ঢাকা, বুধবার 18 April 2018, ৫ বৈশাখ ১৪২৫, ১ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সড়ক দুর্ঘটনা কি অপ্রতিরোধ্য?

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম (রফিক তালুকদার) : বর্তমান বাংলাদেশে যে সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করছে সেটি হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে সাথে বাড়ছে মৃত্যু হার, বাড়ছে পঙ্গুত্বের সংখ্যা। এমন কোন দিন নেই, যে সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে না। শিশু, ছোট বড় সকলেই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। পত্রিকার পাতা খুললেই, টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলেই চোখে পড়বে দেশের কোথাওনা কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রায় এমন দিন যায় দিনে বেশ কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক যেন নয়, মুত্যু খুপ, প্রতিটি যানবাহন যেন সর্বোচ্চ গতিতে ধেয়ে আসা মৃত্যুদূত। চোখের পলকে ঘটে যাবে দুর্ঘটনা ও মুত্যু। যার কারণে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। এ মিছিলে শামিল হচ্ছে সব শ্রেণী পেশা, বয়স ও লিঙ্গের মানুষ। এ দুর্ঘটনায় হারাতে হচ্ছে কাছের আপনজনদের। মা, বোন, বাবা, ভাই, সন্তান, স্ত্রী এভাবে নিকটজন অস্বাভাবিক মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। অকালে অস্বাভাবিক মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হচ্ছে অনককেই। স্বজন হারানোর আর্তনাদে ভারি হচ্ছে বাতাস। পঙ্গুত্বের অভিশাপতো আরো ভয়াবহ। হয়ে উঠে দুর্বিষহ জীবনযাপন। পরিবারে নেমে আসে আর্থিক কষ্টও। প্রতিটি জীবনই মূল্যবান। তবে এসব সড়ক দুর্ঘটনায় এমন কিছু মানুষ আমরা হারিয়ে ফেলছি যারা এ সমাজের জন্য বড় প্রয়োজন। যাদের শূন্যতা কোনদিন পূরণ হবার নয়। এ পর্যন্ত আমরা কত শত জ্ঞানী গুণী প্রতিভাবন হারিয়েছি তার কোন ইয়াত্তা নেই।
যে কোন অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে আমাদের দেশে বেশ সমালোচনার ঝড় উঠে। কিছু কিছু অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে পুরো দেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠে। আন্দোলন, সংগ্রাম, প্রতিবাদসহ থাকে নানা কর্মসূচি। তবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই মৃত্যু ঘটনা ঘটলেইও তেমন একটা সোচ্চার, আন্দোলন দেখা যায় না। কিছু বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটার পর সারাদেশে হৈ চৈ মাতামাতি শুরু হলেও অল্প সময়ে নীরব হয়ে যায়।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ, প্রতিকার, নিয়ে গভেষণা এ পর্যন্ত অনেক হয়েছে। সরকারী বেসরকারী তদন্ত প্রতিবেদন, গবেষণা প্রতিবেদন, সুপারিশ লিপিবদ্ধও হয়েছে অনেক। কিন্তু চিত্র একই। এ দুর্গতি অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না। কথায় আছে যে লাউ সে কদু।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে প্রতিবছরের জন্য আলাদা লক্ষ্য ঠিক করে কর্মসূচি নিতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের পরিকল্পনা সম্পর্কে তার জানা নেই।
জাতিসংঘে বাংলাদেশসহ সদস্য দেশগুলো অঙ্গীকার করেছিল ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার। কিন্তু বাংলাদেশে উল্টো দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে জাতিসংঘের যে লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ সই করেছে। বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব সড়ক পরিবহন, স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকারসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের। এসব মন্ত্রণালয় কোন বছর কত সড়ক দুর্ঘটনা কমানো হবে, এর কোনো কর্মপরিকল্পনা হয়নি। কিছু সড়কের বাঁক সোজা করা এবং মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ছাড়া সরকারের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। যার ফলে সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না বরঞ্চ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন সংস্থার তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেবে ২০১৬ সালে সারা দেশে দুই হাজার ৩১৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ১৪৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দিনে গড়ে ২৪ জন মারা গেছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হন পাঁচ হাজার ২২৫ জন।
২০১৫ সালে সারা দেশে ৬ হাজার ৫৮১টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৮ হাজার ৬৪২ জন। আহত হন ২১ হাজার ৮৫৫ জন।
২০১৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছিল ৫ হাজার ৯২৮টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৮ হাজার ৫৮৯ জন। আর আহত হয়েছিলেন ১৭ হাজার ৫২৪ জন।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৬ সালে ২ হাজার ৫৬৬টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৪৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে ২ হাজার ১৩৪ জন। ২০০৯ সালের হিসাবে ৩ হাজার ৩৮১টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৫৮ জন নিহত ও ২ হাজার ৬৮৬ জন আহত হয়।
সরকারি হিসাব মতে, ১৯৯৯ সালে ৪ হাজার ৯১৬ জন, ২০০০ সালে ৪ হাজার ৩৫৭ জন, ২০০১ সালে ৪ হাজার ৯১জন, ২০০২ সালে ৪ হাজার ৯১৮জন, ২০০৩ সালে ৪ হাজার ৭৪৯ জন, ২০০৪ সালে ৩ হাজার ৮২৮ জন, ২০০৫ সালে ৩ হাজার ৯৫৪ জন, ২০০৬ সালে ৩ হাজার ৭৯৪ জন, ২০০৭ সালে ৪ হাজার ৮৬৯ জন, ২০০৮ সালে ৪ হাজার ৪২৬ জন, ২০০৯ সালে ৪ হাজার ২৯৭জন, ২০১০ সালে ৫ হাজার ৮০৩ জন, ২০১১ সালে ৩ হাজার ৬৮৮ জন, ২০১২ সালে ৫ হাজার ৯১১ জন, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ৮৬৫ জন, ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৯৫৭ জন, ২০১৫ সালে ৩ হাজার ৮৬২ জন, ২০১৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দু হাজারেরও বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে।
নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির জরিপে বলা হয়, চলতি বছরে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল সারা দেশে মোট ১হাজার ৩শ’ ৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২১ নারী-শিশুসহ কমপক্ষে ১৫৫২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৩৮৩২ জন। বিভিন্ন সড়ক, মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে এসব দুর্ঘটনা ঘটে।
মে মাসে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। তাদের মধ্যে ৫২ জন নারী ও ৫৮ জন শিশু রয়েছে। ১ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বিভিন্ন সড়ক, মহাসড়ক, জাতীয় সড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে এসব প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে। এপ্রিল মাসে সংঘটিত ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় আহত হন ১ হাজার ১৬ জন। সে হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মে মাসে দৈনিক ১৩ জন নিহত ও ৩৩ জন আহত হয়েছেন। এপ্রিল মাসে প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটেছে ১১টি। হিসেবে বলছে, সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের হার এপ্রিল মাসের তুলনায় মে মাসে বেড়েছে।
২০১৬ সালের একই সময় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে ১২৩৬টি। এতে ৩৮৩ নারী-শিশুসহ ১৩১৪ জন নিহত ও ৩৩৯৩ জন আহত হন। এই হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনার হার গত বছরের তুলনায় এ বছর ১১ শতাংশ বেড়েছে। আর নিহত ও আহতের হার বেড়েছে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৮২ শতাংশ ও ১২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ২২টি বাংলা ও ইংরেজি জাতীয় দৈনিক, ১০টি আঞ্চলিক সংবাদপত্র এবং আটটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সংবাদ সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে।
বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পায় ঈদের ছুটির দিনগুলোতে, এবার ঈদুল ফিতরে ১৯ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক, রেল ও নৌ পথে সম্মিলিতভাবে ২৪০টি দুর্ঘটনায় ৩১১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৮৬২ জন। ঈদে ২০৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৮৪৮ জন। গত বছরের চেয়ে এবার সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বেড়ে গেছে। গত বছর একই সময়ে ১২১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮৬ জন নিহত হয়েছিলেন, আহত হয়েছিলেন ৭৪৬ জন। সেই হিসাবে এবার সড়কে গতবারের চেয়ে ৮৮ জন বেশি মারা গেছেন। আহতের সংখ্যা বেশি ১০২ জন। এবারের ঈদযাত্রা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে স্বস্তিদায়ক ছিল বলে সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের দাবির মধ্যে সম্প্রতি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন তৈরিতে দেশের ২২টি জাতীয় এবং ৬টি আঞ্চলিক দৈনিক, ১০ অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের সহায়তা নেয়া হয়েছে বলে উল্লোখ করেন।
এক গবেষণায় দেখা যায় নানা কারণে দেশে প্রতি ১০ হাজার মোটরযানে ১০০টির বেশে দুর্ঘটনা ঘটছে। উন্নত দেশের পরিসংখ্যননুযায়ী এক হাজার মোটরযানে দুর্ঘটনা ঘটে সর্বোচ্চ তিন দশমিক পাঁচভাগ। অন্যদিকে আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এক হাজার যানবাহনে ১৬৩ জন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসোর্স ইনস্টিটিউট (এআরআই) পরিচালনা গভেষনায় দেখা গেছে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর বার হাজারের বেশি মানুষ নিহত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় বার হাজার মানুষের। বিশ্ব পুলিশের হিসাবে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান গড়ে ৬ জন। স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়। প্রতিটি দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতিও বিপুল। এক হিসাবমতে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা।
উপরে উল্লেখিত তথ্যগুলোর ভিত্তিতে বুঝা যায় আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা কতটুকু। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ১৯৯৭ সাল থেকে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় তিন বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা করে আসছে। এর মধ্যে সাতটি পরিকল্পনা হয়েছে। সর্বশেষ পরিকল্পনায় ২০২৪ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বেসরকারী বিভিন্ন সংস্থার সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে এর কোন প্রতিফলন দেখা যায়নি। একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। মৃত্যু সংখ্যা আরো বাড়ছে। এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বিস্তর। সরকারিভাবে নতুন নতুন সুপারিশ তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না। প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে কোনভাবে যেন রোধ করা যাচ্ছেনা। সড়কে গেলেই সংশয়ে থাকতে হয় ঘরে আর ফিরে যাওয়া যাবে কি। কোন না কোন স্থানে প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে। সড়ক দুঘটনায় আর কত প্রাণ ঝড়বে? আর কত মৃত্যুও স্বাদ গ্রহণ করতে এ অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়। নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠা এ সড়ক দুর্ঘটনা দায় বা কার? এ প্রশ্নের উত্তরও যেন আজ নেই।
সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার করানগুলোর মধ্যে অন্যতম কারণ বেপোয়ারা গতিতে গাড়ি চালনো। চালকেরা বেপোয়ারা গতিতে একের পর এক পাল্লা দিয়ে যানবাহন চলানোর কারণেই দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। চালকদের বেপরোয়া গতির প্রতিযোগিতায় সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। কোন যানবাহন কোনটাকে পেছনে ফেলে আগে যাবে এ নিয়ে রাত দুপুরেও চলে প্রতিযোগিতা। শুধু গাড়িতে থাকা যাত্রীরাই নন, যানবাহনগুলোর এই প্রতিযোগিতার কাছে অসহায় সড়কপথে চলাচলকারী ছোট যানবাহন ও পথচারীরাও। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সড়কে চলা দূরপাল্লার বাসের চালকরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একে অন্যের সঙ্গে গতির প্রতিযোগিতা করছেন। আবার এসব প্রতিযোগীতার দৃশ্য আপলোড করা হচ্ছে ইউটিউব, ফেইসবুকে। রাতদুপুরে চলে তাদের প্রতিযোগিতার খেয়ালিপনা, শুধু গাড়িতে থাকা যাত্রীরা নয় যানবাহনগুলোর এ প্রতিযোগিতার কাছে অসহায় সড়কপথে চলাচলকারী ছোট যানবাহন ও পথচারীরা। এই গতির কারণে বেড়ে যাচ্ছে দুর্ঘটনার গতি। আর লাশ বৃদ্ধির গতি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণা করে বলছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্য কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ ১০ শতাংশ। এই তথ্য দুর্ঘটনার কারণ-সংক্রান্ত পুলিশের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এআরআই এই চিত্র পেয়েছে।
১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার বিশ্লেষণ রয়েছে এআরআইয়ের। প্রতিষ্ঠানটি নিজেও বড় দুর্ঘটনাগুলো তদন্ত করে থাকে। তাদের গবেষণা বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ৪৩ শতাংশই ঘটছে জাতীয় মহাসড়কগুলোতে। মহাসড়কে গড়ে প্রতি মিনিট পরপর একটি গাড়ি আরেকটি গাড়িকে ওভারটেকিংয়ের চেষ্টা করে। একটি গাড়ি আরেকটি গাড়িকে পাশকাটতে গেলেই ঝুঁকির তৈরি হয়।
সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে চালকদের বেপোয়ারা মনোভাব ও গাড়ির বেপোয়ারা গতি অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। প্রয়োজনে মহাসড়কে বিশেষ ক্যামরা বসিয়ে গাড়ির বেপোয়ারা গতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
পুরানো লক্কর ঝক্কর গাড়ি ও অদক্ষ চালক সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। গত ৪ মার্চ ২০১৭ এ ঢাকার সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ওপর ইউরোপীয় অর্থনৈতিক কমিশন, ইউএনইসিই, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রতি হাজার মানুষের বিপরীতে যান্ত্রিক যানের সংখ্যা মাত্র দু’টি। অথচ সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ যানবাহনের মধ্যে ফিটনেসবিহীন যানবাহন রয়েছে ৩ লাখের বেশি। আর যেসব যানবাহনের ফিটনেস আছে, সেগুলোও যথাযথভাবে নেয়া হয় না। কারণ, ৪০ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটি যানবাহনের সনদ দেয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ খালি চোখে একটু দেখেই ফিটনেস দিয়ে দেয়। স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিটনেস সনদ দেয়ার যন্ত্র বিকল হয়ে আছে এক যুগ ধরে।
দেশে চালকের লাইসেন্স আছে সাড়ে ১৫ লাখ। এরও একটা বড় অংশ দেয়া হয়েছে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া, শ্রমিক ইউনিয়নের দেয়া তালিকা ধরে। অর্থাৎ প্রায় আট লাখ যানবাহনের কোনো চালক নেই। অথচ বাণিজ্যিক যানবাহনের প্রতিটির জন্য দু’জন চালক দরকার হয়।
এসব পুরানো লক্কর ঝক্কর যানবাহন যাতে সড়কে চলতে না পারে এবং কোন অদক্ষ চালক যাতে লাইসেন্স না পায় ও গাড়ি চালাতে না পারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
চালকদের ট্রাফিক আইনের না মানা ও না বুঝা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইলে কথা বলা, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, বিশ্রামহীন দীর্ঘযাত্রা, চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ি চালানো, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, মহাসড়কে স্বল্পগতি ও দ্রুতগতির যান একই সঙ্গে চলাচলের প্রতিযোগিতা ইত্যাদি কারণও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য খানা-খন্দকে পূর্ণ সংস্কারহীন সড়ক, বাঁক, ফুটপাত দখলও অত্যন্ত সরু সড়ক, যেখানে সেখানে স্পীড ব্রেকার ইত্যাদি কারণও রয়েছে।
মালিক, চালক, তদারকির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেউ সড়কে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর দায় এড়াতে পারেনা। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দায়িত্বশীলতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনা কবলিত কোন যানবাহনের চালককে আটক করা হলে বেশিরভাগ সময় তাদের শাস্তি হয় না। প্রায় দুর্ঘটনা টাকার বিনিয়ে মীমাংস করে দিচ্ছে থানা পুলিশ বা সংশ্লিষ্টজনরা। চালকদের এ মনোভাব সৃষ্টি করতে হবে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু এটা হত্যা, এটা অপরাধ, অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হবে। কিছুদিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদ, ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজনের প্রাণহানীর মামলায় আদালত ঘাতক চালককে শাস্তি প্রদান করলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারী (২০১৭) ও ১মার্চ (২০১৭) সারাদেশে পরিবহন ধর্মঘট হয়েছে। এ ধর্মঘটের কারণে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। পরিবহন মালিক, শ্রমিকদের জিম্মি হয়ে পড়ে সারা দেশের মানুষ। এ মনোভাব থেকে মালিক শ্রমিকদের বেরিযে আসতে হবে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।
যাত্রীদের অসতর্কতাও সড়ক দুঘটনার কারণ যেমন, পারাপারে খেয়াল না করা, রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা, গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য চালকদের দ্রুত গাড়ি চালানোর তাড়া দেয়া, চালকরা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলে বিনোদন হিসেবে নেয়া, দুর্ঘটনা সংঘটিত হলে আইনের কাছে না গিয়ে সমঝোতা করা, গাড়ি ভাংচুর ও চালকদের মারধর করা ইত্যাদি। আমাদের নাগরিক সচেতনতা অবশ্যই বৃদ্ধি করতে হবে।
গাড়ি চালকদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে। আমরা অনেকে এ পেশাকে নিচু পেশা হিসেবে মনে করি। অশিক্ষিতদের একটি পেশা মনে করি। যার দরুন চালকরাও নিজেদেরও ছোট মনে করেন। সড়ক দুর্ঘটনার মতো অপরাধ সংঘটিত হলেও তারা নিজেদেরকে দায়ী মনে করেন না। তাই তাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে এবং শিক্ষিতদের এ পেশায় আসতে হবে।
আইন না মানাই হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। আইন মানতে সকলকে বাধ্য করতে হবে। আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি ও অবহেলা রোধ করতে হবে। এককথায় নিয়মনীতি ও দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনা রোধ ও শৃংঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে উপরোক্ত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিলেই দুর্ঘটনা অনেকাংশ কমে যাবে বলে মনে করি।
লেখক : সাংবাদিক ও গীতিকার, বাংলাদেশ টেলিভিশন। নাজিরহাট পৌরসভা, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম। Rafiq965@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ