ঢাকা, বুধবার 18 April 2018, ৫ বৈশাখ ১৪২৫, ১ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এতিম -ড. দেবপ্রিয়

গতকাল মঙ্গলবার সিরডাপ মিলনায়তনে সিপিডির উদ্যোগে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বাধীন পর্যালোচনা বিষয়ে মিডিয়া ব্রিফিং-এর আয়োজন করা হয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : ব্যাংক খাতে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে, এ খাত বর্তমানে এতিম অবস্থায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। দেশে বিনিয়োগ কম থাকায় বেকারত্ব বাড়ছে। অবস্থা এমন যে, পড়াশোনা যত বেশি বেকার তত বেশি। প্রবৃদ্ধি  বাড়লেও সুফল পাচ্ছে না। একই সাথে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়লেও রহস্যজনকভাবে টাকা উধাও হয়ে গেছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে জাতীয় বাজেট ২০১৭-১৮ উপলক্ষে সিপিডির সুপারিশমালা শীর্ষক এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন ও গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, দেশ এখন কর্মসংস্থানহীন, প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে বেরিয়ে আয়হীন কর্মসংস্থানের দিকে এগুচ্ছে। কিন্তু ব্যাংকের রক্ষকরাই ভক্ষক হিসেবে কাজ করছে। ফলে আমাদের অর্থনীতি এখন একটা ভ্রমের মধ্যে রয়েছে। এমন অবস্থায় চলতি অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়াবে ৫০ হাজার কোটি টাকা।
 তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে তর্কবিতর্ক হতে পারে। কিন্তু ফল যা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হয় দেশে আয়হীন কর্মসংস্থান বাড়ছে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির তুলনায় তিন বছর ধরে একই জায়গায় আটকে আছে। মুদ্রানীতিতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ দশমিক ৫ ছাড়িয়ে হয়ে গেছে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। তিনি প্রশ্ন করেন, এত টাকা গেল কোথায়?  প্রবৃদ্ধি যা হয়েছে, তা মূলত সরকারি বিনিয়োগের কারণে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক থেকে এত টাকা ঋণ আকারে যাওয়ার পরও কেন বিনিয়োগ বাড়ল না, সেই বিষয়টি অস্পষ্ট মনে করছে সিপিডি।
তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয় এই চারটির মধ্য সামঞ্জস্য আছে কি না দেখতে হবে। সামঞ্জস্য না থাকলে বুঝতে হবে সমস্যা আছে। আমরা দেখছি দেশে কর্মসংস্থান বাড়লেও আয় কমছে। অর্থাৎ দেশ আয়হীন কর্মসংস্থানে পরিণত হয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) উচ্চতর প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কর্মসংস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আগে ছিল কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি, এখন হয়ে গেছে আয়হীন কর্মসংস্থান।
তিনি আরো বলেন, মুদ্রানীতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ধরা হলো ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু বিতরণ হয়েছে ১৮ শতাংশের বেশি। অথচ বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির অবস্থায় রয়েছে। তাহলে টাকা গেল কোথায়? ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ না বাড়ায় আয়হীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি বলেন, মুদ্রানীতি ঘোষণার কিছু দিন পর আবার সিআরআর কমানো হয়েছে। আপনি নিজের ঘোষিত মুদ্রানীতি যদি না মানেন, তার অর্থ হচ্ছে আপনি বিকলাঙ্গ ব্যাংকিং ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছেন।
এ ছাড়া মিডিয়া ব্রিফিংয়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পেছনে আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটে সরকারের এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় (৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা) ধরার প্রস্তাব দিয়েছে সিডিপি।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিষয়ে গত বছরের শুরুতে আমরা বলেছিলাম ২০১৭ সাল ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির বছর। এবার আমাদের মনে হচ্ছে ব্যাংকিং খাত নিতান্তই এতিমে পরিণত হয়েছে। এর রক্ষকরাই এখন এই শিশু, এতিমের ওপর অত্যাচার করছেন। যাদের এটা রক্ষা করার কথা ছিল, তারাই বিভিন্ন চাপের মুখে বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছেন।
 দেবপ্রিয় বলেন, মুদ্রানীতি ও ব্যাংকিং খাতে সংযত থাকার দরকার আছে। একই রকমভাবে মুদ্রা বিনিময় হারে সংযত থাকার দরকার আছে। আপনি এটাকে গতিশীল ও স্থিতিশীল করবেন। বিনিময় হারে হয় তো ডলারের দাম বাড়বে। কিন্তু এমনভাবে মজুদ বাড়িয়ে সামাল দিতে হবে যাতে আমদানি ব্যয় উস্কে না দেয়। সুদের হার, বিনিময় হার, ঋণের প্রবাহ সংযতই রাখতে হবে।
তিনি বলেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ হোক, ৭ শতাংশ হোক, ৮ শতাংশ হোক তাতে কিছুই যায় আসে না। ফলাফল কী সেটাই মূল কথা। কর্মসংস্থান বেড়েছে, কিন্তু প্রকৃত আয় কমেছে আড়াই শতাংশের মতো। এই কর্মসংস্থানের মধ্যে আবার পুরুষদের চেয়ে নারীদের আয় কমেছে। শহরের চেয়ে গ্রামীণ আয় কমেছে। আগে বলা হতো, পড়াশোনা করে যে চাকরি-বাকরি পায় সে। কিন্তু বর্তমানে পড়াশোনা করেও অনেকেই চাকরি পাচ্ছে না।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, আগে আমরা উচ্চতর প্রবৃদ্ধির তাগাদা দিতাম। কিন্তু এখন বিষয়টি সে রকম না। এখন দরকার শোভন কর্মসংস্থান। যাদের কর্মসংস্থান হয়েছে তাদের আয় কম। আবার শ্রমের পরিবেশও নেই।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগ স্থবির রয়েছে। অথচ বেসরকারি খাতে সাড়ে ১৮ শতাংশ ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এত টাকা গেলো কোথায়? অথচ আমদানি বাড়ছে। এই টাকা পাচার হয়েছে কিনা তা নিয়ে আমার সংশয় রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ