ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 April 2018, ৬ বৈশাখ ১৪২৫, ২ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিকলাঙ্গ ব্যাংকিং খাত

এ আর কোনো নতুন খবর নয় যে, সরকারের ভুল ও সুচিন্তিত ক্ষতিকর নীতি এবং দলীয় বিবেচনার কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত ভয়াবহ বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতির এতটাই অবনতি ঘটেছে যে, সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা বহুদিন ধরেই আশংকা প্রকাশ করে চলেছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে নীতিতে সংশোধন করার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক ব্যবস্থা না নেয়া হলে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় ব্যাংকিং খাতই শুধু ধ্বংস হয়ে যাবে না, জাতীয় অর্থনীতিও ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রাসঙ্গিক উদাহরণ দেয়ার জন্য বিভিন্ন সময়ে অনেক তথ্যেরই উল্লেখ করেছেন তথ্যাভিজ্ঞরা। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে সংশোধনমূলক কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সরকার বরং এমন কিছু সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের ব্যাপারেই বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে, যেসবের পরিণতিতে ব্যাংকিং খাতের সর্বনাশই ত্বরান্বিত হবে। হয়েছেও।
অন্তরালে আরো বিশেষ কোনো কারণ থাকতেই পারে কিন্তু নতুন একটি নেতিবাচক খবর হিসেবে গত মঙ্গলবার গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান আরাস্তু খান। গত বছর, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটানোর সময় সরকারের এই সাবেক সচিবকে চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত করা হয়েছিল। মঙ্গলবার তার সঙ্গে পদত্যাগ করেছেন সরকারের আরেক সাবেক সচিব সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামও। দ্বিতীয়জনকে সরকার ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান পদে নিযুক্তি দিয়েছিল। দু’ জনের পদত্যাগপত্রই গ্রহণ করেছে ব্যাংকটির পরিচালনা পরিষদ। উল্লেখ্য, তাদেরও আগে ইসলামী ব্যাংকের পাঁচজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে পদত্যাগের আড়ালে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ঘটনাপ্রবাহে আবির্ভাব ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাজমুল হাসানের। তাকেই ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্তি দেয়া হয়েছে। সবই ঘটেছে গত মঙ্গলবার।
দেশের সবচেয়ে সফল ও লাভজনক ইসলামী ব্যাংককেন্দ্রিক ঘটনাগুলো যেদিন সারাদেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছিল, সেদিন- মঙ্গলবারই বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সামষ্টিক অর্থনীতি বিষয়ে তার মূল্যায়নে বলেছে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণ ‘এতিম ও বিকলাঙ্গ’ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যাংকিং খাতের রক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে উল্লেখ করে সিপিডি বলেছে, এই ব্যাংকই ‘এতিম ও বিকলাঙ্গ শিশুর’ ওপর নানাভাবে অত্যাচার করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবকিছু জানা সত্ত্বেও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের বছর বলে এ বছর আরো অনেক টাকাই পাচার হয়ে যেতে পারে বলে অশংকা প্রকাশ করেছে সিপিডি।
বিষয়টিকে দেশের অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত হিসেবে উল্লেখ করে সিপিডি বলেছে, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি ঘটবে। তাছাড়া সামগ্রিকভাবে মানুষের আয় অনেক কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ দেশে প্রকৃত আয়হীন কর্মসংস্থান হচ্ছে। এমন অবস্থার পরিণতি অশুভ ও ধ্বংসাত্মক না হয়ে পারে না। অযাচিত ও ক্ষতিকর হস্তক্ষেপ না করা এবং মূলত গ্রাহকের সঞ্চয়ের অর্থে গড়ে ওঠা মূলধন অন্য ব্যাংকগুলোকে না দেয়ার জন্যও সিপিডি পরামর্শ দিয়েছে। সিপিডি বলেছে, জনগণের করের টাকা থেকে ব্যাংকগুলোকে ভর্তুকি দেয়ার চলমান কর্মকান্ডও বন্ধ করা দরকার। না হলে সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতেরই সর্বনাশ ঘটবে। সেই সাথে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হবে জাতীয় অর্থনীতিও।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ব্যাংকিং খাত সম্পর্কিত কোনো বিষয়েই সিপিডি বাড়িয়ে বলেনি। সংস্থাটি বরং অনেক বিষয়কে পাশ কাটিয়ে গেছে। যেমন সরকারকে দোষারোপ করলেও সিপিডি বলেনি, বাস্তবে ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয়ে ও সহযোগিতায় ঋণখেলাপিসহ অসৎ ব্যবসায়ীরা নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলে অনেকাংশে সফল হয়েছেন। এর ফলেই একদিকে ইসলামী ব্যাংকসহ ইসলামী ধারার দুটি বড় ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদে পরিবর্তন ঘটেছে, অন্যদিকে আতংকিত হয়ে পড়েছেন সাধারণ আমানতকারীরা। তারা এমনকি ব্যাংকগুলো থেকে তাদের সঞ্চয়ের অর্থ উঠিয়ে নিতেও শুরু করেছেন। অথচ ইসলামী ধারার এ দুটি ব্যাংক বহু বছর ধরে দেশের জনগণের মধ্যে সঞ্চয়ের ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি করেছিল। সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতির বিকাশেও ব্যাংক দুটির ছিল বিপুল অবদান। অন্যদিকে মূলত ইসলাম বিরোধী উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে সুচিন্তিত আক্রমণের শিকার হওয়ার পর দুটি ব্যাংকই মুখ থুবড়ে পড়েছে।
ইসলামী ধারার প্রধান দুটি ব্যাংককে বিপন্ন করার পাশাপাশি সরকারের অন্য কিছু অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্তের পরিণতিতেও দেশের ব্যাংকিং খাতে বিপর্যয় ঘটেছে। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রাধান্যে এসেছে নতুন কয়েকটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও সরকার একের পর বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান ভ’মিকা রেখেছে রাজনৈতিক বিবেচনা। কিন্তু দেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের পরিসর অত্যন্ত সীমিত হওয়ার কারণে এসব ব্যাংক মোটেও সাফল্যের মুখ দেখতে পারেনি। কোনো কোনো ব্যাংক বরং প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই লোকসান গোনার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণও হয়ে উঠেছে।
ব্যাংকারসহ অর্থনীতিবদরা সঠিকভাবেই বলেছেন, গলদ ছিল আসলে এসব ব্যাংককে অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্তের মধ্যে। কারণ, অত্যন্ত সীমিত অর্থনীতির বাংলাদেশে এত বেশি সংখ্যক ব্যাংকের লাভজনক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল না, এখনো নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও শুধু ২০১২ সালেই সরকার নয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছিল। এর ফলে দেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা পৌঁছেছিল ৫৭টিতে। এ ছাড়া রয়েছে ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত, দুটি বিশেষায়িত এবং নয়টি বিদেশি ব্যাংক। এসবের বাইরেও তৎপরতা চালাচ্ছে আরো বেশ কয়েকটি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান। অথচ বাংলাদেশের মতো ক্ষুদে অর্থনীতির একটি দেশে এত বেশি সংখ্যক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাভজনক হওয়া এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সরকার একের পর এক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়েছে। এসব ব্যাংককে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখ থেকে রক্ষার জন্যই সরকার জনগণের করের টাকার পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকের মতো লাভজনক প্রতিষ্ঠানের মূলধনে হাত দিতে শুরু করেছে।
আমরা মনে করি, বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সত্যি উদ্দেশ্য হলে সরকারের উচিত বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেয়া এবং বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকসহ ইসলামী ধারার দুটি প্রধান ব্যাংকের ব্যাপারে নীতি-কৌশল ও কর্মকান্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো। না হলে এবং ঋণ ও বাণিজ্যের নামে লুণ্ঠনের বাধাহীন কারবারকে চলতে দেয়া হলে একদিকে কোনো ব্যাংকের পক্ষেই বিপর্যয় কাটানো এবং লাভজনক হয়ে ওঠা সম্ভব হবে না, অন্যদিকে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে দেশের ব্যাংকিং খাত। আমরা তাই সরকারের প্রতি দ্রুত উদ্যোগী হয়ে ওঠার এবং ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ