ঢাকা, বৃহস্পতিবার 20 September 2018, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বারবার নৌ দুর্ঘটনায় হুমকির মুখে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক:

সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে নদীপথে নৌ দুর্ঘটনা থামছে না। বারবার কয়লা ও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থবাহী নৌযানডুবির ঘটনার ফলে হুমকির মুখে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনের উদ্ভিদ এবং জলজ প্রাণীসহ এলাকার সমগ্র জীববৈচিত্র্য।

গত পাঁচ বছরে সুন্দরবনের মধ্যে ফার্নেস অয়েল ট্যাংকার,কয়লা,যাত্রীবাহী লঞ্চ এবং সারবোঝাই কার্গোসহ আটটি ছোট-বড় নৌযানডুবির ঘটনা ঘটেছে। নৌযানডুবির পর নানা তোড়জোড় হলেও পরবর্তীতে তা খানিকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ডুবন্ত ওই সব নৌযান উদ্ধারও বিলম্বিত হয়। এতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতির আশংকা করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ করার দাবি করছে বন বিভাগও।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের তথ্য অনুসারে, ২০১৩ সালে ১৪ মার্চ থেকে চলতি ২০১৮ সালের ১৪ এপ্রিল এই পাঁচ বছরে একটি অয়েল ট্যাংকার, ছয়টি কয়সা ও সার বহনকারী জাহাজ, একটি লঞ্চসহ মোট আটটি বাণিজ্যিক নৌযানডুবির ঘটনা ঘটেছে।

এর মধ্যে ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ 'এমভি মোতাহার', ২০১৪ সালের ২৪ নভেম্বর 'এমভি শাহীদুত',একই বছর ৯ ডিসেম্বর ফানেস অয়েলবাহী ট্যাংকার 'এমভি সাউদার্ন স্টার-৭,২০১৫ সালের ৬ মে 'এমভি জাবালেনুর', একই বছর ২৮ অক্টোবর 'এমভি জিয়া রাজ',২০১৬ সালের ১৯ মার্চ 'এমভি সি হর্স-১', ২০১৭ সালের ১৩ জানুয়ারি 'এমভি আইজগাথী' এবং চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল 'এমভি বিলাস; নামে বিভিন্ন ধরনের নৌযান ডুবির ঘটনা ঘটে।

২০১৪ সালে সুন্দরবনের পূর্বাঞ্চলে জৈমনিগোলে শিলা নদীতে প্রায় সাড়ে তিন লাখের বেশি লিটার ফার্নেস তেল বহনকারী একটি ট্যাংকারডুবির ঘটনা ঘটে। নদীটি সুন্দরবনের জলজ প্রাণীদের জন্য একটি প্রধান আশ্রয়স্থল।নদীটির সাথে অন্তত ২০টি খাল এবং প্রধান নদী পশুর সংযুক্ত। ওই তেল নদীটির ৪৫ মাইলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। যার ফলে অঞ্চলের উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণীসহ ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়।

সর্বশেষ গত শনিবার রাতে সুন্দরবনের কাছে মোংলা বন্দরের পশুর নদীর হারবারিয়া এলাকায় কয়লাবোঝাই একটি কার্গোডুবির ঘটনা ঘটে।

মোংলা বন্দরের বন্দর মালিক কমান্ডার অলি উল্লাহ জানান, শনিবার রাত ১০টার দিকে 'এমভি বিলাস' নামে কয়লাবোঝাই একটি কার্গো মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলে ডুবে যায়। ৭৭৫ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে কার্গোটি যাচ্ছিল। হারাবারিয়া থেকে ছেড়ে আসার কয়েক কিলোমিটারে মধ্যে চ্যানেলের বাইরে গিয়ে মাটির সাথে ধাক্কা লাগার পর ধীরে ধীরে কার্গোটি ডুবে গেছে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডুবে যাওয়া স্থান থেকে কয়েক ফুট নদীর ভেতরের দিকে সরে গেছে কার্গোটি। এরইমধ্যে কার্গোটি পলিমাটিতে চাপা পড়তে শুরু করেছে। জোয়ারের সময় কার্গোটির ওপর দিয়ে কয়েক ফুট উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হচ্ছে। সোমবার পরিবেশ অধিপ্তরের কর্মকর্তারা ডুবন্ত ওই কার্গোটির স্থান থেকে পরীক্ষার জন্য নমুনা হিসেবে পানি সংগ্রহ করেছে। বন বিভাগ দ্রুত ওই কার্গোটিকে উত্তোলনের জন্য মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে। আর মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ কার্গোর মালিক পক্ষকে নিদিষ্ট সময়ের মধ্যে কার্গো উত্তোলনের জন্য জানিয়ে দিয়েছে। তবে তিনদিন হয়ে গেলেও ওই কার্গো উত্তোলন কাজ শুরু হয়নি বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডোর একেএম ফারুক হাসান জানান, কয়লাবোঝাই কার্গোটি বন্দর চ্যানেলের বাইরে ডুবে থাকায় ওই চ্যানেল দিয়ে নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল করছে । কার্গোটিকে ১৫-২০ দিনের মধ্যে উত্তোলনের জন্য মালিকপক্ষকে জানানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মালিকপক্ষ ওই কার্গো উত্তোলন করতে ব্যর্থ হলে কার্গোটিকে বন্দরের অনুকুলে নিলাম ঘোষণা করা হবে। এর পর বন্দর কর্তৃপক্ষ ওই কার্গো উত্তোলন কার্যক্রম শুরু করবে।

এদিকে কার্গোটির মালিকপক্ষ বলছে, দ্রুত তারা ওই কার্গোটিকে উত্তোলন কাজ শুরু করবে। এরইমধ্যে তারা ওই কার্গো থেকে কয়লা খালাসের জন্য দুটি নৌযান ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে। আগামী দু'একদিনের মধ্যে কার্গোটিকে টেনে তীরে আনা সম্ভব হবে বলে দাবি মালিকপক্ষের।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের মধ্যে একের পর এক নৌযান ডুবতে থাকলে জলজ প্রতিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। ডুবন্ত কয়লাবাহী কার্গোটি দ্রুত উত্তোলনের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মাহমুদুল হাসান ইউএনবিকে জানান, সুন্দরবনের খুব কাছে মোংলা বন্দর চ্যানেলে পশুর নদীতে সুন্দরবনের মধ্যে কয়লাবোঝাই ওই কার্গোটি ডুবে আছে।

ভাটার সময় কার্গোটির পেছনের অংশ সামান্য দেখা গেলেও জোয়ারের সময় প্রায় সাত থেকে আট ফুট উচ্চতায় কার্গোর উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। আর ওই পানি সুন্দরবনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।

মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, যেহেতু ওই চ্যানেল মোংলা বন্দরের। এ কারণে দ্রুত কার্গোটি উত্তোলনের জন্য মোংলা বন্দরের পক্ষ থেকে মালিককে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দ্রুত ওই কার্গো উত্তোলন করা না হলে বন বিভাগের পক্ষ থেকে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

তিনি আরো বলেন, সুন্দরবনের মধ্যে কয়লাবোঝাই কার্গোডুবির ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। বন বিভাগের সদস্যরা সার্বক্ষণিক বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানান তিনি ।

ডিএফও আরো জানান,সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে পশুর নদী। আর মোংলা বন্দরে জাহাজ চলাচলের জন্য মূল চ্যানেল হচ্ছে পশুর নদী। হারবারিয়া থেকে সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে পশুর নদী পথে মোংলা বন্দরে জাহাজ চলাচল করে। আর সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে নৌযান চলতে গিয়ে মাঝে মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব নৌযানডুবির কারণে ক্ষতির মুখে পড়ে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। সুন্দরবনের মধ্যে নৌযান চলাচল বন্ধ হওয়া দরকার বলে মনে করেন ডিএফও।

এদিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্টি এণ্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেন বলেন, কয়লায় সালফার এবং ভারি ধাতবপদার্থ রয়েছে। যা ইকোসিস্টেমের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সুন্দরবনের মধ্যে কয়লাবোঝাই কার্গো ডুবে থাকলে সেটি জলপরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে। এভাবে নৌযান ডুবে থাকলে চ্যানেলের গতিপথ পরিবর্তন হতে পারে। দেখা দিতে পারে নদী ভাঙন। আর অনেক দিন ধরে নৌযান ডুবে থাকলে পলিমাটি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে পড়ে।

তিনি আরো বলেন,ডুবন্ত নৌযান অবশ্যই অতি দ্রুত উত্তোলন করতে হবে। অন্যথায় নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। দুর্ঘটনা এড়াতে নৌযানে ফিটনেস, দক্ষ চালক এবং নৌযানের ধারণক্ষমতা যথাযতভাবে যাচাই করার পরামর্শ দেন তিনি।

সূত্র: ইউএনবি

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ