ঢাকা, বুধবার 18 April 2018, ৫ বৈশাখ ১৪২৫, ১ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এলএনজি’র মূল্য বেশি হওয়ায় ভয়াবহ সঙ্কটে পড়বে গ্যাসনির্ভর হাজার হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান

কামাল উদ্দিন সুমন : সঙ্কট নিরসনে চলতি মাসের শেষ দিকে শুরু হচ্ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ। আমদানি ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধানের কারণে গভীর সঙ্কটে পড়বে গ্যাসনির্ভর হাজার হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান। কারণ সরকার যে দামে এলএনজি বিক্রি করবে তা বহুগুন খরচ বেশী পড়বে শিল্পমালিকদের। এতে করে গ্যাস সঙ্কট থাকা সত্ত্বেও অনেক শিল্প মালিক এলএনজি ব্যবহার করতে পারবে না। আবার অনেকে বাধ্য হয়ে বেশি দামে এলএনজি কিনে শিল্প কারখানা চালু রাখলেও ভয়াবহ লোকসান টানতে হবে। যদিও ইতোমধ্যে গ্যাসের দাম বাড়ানোর জন্য বিইআরসিতে প্রস্তাব দিয়েছে কয়েকটি গ্যাস কোম্পানি।
পরিসংখ্যান বলছে, এলএনজি খাতে বছর শেষে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে। আবার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি মাসে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা লোকসান করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বছরে যার পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এলএনজি সরবরাহ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে জ্বালানি খাতে বছর শেষে ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা।
শুরু থেকেই এলএনজির অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। গত বছরের নবেম্বরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকে এলএনজির অর্থায়নে অনুরোধ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। পরবর্তী সময়ে পেট্রোবাংলাও কমিশনের কাছে এ বিষয়ে আবেদন করে। আবেদনে ৬ হাজার ৯২২ কোটি টাকা প্রয়োজনের কথা জানানো হয়। রিভলভিং ফান্ড হিসেবে এ অর্থসংস্থানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কমিশনের কাছে আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি। এলএনজি আমদানির জন্য এ অর্থের অনুমোদন পাওয়া গেলেও কম দামে বিক্রির কারণে যে ঘাটতি হবে, কীভাবে তার সংস্থান হবে, সে নিশ্চয়তা এখনো পায়নি পেট্রোবাংলা।
আমদানি করা এলএনজি দেশে উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে মিশ্রণের মাধ্যমে বিক্রি করবে বিতরণ কোম্পানিগুলো। এর পরও বর্তমান দামের চেয়ে বেশি দামে তা বিক্রি করতে হবে। এলএনজিকে রিগ্যাসিফিকেশন করে উৎপাদিত গ্যাস ও দেশে উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের মিশ্রণের মূল্য নির্ধারণের লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ২৫ অক্টোবর একটি কমিটি গঠন করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে সম্পূরক শুল্ক (এসডি) ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ছাড়া প্রতি ঘনমিটার দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪ টাকা ৩০ পয়সা। এসডি ও ভ্যাটসহ এ ব্যয় দাঁড়ায় ৯ টাকা ৫৫ পয়সা। তবে ভর্তুকি দেয়ার পর গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের বিক্রয়মূল্য ৬ টাকা ২২ পয়সা। এলএনজি যোগ হলে ঘনমিটারপ্রতি গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় দাঁড়াবে ১৪ টাকা ৬৪ পয়সা। প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী, গ্যাস বিক্রি বাবদ এক বছরে ঘাটতি দাঁড়াবে ৬৮ কোটি ডলার বা ৫ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা।
 পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়জুল্লাহ এনডিসি সাংবাদিকদের বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকে অর্থসংস্থান করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও এগিয়ে চলেছে। শিগগিরই এলএনজি সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হবে।
আমদানি ও সরবরাহ মূল্যের ব্যবধানের কারণে যে ঘাটতি তৈরি হবে, সে অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। সরকারই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
২৫ এপ্রিল টার্মিনাল চালু এবং আগামী ১৫ মে থেকে এলএনজি থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে সরবরাহ করা হবে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি। এ গ্যাস ব্যবহার হবে চট্টগ্রামে। চলতি বছরের অক্টোবরে কমিশনিং হবে দ্বিতীয় পর্যায়ে আমদানি করা আরো ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি। এ গ্যাস সরবরাহ করা হবে মধ্যাঞ্চলে। এভাবে ধাপে ধাপে আমদানিকৃত এলএনজি সারা দেশে সরবরাহের প্রস্ততি নেয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এলএনজির এলসিতে প্রয়োজন হবে ৩ কোটি ডলার ও ল্যাটেন্ট হিট ক্যাপচার সিস্টেমের (এলএইচসিএস) জন্য ১ কোটি ৪২ লাখ ডলার। এছাড়া এলএনজি আমদানি ও পরিচালনার জন্য রিভলভিং ফান্ড হিসেবে এসবিএলসিসহ প্রয়োজন হবে আরো ৮০ কোটি ডলার। আমদানি করা এলএনজি গ্রাহক পর্যায়ে কম দামে সরবরাহে প্রয়োজন হবে আরো প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা, যার সংস্থানের নিশ্চয়তা এখনো পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের মহেশখালীতে ৫০ কোটি ঘনফুট ধারণক্ষমতার দুটি ভাসমান টার্মিনাল বা ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপন করা হচ্ছে। এর একটি স্থাপন করবে এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেড (ইইবিএল), অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানি (প্রাইভেট)। টার্মিনাল থেকে এলএনজি দেশের অভ্যন্তরে আনতে এবং গ্রাহক পর্যন্ত পৌঁছে দিতে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে ছয়টি প্রকল্প।
ইইবিএলের টার্মিনাল থেকে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৭৫ এমটিপিএ (মেট্রিক টন পার এনাম) এলএনজি আমদানি করে রিগ্যাসিফিকেশনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। আর সামিটের টার্মিনাল থেকে চলতি বছর শেষে ৩ দশমিক ৭৫ এমটিপিএ এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ আগামী বছর নাগাদ এ দুটি টার্মিনাল থেকে সাড়ে ৭ এমটিপিএ এলএনজি আমদানি করে তা রিগ্যাসিফিকেশনের লক্ষ্য রয়েছে।
এদিকে গত বছরের শেষ দিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিও খাতটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ২০১৪ সালের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করে। পরের প্রায় দুই বছর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩০-৫০ ডলারের মধ্যে ছিল। তবে এটি এখন বেড়ে ৬৫ ডলার ছাড়িয়েছে। এজন্য মাসে ১৬০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বিপিসির। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ৮০০ কোটি টাকার বেশি লোকসানের কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ যুক্তিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে তারা।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে দেয়া প্রস্তাবে প্রতি লিটার কেরোসিনে ১১, ডিজেলে ৭ ও ফার্নেস অয়েলে ১৩ টাকা বাড়াতে বলেছে বিপিসি। দাম বাড়ানো না হলে বছর শেষে এ মূল্য সমন্বয়ে প্রয়োজন হবে বাড়তি প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।
বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স অ্যান্ড প্ল্যাানিং) সৈয়দ মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় লোকসানে রয়েছে বিপিসি। এটি কাটিয়ে উঠতে তেলের দাম বাড়ানো প্রয়োজন অথবা বাড়তি মূল্য সমন্বয়ে ভর্তুকি দিতে হবে। বিষয়টি এরই মধ্যে আমরা সরকারকে জানিয়েছি। এখন সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।
এদিকে চট্টগ্রামে শিল্পোদ্যোক্তারা আমদানি করা তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নিয়ে ধীরগতিতে এগুচ্ছেন। বর্তমানে ব্যবহার করা গ্যাসের মূল্য থেকে এলএনজির মূল্য কয়েক গুণ বেশি হবে চিন্তায় এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছেন তারা।
শিল্পের ২৬৫টি সংযোগের সরকারি অনুমোদন পাওয়া গেলেও মাত্র ৭১ জন আবেদনকারী চাহিদাপত্রের টাকা জমা দিয়েছেন। চাহিদাপত্রের টাকা শোধে শিল্পোদ্যোক্তারা সময় চেয়েছেন বলে কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানির শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানান।
আগামী ২৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে স্থাপিত এলএনজি টার্মিনাল উদ্বোধন করবেন। ১৫ই মে থেকে চট্টগ্রামে এলএনজি সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা।
কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানি সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে শিল্পের গ্যাস সংযোগের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। প্রতি একাধিক শিল্পের নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির আবেদন জমা পড়ছে। কিন্তু সংযোগ গ্রহণে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে শিল্পের ২৬৫টি সংযোগ অনুমোদন পাওয়া গেছে। আরো ৩৫৬টি শিল্পের আবেদন অনুমোদনের জন্য উচ্চপর্যায়ে গঠিত কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া আরো নতুন করে প্রায় ১০০ আবেদন জমা পড়েছে।
কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মো. আল মামুন বলেন, এলএনজির ব্যবহার নিয়ে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। শিল্পের জন্য প্রচুর আবেদন জমা পড়েছে। কিন্তু চাহিদাপত্রের টাকা পরিশোধে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। অনেক আবেদনকারী সময় নিচ্ছে। সূত্র জানায়, শিল্পে এলএনজির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি হাজার ঘনমিটারে ১৪ টাকা ৯০ পয়সা।
কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানির বর্তমানে গ্যাস বিপণনে মূল্য হারে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ খাতে প্রতি ঘনমিটারে ৩ টাকা ১৬ পয়সা, ক্যাপটিভ পাওয়ার ৯ টাকা ৬২ পয়সা, সার ২ টাকা ৭১ পয়সা, শিল্প ৭ টাকা ৭৮ টাকা, চা-বাগান ৭ টাকা ৪২ পয়সা, বাণিজ্যিক ১৭ টাকা ৪ পয়সা, সিএনজি ৪০ টাকা।
চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, এলএনজির মূল্য বেশি হওয়ায় নতুন বিনিয়োগে বিরূপ প্রভাব পড়বে। নির্ধারিত মূল্য পুনর্বিবেচনার জন্য আমাদের প্রস্তাব রয়েছে। গ্যাসের উৎসস্থল যেখানেই হোক না কেন সমগ্র দেশে সমহারে ট্যারিফ নির্ধারণ করতে হবে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহ-সভাপতি মাহাবুব চৌধুরী বলেন, এলএনজির মূল্য বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। তবে দাবি করেছি দেশের সব জায়গায় শিল্পে ব্যবহার করা গ্যাসের একই মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। মূল্য নিয়ে বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত হলে মেনে নেব না।
বিজিএমইএ’র সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি নাছিরউদ্দিন চৌধুরী বলেন, উচ্চহারে মূল্যের কারণে গ্যাসনির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। শিল্পের প্রসার বাধার মুখে পড়বে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ