আসলাম যে আর কখনো বায়না করবে না মায়ের রান্না প্রিয় খাবার খেতে! সে কখনো আসবেনা আফিয়াকে কোলে তোলে স্বাধীনতার গল্প শুনাতে।
২৬ শে মার্চ, পূর্ব দিগন্তে একটা রক্তিম সূর্য উঠেছে। যেন আসলামদের রক্ত মেখেই এমন লাল হয়েছে! আফিয়া ভাইয়ার দেয়া জলরঙ দিয়ে তুলির আঁচরে আঁকে সবুজের বুকে লাল সূর্য, স্বাধীন দেশের পতাকা। পতাকাটি হাতে আস্তে করে উঠানের একপাশে পলাশ গাছটার নিচে এসে দাঁড়ায়, যেখানে ভাইয়া ঘুমিয়ে আছে। পলাশ ফুলগুলোও আজ কেমন অদ্ভুত লাল! আফিয়া গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যার মাথার পাশটাতে। যতœ করে গেঁথে দেয় তার হাতের পতাকাটা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ