ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 April 2018, ৬ বৈশাখ ১৪২৫, ২ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ওরা এখন মানব সমাজের নেতা!

পৃথিবীর বড় বড় দেশের নেতাদের সম্পর্কে সেইসব দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মন্তব্য শুনলে অবাক হতে হয়। এ কোন্ সভ্যতায় আমাদের বসবাস! প্রসঙ্গত এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করা যায়। দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) সাবেক প্রধান জেমস কোমি তার নতুন একটি বইয়ে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একজন মাফিয়া বসের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন যিনি পরম আনুগত্যের কাঙাল। গোটা বিশ্ব তার বিরুদ্ধে চলে গেলেও তিনি সব বিষয়ে একের পর এক মিথ্যা বলে গেছেন। দাঙ্গাকারী নেতার মতো হোয়াইট হাউস চালান ট্রাম্প।
কোন চায়ের আড্ডায় নয়, ছাপার অক্ষরে মুদ্রিত কোন গ্রন্থে যখন বলা হয়- দাঙ্গাকারী নেতার মতো হোয়াইট হাউস চালান ট্রাম্প, তখন উপলব্ধি করা যায় মার্কিন নেতৃত্ব এবং প্রশাসন কোথায় এসে পৌঁছেছে। ‘আ হায়ার লয়্যালটি : ট্রুথ, লাইস এন্ড লিডারশিপ’ নামক বইটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে মঙ্গলবার (১৭ এপ্রিল)। কিন্তু গত বৃহস্পতিবারই বইটির অংশবিশেষ মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে একটি ভিডিওর অস্তিত্ব নিয়ে ট্রাম্পের উদ্বিগ্ন হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ভিডিওচিত্রে ট্রাম্পের ভাড়া করা রুশ গনিকাদের মস্কোর একটি হোটেলরুমে বিছানার ওপর মূত্রত্যাগ করতে দেখা যায়। উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালের মে মাসে কোমিকে এফবিআই’র প্রধান পদ থেকে বরখাস্ত করেন ট্রাম্প। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর খবরে বলা হয়েছে, কোমি বইটিতে লিখেছেন,মার্কিন প্রেসিডেন্ট‘ একটি বিকল্প বাস্তবতার’ মধ্যে বসবাস করছেন। তিনি চাইছেন সবাই যেন তাকে তোয়াজ করে চলে।
ট্রাম্পের অধীনে এফবিআই’র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গেও বক্তব্য রেখেছেন কোমি। তিনি বইটিতে লিখেছেন, ‘এটা ছিল সম্পত্তির নীরব বৃত্ত। সবকিছু ছিল নেতার নিয়ন্ত্রণে। আনুগত্যই ছিল সব। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে গোটা বিশ্ব। সব বিষয়ে মিথ্যা, হোক সেটা ছোট বা বড়। দায়িত্বের ক্ষেত্রে আনুগত্যের কারণে প্রতিষ্ঠানটি নৈতিকতাও সত্যের ওপর চলে গিয়েছে।’ তিনি আরও লিখিছেন, ‘কোন্টা ঠিক কোন্্টা বেঠিক তা বোঝার মতো বুদ্ধি ট্রাম্পের নেই। এটা তার সহজাত সমস্যা।’ বইটির বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, কোমি লিখেছেন, ‘এই প্রেসিডেন্ট অনৈতিক। তিনি সত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ থেকে  বিচ্যুত। তার নেতৃত্ব লেনদেনের অহংবোধে চালিত ও ব্যক্তিগত আনুগত্যের।’ এফবিআই’র মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধানের এমন মন্তব্যের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্পর্কে দশবার ভাবতে হয়। তবে এই ভাবনাটা বিশ্বের অন্যান্য দেশের নাগরিকদের চাইতে মার্কিন নাগরিকদের বেশি হওয়ার কথা। তাই তাদের ভাবনা ও আচরণ এখন অন্যদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আর এক বড় দেশ ভারত। কিন্তু দেশটিতে যে মাত্রায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়, তা দেশটির জন্য কতটা কল্যাণকর? ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিবেকবান কোন মানুষ দাঙ্গা করতে পারে না, মানুষ মারতে পারে না। আর মানুষের সাজানো গোছানো সংসারটা যারা আগুনে ভস্মীভূত করে দেয় তারা কোন্্ ধরনের প্রাণী? আমরা তাদেরকে মানুষ বলি কোন্্ বিবেচনায়? ধর্মের মুখোশ পরেই তো দাঙ্গা চালানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন ধর্ম কি মানুষকে দাঙ্গা করতে বলেছে? তাহলে যারা দাঙ্গা করে থাকে তারা কোন্ ধর্মের অনুসারী। তাদের ধর্মগুরুর নাম কী?
আমরা জানি এসব প্রশ্নের জবাব দাঙ্গাবাজদের কাছে নেই। তারপরও দাঙ্গাবাজরা মানুষের সমাজে টিকে আছে কেমন করে? সাধারণ মানুষ দাঙ্গা না চাইলেও স্বার্থান্ধ বিশেষ গ্রুপের লোকেরা এখনো দাঙ্গা চালিয়ে যাচ্ছে কেমন করে? ক্ষমতাবান কিংবা ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয় ছাড়াতো অন্ধকারের এইসব প্রাণীদের দৌরাত্ম্য চলতে পারে না। তাইতো বলা হয়, সরষের ভেতরেই অনাকাক্সিক্ষত ভূতের অবস্থান।
রাম নবমী পালনকে কেন্দ্র করে মার্চ মাসে ভারতে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়েছিল সেগুলোর কিছু বৈশিষ্ট্য একই রকম ছিল বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ফলে মনে করা যায় একটা পরিকল্পনার ভিত্তিতে দাঙ্গাগুলো হয়েছে। বিবিসি’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মার্চের শেষ সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যে ১০টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেছিল। আর এমন ৯টি বিষয় রয়েছে যা প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রেই মোটামুটিভাবে এক। কোথাও তা দাঙ্গায় রূপ নিয়েছিল, কোথাও ভাংচুর-অগ্নিসংযোগের মধ্যেই শেষ হয়েছে। ১০টি আলাদা শহরে কোন পরিকল্পনা ছাড়াই ওই হিংসাত্মক ঘটনাগুলো ঘটেনি। প্রতিটি জায়গাতেই রাম নবমীর দিন উগ্র মিছিল বের করা হয়েছিল। বাইকে চেপে যুবকরা ওইসব মিছিলে যোগ দিয়েছিল। তাদের মাথায় গেরুয়া পট্টি বাঁধা ছিলো। সাথে ছিলো  গেরুয়া ঝাণ্ডা। যেসব এলাকায় রাম নবমীর শোভাযাত্রা থেকে অশান্তি ছড়িয়েছে সেগুলোর আয়োজন করেছিল একই ভাবধারার সংগঠন। তারা ভারতীয় জনতা পার্টি, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ এবং বজরং দলের সাথে কোন না কোনভাবে যুক্ত। মুসলমানপ্রধান এলাকা দিয়ে রাম নবমীর শোভাযাত্রা নিয়ে যাওয়ার জন্য জিদ ধরা হয়েছিল। শোভা যাত্রায় মুসলমানদের ‘পাকিস্তানি’ বলা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রশাসন এক রকম নির্বাক দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। মসজিদের দিকে চপ্পল ছোঁড়া হয়েছে। কবরস্থানে গেরুয়া ঝা-া পুঁতে দেয়া হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানো হয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, আর হিন্দু যুবকদের মধ্যে লক্ষ্য করা গেছে জয়ের আনন্দ। ফলে উপলব্ধি করা যায় যে, মুসলিমবিরোধী ওইসব দাঙ্গা ছিল পরিকল্পিত।
ভারতের প্রখ্যাত গণমাধ্যম এনডিটিভি জানায়, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা ড. মনমোহন সিং বলেছেন, ভারতের সংখ্যালঘু ও দলিতদের উপর অত্যাচারের ঘটনা বাড়ছে। ১১ এপ্রিল পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দেয়ার সময় তিনি ওই মন্তব্য করেন।
রাম নবমী পালনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলো ড. মনমোহন সিং-এর মন্তব্যকে সঠিক বলে প্রমাণ করে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, দাঙ্গার মাধ্যমে ওরা কী অর্জন করতে চায়? এতে দেশ ও জনগণের কোন কল্যাণ হবে কী?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ