ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 April 2018, ৬ বৈশাখ ১৪২৫, ২ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে আমের বিপুল উৎপাদন সম্ভাবনা

রাজশাহী : বরেন্দ্র অঞ্চলে থোকায় থোকায় আমের সমারোহ -সংগ্রাম

বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী : এবার দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে আমের বিপুল উৎপাদন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। প্রায় প্রতিটি বাগানে ও গাছের থোকায় থোকায় আমের সমারোহ।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁসহ বরেন্দ্র অঞ্চলে চলতি মওসুমে আমের বাগানগুলোতে প্রচুর পরিমাণে মুকুল ধরে। সেই মুকুল থেকে ইতোমধ্যে গুটির সমারোহ দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে কোথাও কোথাও কালবোশেখি ঝড় ও শিলা বৃষ্টি হয়েছে। এতে আমের কিছু ক্ষতি হলেও যে পরিমাণ আম ধরেছে সে তুলনায় ক্ষতির পরিমাণ সামান্য। তবে আম চাষিরা ধারণা করছেন, শেষ অবধি এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আমের বাম্পার ফলন হওয়ার আশা করা যাচ্ছে। এর ফলে আম বাগান মালিক, কৃষক,বাগান পরিচর্যাকারি শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও আম প্রিয় মানুষের মনে যেন আনন্দ দোলা দিচ্ছে। এসময়ে গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত এই অঞ্চলের চাষীরা। আম বাগানের মালিক ও আম চাষিরা ধারণা করছেন, এবার আবহাওয়া অনেকটাই অনুকূলে রয়েছে। রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, এ অঞ্চলে প্রতিবছর প্রায় আড়াইশ’ জাতের আম উৎপন্ন হয়। এগুলোর মধ্যে এ বছর ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ক্ষিরসাপাতি, বোম্বাই, হিমসাগর, ফজলি, আম্রপালি, আশ্বিনা, বৃন্দাবনী, লক্ষ্মণভোগ, কালীভোগ, তোতাপরী, দুধসর, লখনা ও মোহনভোগ জাতের আমের চাষ বেশি হয়েছে। রাজশাহীর ৯টি উপজেলায়ই আম চাষ হয়। তবে সবচেয়ে বেশি হয় বাগমারা, পুঠিয়া, দুর্গাপুর, বাঘা, চারঘাট ও গোদাগাড়ীতে। ফলন ও লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা আম চাষের দিকে ঝুঁকছেন। অনেক চাষী অন্য ফসলের সঙ্গেও আমের আবাদ করছেন। এর ফলে আমের আবাদ বাড়ছে। এদিকে ইতোমধ্যে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারে উঠেছে ভারতীয় আম।
কৃষিবিদরা জানিয়েছেন, উপর্যুপরি যদি শিলা বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড় না হয় তাহলে আম উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাবে। এবার জেলায় আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৬ হাজার ৮০০ হেক্টর জমি। আর এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ১০ লাখ মেট্রিক টন। তবে চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আম উৎপাদন হবে বলে মনে করছেন চাষী ও কৃষি কর্মকর্তারা। বর্তমান সময়ে গাছে যে পরিমাণে আম আছে তাতে একটি গাছে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। এতো আম গাছে থাকালে আকারে ছোট হবে। এছাড়াও আমের ভার গাছ সহ্য করতে পারবে না। একজন কৃষিবিদ জানান, আম বড় হতে হতে এক অথবা দুইটি কালবৈশাখী ঝড় হলেও আমের বিশেষ ক্ষতি হবে না। ঝড়ে যে পরিমাণে আম ঝরবে তা একদিক দিয়ে চাষীদের জন্য লাভের কারণ হবে। দুই একটি ঝড়ে যে পরিমাণে আম ঝরবে তাতে গাছে আম পাতলা হবে ও ফলনও বাড়বে। তবে অতিরিক্ত ঝড় আমের জন্য ক্ষতির কারণ হবে পারে।
ক্যালেন্ডার প্রকাশ : আমের জন্য খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে গাছ থেকে আম সংগ্রহের সময়সূচি প্রকাশ করা হয়েছে। বিষমুক্ত আম উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে জেলাব্যাপী আম ক্যালেন্ডার প্রণয়ন বিষয়ক সভায় এ সময় সূচি প্রকাশ হয়েছে। জেলায় এ বছর প্রণয়ন করা আম ক্যালেন্ডারে সকল প্রকার গুটিআম ২০ মে, গোপালভোগ ২৫ মে, হিমসাগর ও ক্ষিরসাপাতা ২৮ মে, লক্ষ্মণভোগ ১ জুন, ল্যাংড়া ও বোম্বায় ৫ জুন, ফজলী ও সুরমা ফজলী ১৫ জুন, আ¤্রপালি ১৫ জুন ও আশ্বিনা ১ জুলাই বাজারজাত করণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ বছর দেরিতে আমের মুকুল আসায় আম ক্যালেন্ডারে সংশোধন করা হতে পারে বলেও জানা গেছে। রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের একজন কর্মকর্তা জানান, কয়েক বছর আগেও আমের ‘অফ ইয়ার’ বা ‘অন ইয়ার’ ফলন হতো। এক বছর ভালো ফলন হলে পরের বছর আর হতো না। বর্তমানে কৃষি অধিদপ্তরের সহযোগিতা ও কৃষকদের সঠিক পরিচর্যার কারণে ‘অফ ইয়ার’ বা ‘অন ইয়ার’ বলে কোনো শব্দ বর্তমানে আর নেই। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে প্রায় প্রতি বছরেই ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আম চাষ করলে এর উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি সঠিকভাবে সংরক্ষণ, পরিবহন, রপ্তানিসহ বাজারজাতকরণ করলে আয়ও বাড়বে। পাশাপাশি মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক প্রয়োগ রোধ করা গেলে আমের স্বাদসহ গুণগতমানও বাড়বে।
বাগানের পরিমাণ বৃদ্ধি : গত পাঁচ বছরে এ অঞ্চলে আমবাগান বেড়েছে ১৬ হাজার ৫০৭ হেক্টর। সব চেয়ে বেশি আমবাগান বেড়েছে রাজশাহীতে ৭ হাজার ৯৭৫ হেক্টর। এরপর নওগাঁয় ৪ হাজার ৮৬৯ হেক্টর, নাটোরে ২ হাজার ৪৭৩ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক হাজার ১৯০ হেক্টর। শুধু চাষই নয় কয়েক বছরে উৎপাদনও বেড়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৮৫১ মেট্রিকটন। দেশের গ-ি ছাড়িয়ে এসব আম চলে যাচ্ছে ইউরোপের বাজারে। রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি দফতরের হিসেবে, ২০১১-১২ অর্থ বছরে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আমবাগান ছিল ৪২ হাজার ৪১৭ হেক্টর। এর প্রায় অর্ধেক ২৩ হাজার ২৮০ হেক্টর ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জেই। বাকি ৮ হাজার ৯৮৬ হেক্টর রাজশাহীতে, ৭ হাজার ৮০১ হেক্টর নওগাঁয় এবং ২ হাজার ৩৫০ হেক্টর নাটোরে। সেবছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন আম। এছাড়া রাজশাহীতে এক লাখ ১০ হাজার ৪৮৮ মেট্রিক টন, নওগাঁয় ৭৭ হাজার ৩৮৫ মেট্রিক টন এবং নাটোরে ২৮ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। ৬ হাজার ১৯৩ হেক্টর বেড়ে পরের বছর এ চার জেলায় আমবাগান দাঁড়ায় ৪৮ হাজার ৬১০ হেক্টর। ২ লাখ ১৭ হাজার ৯৭ মেট্রিক টন বেড়ে উৎপাদন হয়েছে ৬ লাখ এক হাজার ১৩৪ মেট্রিক টন। ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরে ৫২ হাজার ৪০৫ হেক্টর বাগান থেকে আম উৎপাদন হয় ৬ লাখ ৩১ হাজার ৫১৪ মেট্রিক টন।
বিদেশে রফতানি : এ বছরও আম বিদেশে রফতানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এরই অংশ হিসেবে বাগান থেকেই শুরু হচ্ছে এ প্রস্তুতি। গত বছর রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা থেকে ২৩ হাজার ৪০০ কেজি আম রফতানি হয় ইউরোপে। এগুলো ফ্রুটব্যাগ পদ্ধতিতে রাসায়নিক ছাড়াই উৎপাদন করা হয়েছিল। বাঘার কালিগ্রামের আমচাষি ও ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম জানান, গতবছর তিনি ২৩ হাজার ৪০০ কেজি আম রফতানি করেছেন ইংল্যান্ড, ইতালি, জার্মানি ও সুইডেনে। এ থেকে তিনি আয় করেছেন ১৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। গত বছর ফ্রুটব্যাগে উৎপাদন হয়েছিল ১০ হাজার আম। এর বাইরের পুরোটাই সহনীয় মাত্রায় কেমিকেলে ফলানো। ছিল জৈববালাই ব্যবস্থাপনাও। উৎপাদন থেকে রফতানি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সহায়তা দিয়েছে বিশ্ব খাদ্য সংস্থাসহ সরকারের বিভিন্ন দফতর। এ বছর তার রফতানি টার্গেট রয়েছে ২০০ মেট্রিকটন। আর এজন্য তিনি বেছে নিয়েছেন নিজেরই দেড়শ’ বিঘা বাগান। আরো ১০ জন চাষির সঙ্গে চুক্তি করেছেন। সব মিলিয়ে আমবাগান দাঁড়িয়েছে ৫০০ বিঘা মত। রফতানির পাশাপাশি দেশের বাজারেও তা সরবরাহ হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ