ঢাকা, বুধবার 18 April 2018, ৫ বৈশাখ ১৪২৫, ১ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সেনা মোতায়েন ও ইভিএম ব্যবহার না করার বিএনপি‘র দাবি নাকচ করেছে ইসি

গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনারদের সাথে বিএনপির বৈঠক -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের সাত দিন আগে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। সেই সাথে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার না করা এবং গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুনুর রশীদের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে তাকে অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে দলটি। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েন এবং ইভিএম ব্যবহার না করার বিষয়ে বিএনপির দাবি নাকচ করেছে। আর পুলিশ সুপার প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানিয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ।
গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনে গিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এসব দাবি জানানো হয়। পরে কমিশন সচিব  ব্রিফিংয়ে কমিশনের অবস্থান জানান। বেলা ১১টায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের  নেতৃত্বে ছয় জনের প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাসহ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে।
কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ জানান, বৈঠকে গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের সাত দিন আগে সেনা মোতায়েন, ভোট নিতে ইভিএম ব্যবহার না করা, গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুনুর রশীদকে প্রত্যাহারসহ ২০ টি দাবি জানিয়েছে বিএনপি।
কমিশন কী ভাবছে, এমন প্রশ্নে ইসি সচিব বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা ইসির নেই। ইভিএম এর মতো প্রযুক্তি আইনানুগভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে স্থানীয় নির্বাচনে। এরপরও এ নিয়ে আপত্তি থাকলে বিএনপিকে ইভিএম আবারও দেখার জন্যে অনুরোধ করা হয়েছে। ইভিএম নিয়ে যেন কোনো সন্দেহ না থাকে তা নিশ্চিত করতে বিএনপিকে প্রযুক্তিটি প্রয়োজনে বারবার প্রদর্শন করা হবে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপারের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে- এমন প্রশ্নে ইসি সচিব বলেন, এ নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি কমিশন। এসব বিষয় আইন-বিধির সঙ্গে যুক্ত। তবে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নিয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তা নিয়ে কমিশন পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেবে।
হেলালুদ্দীন বলেন, কিছু প্রস্তাবের বিষয়ে কমিশন আইনানুগভাবে বাস্তবায়ন করবে। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি, নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ।
বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে সিইসি ছাড়াও চার নির্বাচন কমিশনার এবং ইসি সচিব উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, ব্যারিস্টার মাহাবুব উদ্দিন খোকন।
গাজীপুরের এসপি হারুনুর রশীদের বিষয়ে বিএনপির আপত্তি পুরনো। ২০১১ সালে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে সে সময়ের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নাল আবদীন ফারুককে পিটুনির ঘটনায় হারুন সেখানে ছিলেন। সে সময় তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও অঞ্চলের সহকারী উপকমিশনার ছিলেন।
ওই ঘটনার কিছুদিন পর হারুনের পদোন্নতি হয় এবং পরে তিনি গাজীপুরের পুলিশ সুপার হিসেবে নিয়োগ পান। কোনো জেলায় এসপি হিসেবে এত বছর থাকা নিয়ে প্রশ্ন আছে বিএনপির।
দুই বছর আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় গাজীপুরের শ্রীপুরে এক ইউপি সদস্য প্রার্থীকে কুপিয়ে হত্যা এবং নির্বাচন সংক্রান্ত নানা অভিযোগের পর হারুনকে ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল প্রত্যাহার করে নির্বাচন কমিশন। পরে তাকে পুনর্বহাল করা হয়।
এসপি হারুনকে পক্ষপাতদুষ্ট মনে করে বিএনপি। তাদের ধারণা, তিনি দায়িত্বে থাকলে ভোটের আগে বিএনপির নেতা-কর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করবেন। এ কারণে তাকে সরিয়ে দেয়ার দাবি তুলছেন তারা।
ইভিএম নিয়ে বিএনপির আপত্তির কারণ সুদূরপ্রসারী। নির্বাচন কমিশন গত ডিসেম্বরে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও পরীক্ষামূলকভাবে একটি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করেছিল। আর গাজীপুর ও খুলনায় আরও বেশি কেন্দ্রে তারা এই যন্ত্র ব্যবহার করে ভোট নিতে চায়। কমিশন এই ইভিএমের ব্যবহারকে পরীক্ষামূলক হিসেবে দেখছে। বলছে, সিটি নির্বাচনে পরীক্ষা সফল হলে জাতীয় নির্বাচনেও তারা যন্ত্রটির ব্যবহার করবে।
কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে আপত্তি আছে বিএনপির। তাদের ধারণা, এই যন্ত্র ব্যবহার করে ভোটে কারচুপি করা সম্ভব। গত বছর নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে এই বিষয়টি তুলে ধরে তারা।
আর ভোটের আগে সেনা মোতায়েন বিএনপির নিয়মিত দাবি। জাতীয় থেকে শুরু করে যত স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়েছে, তার প্রতিটিতেই বিএনপি এই দাবি জানিয়ে আসছে।
দুই মহানগরে দলীয় প্রতীকে ভোট হবে আগামী ১৫ মে। পাঁচ বছর আগে দলীয় প্রতীক ছাড়া ভোটে দুই মহানগরেই বড় ব্যবধানে জিতেছিলেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা। তবে খুলনায় তখন বিজয়ী মনিরুজ্জামান মনির জায়গায় বিএনপি এবার প্রার্থী করেছে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে যাকে লড়াই করতে হবে আওয়ামী লীগের ডাকসাইটে নেতা তালুকদার আবদুল খালেকের সঙ্গে।
অন্যদিকে গাজীপুরে ২০১৩ সালে দেড় লাখ ভোটে জয়ী এম এ মান্নানকে ধানের শীষ প্রতীক না দিয়ে বিএনপি প্রার্থী করেছে হাসানউদ্দিন সরকারকে। আওয়ামী লীগের জাহাঙ্গীর আলমকে মোকাবেলা করতে হবে হাসানের।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ  হোসেন ও নজরুল ইসলাম খান।
গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ইসির জন্য অগ্নিপরীক্ষা বলে আখ্যায়িত করে খন্দকার মোশাররফ  হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আমরা কমিশনের কাছে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বলেছি। জাতীয় নির্বাচনের আগে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হবে কিনা তার ইঙ্গিত বহন করে। এই দুই সিটির নির্বাচন কমিশনের জন্য জনগণের আস্থা অর্জনেরও বিষয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
খন্দকার মোশাররফ আরও বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে সবাই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় আছে। সবাই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন চায়।’
এ প্রসঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা রাখতে চাই। এজন্য আমরা কমিশনকে অনেক প্রস্তাব দিয়েছি। নির্বাচন কমিশন এই দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে করতে পারলে তাদের প্রতি আস্থা সুদৃঢ় হবে। এতে জাতীয় নির্বাচনের একটি বাধা দূর হবে।
সেনা মোতায়েনের দাবি করে খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, অতীতে আমরা দেখেছি, শঙ্কা ও ভয়ভীতির কারণে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগে ভোটারদের অনীহা থাকে। নির্বাচনে সেনাবাহিনী থাকলে তাদের সাহস বাড়বে এবং ভোট দিতে আসবেন।
তিনি বলেন, কমিশন তাদের কাছে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ও ডিভিএম পরীক্ষামূলক ব্যবহারের কথা আমাদের জানিয়েছিল। তবে আমরা এর বিরোধিতা করেছি। বলেছি, ইভিএম ও ডিভিএম নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। এজন্য আমরা পরীক্ষামূলকভাবেও এটি ব্যবহারে একমত নই।
বিএনপি প্রতিনিধি দল গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত সমন্বয় কমিটি গঠনের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং এটি বাতিলের দাবি তোলেন। এছাড়া বিএনপির প্রতিনিধি দল তাদের দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে জাতীয় নির্বাচনের অংশগ্রহণের কথা বলেন।
এ বিষয়ে খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, মুক্ত খালেদা জিয়াকে ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে না। আমরা কমিশনকে এ বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন এখন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে নির্বাচনি এলাকার বাইরেও প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কোনও মন্ত্রী যদি নৌকা প্রতীকের পক্ষে ভোট চায় তা এই নির্বাচনের ওপরই প্রভাব পড়বে। এবং এটি নির্বাচন আচরণবিধিও লঙ্ঘন। তাই আমরা ইসিকে বলেছি, এই নির্বাচন চলাকালে  দেশের কোথাও যেন এভাবে দলের পক্ষে ভোট চাওয়া না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ