ঢাকা, বুধবার 18 April 2018, ৫ বৈশাখ ১৪২৫, ১ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে সুন্দরবনের পরিবেশ

খুলনা অফিস : তৃতীয় দিনেও শুরু হয়নি মংলা বন্দরের হাড়বাড়িয়ায় ডুবে যাওয়া কয়লাবোঝাই কার্গো জাহাজের উদ্ধার কাজ। মালিকপক্ষ সাত দিনের মধ্যে জাহাজটি উদ্ধারের ঘোষণা দিলেও কোনো কাজ ছাড়াই ইতোমধ্যে দুই দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। এদিকে, বন্দর কর্তৃপক্ষের বেঁধে দেয়া ১৫ দিনের মধ্যে কার্গো জাহাজটি আদৌ উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না, এ নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। কারণ এর আগে বন্দর চ্যানেলে যেসব নৌযান ডুবির ঘটনা ঘটেছিল তাতে সময় লেগেছিল কোনোটির মাসের অধিক আবার কোনোটির কয়েক মাস। অপরদিকে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের আশপাশের নদীগুলোতে বারবার জাহাজ বা কার্গোডুবির ঘটনা পরিবেশের জন্য অশনি সংকেত। এর ফলে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়াসহ মারাত্মক বিপর্যায়ের মুখে পড়তে পারে সুন্দরবনের পরিবেশ।
কার্গো জাহাজের ড্রাইভার মো. আমির হোসেন বলেন, ‘ডুবন্ত কার্গো জাহাজের ফিটনেস ও ধারণ ক্ষমতা সার্টিফিকেট, ইন্স্যুরেন্সের কাগজপত্রসহ উত্তোলনের কাজে ব্যববহৃত নৌযান এবং প্রয়োজনী যন্ত্রপাতি সংগ্রহে বিলম্ব হওয়াতেই মূলত মালিকপক্ষ কাজ শুরু করতে পারছে না।’
সুন্দরবনের অভ্যন্তরে হাড়বাড়িয়ায় কয়লার জাহাজ ডুবিতে বনের জলজ-প্রাণিজ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শাহিন কবির বন বিভাগের বিভাগীয় কার্যালয়ে (বাগেরহাট) প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের কথা থাকলেও সোমবার সময় মতো তা দিতে পারেননি। তবে মঙ্গলবার প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মাহামুদুল হাসান বলেন, ‘মঙ্গলবার সকালেও ডুবন্ত কার্গো জাহাজটি উদ্ধারে কাজ শুরু করতে পারেনি মালিকপক্ষ। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্গোটি উত্তোলনের জন্য মালিকপক্ষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। উদ্ধারের নামে সময়ক্ষেপণ করা হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের আশপাশের নদীগুলোতে বারবার জাহাজ বা কার্গোডুবির ঘটনা পরিবেশের জন্য অশনি সংকেত। এর ফলে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়াসহ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে সুন্দরবনের পরিবেশ।
সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘কয়লার জাহাজ ডুবিতে সুন্দরবনের জলজ প্রাণীদের অস্তিত্বসহ জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হবে। কারণ এ কয়লা সাধারণত ইট ভাটাগুলোতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এসব কয়লায় সালফারের পরিমাণ বেশি থাকায় তা পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে।’ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনও জাহাজ ডুবলে ওই জাহাজের ভেতরে থাকা তেল বা মবিলও পানির সঙ্গে মিশে যায়, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের আশপাশের নদীগুলোতে কয়লা বা তেলবাহী জাহাজডুবির ঘটনা ঘটছে নিয়মিতই। রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে এমন কয়লাবাহী জাহাজের যাতায়াত আরও বাড়বে। ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়বে। সুন্দরবনের সুরক্ষায় তাই এখনই সরকারকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে।
ড. ফরিদ বলেন, ইউনেস্কো তাদের গত বাৎসরিক সভায় বড় ধরনের কোনও প্রকল্প নেয়ার আগে সরকারকে একটি কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা করার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু সরকার এখনও তা করেনি। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও সার্বিকভাবে সুন্দরবনের সুরক্ষায় এটা যত দ্রুতসম্ভব করা উচিত।
কয়লার কারণে পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিলিপ কুমার বলেন, কয়লায় সালফার থাকে। সেই সালফার পানিতে মিশলে পানির পিএইচ মাত্রা কমে যেতে পারে। এ ধরনের ঘটনা বেশি বেশি ঘটতে থাকলে বড় ধরনের ক্ষতিই হবে। গত কয়েকবছর ধরে তো এমন দুর্ঘটনা বারবারই ঘটছে। ফলে এ বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া দরকার। বিকল্প রাস্তা দিয়ে কয়লা পরিবহনের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন এই অধ্যাপক।
সুন্দরবন রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান দিলিপ কুমার দত্ত বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের কিছু করার নেই। কিন্তু মানব সৃষ্ট দুর্যোগ ঠেকাতে হবে। মানব সৃষ্ট বিপদ সুন্দরবনের পিছু ছাড়ছে না।’
তিনি বলেন, ‘শর্ত সাপেক্ষে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়েছে। তারা সে শর্ত মানছে না। ফিটনেসবিহীন জাহাজ অহরহ চলছে। এ নিয়ে উৎকণ্ঠা রয়েছে। এরই মধ্যে রোববার আবারও সুন্দরবনের কাছে হারবারিয়া এলাকায় কয়লাবাহী কার্গো জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটলো।’
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘কয়লার ক্ষতি প্রাথমিকভাবে চোখে ধরা পড়ছে না। তবে কয়লার সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন প্রভৃতি সুন্দরবনের পানি, জীব ও পরিবেশকে দূষিত করবে। যার ফলে নদীতে মাছের বংশ বিস্তারে সমস্যা হবে। দূষিত পানি ব্যবহার করে স্থানীয়দের নানা ধরনের রোগ হতে পারে।’
অতিরিক্ত বোঝাইর কারণেই ডুবেছে কয়লাসহ কার্গো: সুন্দরবনের অভ্যন্তরের নদী দিয়ে অতিরিক্ত কয়লাবোঝাই ও বহনের কারণে লাইটার কার্গো এমভি বিলাস ডুবির ঘটনা ঘটেছে। মংলা থানায় দায়ের করা একটি সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি) এ তথ্য উল্লেখ করেছেন সুন্দরবনের চাঁদপাই স্টেশন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম। গত রোববার রাতে জিডিটি করা হয়।
ডুবে যাওয়া কার্গোএছাড়া রোববার দুপুরে কয়লার মালিক পক্ষে চট্রগ্রামের সাহারা এন্টারপ্রাইজের অপারেশন ম্যানেজার লালন হাওলাদার মংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। জিডিতে তিনি দাবি করেছেন, দুর্ঘটনায় কোম্পানির এক কোটি ১৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে ডুবে যাওয়া লাইটার কার্গোর মাস্টার ফরিদ মিয়া দুর্ঘটনার কারণ উল্লেখ করে মংলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
কার্গো উদ্ধারে আসছে দুই উদ্ধারকারী জাহাজ, পানির নমুনা সংগ্রহ : মংলা বন্দর চ্যানেলের পশুর নদীর হারবাড়িয়া এলাকায় ডুবে যাওয়া ৭৭৫ মেট্রিক টন কয়লাবোঝাই লাইটার জাহাজ উদ্ধারের জন্য দু’টি উদ্ধারকারী জাহাজ ঘটনাস্থলে আনা হচ্ছে। এই জাহাজ দুটি কাজ শুরু করলে আগামী ৭-৮ দিনের মধ্যে কার্গোটি টেনে তোলা সম্ভব হবে।
মংলা বন্দরের হারবার মাস্টার কমান্ডার ওলিউল্লাহ বলেন, ‘কার্গো জাহাজটির মালিকপক্ষ দু’টি উদ্ধারকারী জাহাজ ঘটনাস্থলে পাঠাচ্ছেন। তারা প্রথমে ডুবে যাওয়া কার্গো থেকে কয়লা তুলে এরপর কার্গো জাহাজটি উত্তোলন করবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘রোববার দুপুরে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ পশুর নদীতে ডুবে যাওয়া স্থানে ডুবুরি নামিয়ে জাহাজটিতে ‘মার্কিং বয়া’ স্থাপন করেছে। এখন এই মার্কিং বয়ার কারণে মংলা বন্দরে আসা দেশি-বিদেশি জাহাজগুলো দুর্ঘটনাস্থল এড়িয়ে চলাচল করতে পারছে। মংলা বন্দর চ্যানেলে কয়লাবোঝাই লাইটার ডুবির পর বন্দরের কার্যক্রম ও চ্যানেলে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।’
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মাহমুদ হাসান জানান, ডুবে যাওয়া কার্গো জাহাজটি এখন জোয়ারের পানির নিচে রয়েছে। এর কোনও অংশই দেখা যাচ্ছে না। তিনি ও তদন্ত কমিটির প্রধান চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শাহিন কবির ঘটনাস্থলে এসে সার্বিক দিক পর্যবেক্ষণ করছেন। পরিবেশ অধিদফতরের একটি টিম ঘটনাস্থলে এসে নমুনা সংগ্রহ করেছে। যত দ্রুত সম্ভব ডুবে যাওয়া কার্গোটি তুলে ফেলার জন্য সংশ্লিষ্টদের বন বিভাগের পক্ষ থেকে চাপ অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে রওনা দিয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন বলে জানান।
ঘটনাস্থল থেকে মুঠোফোনে বাগেরহাট পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক ইমদাদুল হক জানান, ঘটনাস্থলে ভাটার সময় পনির গভীরতা ছিল ১২ ফুট। সেখান থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এটি খুলনা ল্যাবে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিস্তারিত জানা যাবে।
কয়লার মালিক পক্ষ চট্টগ্রামের সাহারা এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার ( অপারেশন) লালন হাওলাদারের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘ডুবে যাওয়া কার্গো থেকে কয়লা বাইরে বের হওয়ার কোনও আশঙ্কা নেই।
সুন্দরবনের হারবাড়িয়া এলাকার ৬ নম্বর অ্যাংকোরেজে থাকা লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি অবজারভার’ ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা নিয়ে মংলা বন্দরে আসে। জাহাজটি থেকে রোববার (১৫ এপিল) ভোরে কয়লা নেয়া হয় ঢাকার ইস্টার্ন ক্যারিয়ার নেভিগেশনের মো. সোহেল আহম্মদের ‘এমভি বিলাস’ কার্গো জাহাজে। খুলনার দুলাল এন্টারপ্রাইজের জন্য ইটভাটা ও সিরামিক কারখানাগুলোর জন্য আমদানি করা কয়লা নিয়ে তা রাজধানীর উদ্দেশে রওনা দেয়। কিছু দূর এগোলেই ডুবোচরে ধাক্কা লেগে তলা ফেটে এটি ডুবে যায়। এ সময় কার্গোতে থাকা সাত কর্মচারী সাঁতরে তীরে উঠে আসেন।
সুন্দরবনের আশপাশের নদীগুলোতে কয়লা বা তেলবাহী কার্গো জাহাজডুবির ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগে, ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীতে ডুবে যায় তেলবাহী ট্যাংকার এমভি ওটি সাউদার্ন স্টার সেভেন। ২০১৫ সালের ৩ মে সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদীতে ডুবে যায় সার বোঝাই কার্গো জাহাজ এমবি জাবালে নূর। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের শরণখোলার রেঞ্জের ভোলা নদীতে ডুবতে ডুবতে অন্য কার্গোর সহায়তায় মংলায় পৌঁছাতে সক্ষম হয় আরেকটি কয়লা বোঝাই কার্গো। ২০১৫ সালের ২৫ অক্টোবরেই সুন্দরবনের পশুর নদীতে ৫১০ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে ডুবে যায় এমভি জিয়া রাজ। পরের বছরের ১৯ মার্চ বিকালে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীর ‘হরিণটানা’ বন টহল ফাঁড়ির কাছে ১,২৩৫ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে এমভি সি হর্স-১ ডুবে যায়। ২০১৭ সালের ৪ জুন দিবাগত রাতে হারবাড়িয়া চ্যানেলে ৮২৫ টন সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল স্লাগসহ এমভি সেবা নামে আরেকটি কার্গো জাহাজ তলা ফেটে ডুবে যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ