ঢাকা, বুধবার 18 April 2018, ৫ বৈশাখ ১৪২৫, ১ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হাত হারানো কলেজ ছাত্রের মৃত্যু

মাত্র ক’দিন আগে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত দুই বাসের চাপায় হাত হারানো কলেজ ছাত্র রাজীব হোসেন শেষ পর্যন্ত জীবনও হারিয়েছেন। সোমবার দিবাগত রাতে তার মৃত্যু হয়েছে (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দৈনিক সংগ্রামসহ গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানা গেছে, ৩ এপ্রিল বিআরটিসির একটি দ্বিতল বাসের পেছন দিকের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে মহাখালী তিতুমীর কলেজের উদ্দেশে যাওয়ার সময় অন্য একটি বাস রং সাইড তথা বামদিক দিয়ে ওভারটেক করতে গেলে  রাজীবের হাত থেতলে গিয়েছিল।
স্বল্প সময়ের মধ্যে নিকটবর্তী একটি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলেও একদিকে তার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া হাতটিকে জোড়া লাগানো সম্ভব হয়নি, অন্যদিকে দেহ থেকে প্রচুর রক্ত ঝরে গিয়েছিল বলে তাকে সুস্থ করে তোলাও অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। রাজীবকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করাসহ সরকারও চেষ্টা যথেষ্টই করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে তাকে দেখতে ও চিকিৎসার খোঁজ-খবর করতে হাসপাতালে গেছেন। কিন্তু রাজীবের জ্ঞান ফেরানো যায়নি। মস্তিষ্কে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে তাকে বরং ১০ এপ্রিল লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও চিকিৎসকরা সফল হতে পারেননি। সফলতার কোনো সম্ভাবনাও আর ছিল না। শেষ পর্যন্ত পরিবার সদস্যদের অনুমতি নিয়ে সোমবার দিবাগত রাতে লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলেছেন চিকিৎসকরা। অর্থাৎ মৃত্যু ঘটেছে কলেজ ছাত্র রাজীবের।
রাজীব হোসেনের এই মর্মান্তিক পরিণতি সারাদেশেই তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। আইন লংঘন করে দুটি বাসের ভয়ংকর প্রতিযোগিতার অসহায় শিকার হয়ে হাত হারানোর পর থেকেই রাজীবের বিষয়টি দেশের সকল পর্যায়ে আলোড়ন তুলেছিল। জনমতের চাপে পুলিশ দুই বাস চালককেই গ্রেফতার করেছে। ওদিকে হাই কোর্টের মাননীয় বিচারপতিরা এক রায়ে রাজীবের সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় বহন করার জন্য বাস মালিকদের আদেশ দিয়েছিলেন। আহত ছাত্র রাজীবকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে কেন এক কোটি টাকা দেয়ার আদেশ দেয়া হবে নাÑ তার কারণ জানতে চেয়েও রুল জারি করেছিলেন মাননীয় বিচারপতিরা। কিন্তু সে সব বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন ওই কলেজ ছাত্র।
আমরা রাজীব হোসেনের হাত এবং জীবন হারানোর ঘটনাকে অত্যন্ত মর্মান্তিক মনে করি। খবরে জানা গেছে, মহাখালি সরকারি তিতুমীর কলেজের ¯œাতকের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজিব ছিলেন পিতৃমাতৃইীন। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় নিজের ছোট দুই ভাইয়ের দায়িত্বও তাকেই পালন করতে হতো। এজন্য লেখাপড়ার পাশাপাশি ছাত্র পড়িয়ে এবং আত্মীয়দের সাহায্যে অনেক কষ্টে মেসে বাস করে জীবন কাটাচ্ছিলেন তিনি। অমন একজনের জীবনকেই ধ্বংস করে দিয়েছে দু’জন বেপরোয়া এবং নিষ্ঠুর বাসচালক।
আমরা অতীতেও বিভিন্ন উপলক্ষে বলেছি, এ ধরনের দুর্ঘটনার জন্য দায়ী আসলে বাস চালকরা। যাত্রী পাওয়ার উদ্দেশ্যে পাল্লাপাল্লি করতে ও প্রতিযোগিতা চালাতে গিয়ে তারা ট্রাফিক আইনকে তো তোয়াক্কা করেই না, মানুষের জীবনের ব্যাপারেও তাদের কোনো মায়া বা দায়দায়িত্ব থাকে না। এজন্যই যখন-তখন এবং যেখানে-সেখানে দুর্ঘটনা ঘটছে। মানুষ মারা যাচ্ছে এবং অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। কলেজ ছাত্র রাজীবের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এবং মর্মান্তিক মৃত্যুর পেছনেও রয়েছে প্রতিযোগিতার তথা পাল্লা দেয়ার একই কারণ। বেসরকারি কোম্পানির বাসটি যে রং সাইড দিয়ে ওভারটেক করেছে এর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল ঘটনাস্থলেই।
বিষয়টিকে হাল্কাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। কারণ, দেশে গাড়ির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। সুতরাং দুর্ঘটনা কমানোর জন্য বেশি জোর দিতে হবে যানবাহন ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে। এর শুরু হতে হবে বিআরটিএ থেকে, যেখানে ঘুষের বিনিময়ে ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল করার অনুমতি এবং গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে দেখতে হবে চালকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি। গাড়ি শুধু চালাতে পারলে চলবে না, অতিরিক্ত গতিতে চালানো, ওভারটেকিং করা, পেছনের গাড়িকে সাইড না দেয়া, ট্রাফিক সিগনাল না মানা, চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা এবং ধারণক্ষমতার চাইতে বেশি যাত্রী ও মালামাল ওঠানোর মতো বিভিন্ন কারণ রয়েছে, যেগুলোর জন্য দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এসব বিষয়ে চালকদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে এবং যথেষ্ট সময় নিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, ঘুষের বিনিময়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে চালকরা। বড়কথা, এ ধরনের চালকদের কারণেই ঘটছে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা।
আমরা মনে করি, এমন অবস্থা কোনোক্রমেই চলতে পারে না। সরকারের উচিত প্রতিটি বিষয়ে কঠোর নজরদারি করা। আমরা বিশেষ করে রাজীবের মৃত্যুর জন্য দায়ী দুই চালকের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তির জন্য দাবি জানাই। ছোট দুই ভাইসহ তার পরিবারকেও যথেষ্ট পরিমাণে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, ভাইয়ের অভাবে তারা যাতে বিপন্ন হয়ে না পড়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ