ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 April 2018, ৬ বৈশাখ ১৪২৫, ২ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাকযুদ্ধে পাকিস্তান-ভারতের ক্রিকেটাররা

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ভূ-রাজনৈতিক কারণে এমনিতেই পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যুতে দুই দেশই চরম হার্ডলাইনে এখন। এই অবস্থায় দেশ দুটির মধ্যে ‘ক্রিকেটই’ কেবল সম্পর্ক উন্নয়নে একমাত্র মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছিল। পাকিস্তান আর ভারতের মধ্যকার ম্যাচ মানেই চরম উত্তেজনা। স্টেডিয়াম কানায় কানায় ভরা। সেটি যেখানেই অনুষ্ঠিত হোক না কেন। তবে দীর্ঘদিন সেই ক্রিকেটও হচ্ছেনা। আইসিসি নির্ধারিত ট্রপিগুলোতেই কেবল দেশ দুটিকে দেখা যায়। অন্য কোনো ম্যাচে দেশ দু’টির অংশগ্রহণ একেবারেই অনুপস্থিত।
দীর্ঘদিন হয়নি ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট। আর সে কারণে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিসিআই) কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে আইসিসির কাছে আপীল করেছে পিসিবি। আর বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য এবং সমাধানে আসতে একটি প্যানেল গঠন করেছে আইসিসি। ২০১৪ সালে পিসিবি-বিসিসিআই পরস্পরের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি করেছিল যে ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৬টি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলবে তারা। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, কূটনৈতিক ঝামেলার কারণে কোন সিরিজই হয়নি গত চার বছরে। এ কারণে পিসিবি ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। গত বছর নবেম্বরে আইসিসির কাছে এক আবেদনে বিসিসিআইয়ের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানায় তারা। তারই প্রেক্ষিতে ৩ সদস্যের একটি বিশেষ প্যানেল গঠন করেছে আইসিসি। এ প্যানেল এ বছরের শেষদিকে একটি শুনানির ব্যবস্থা করবে। উল্লেখ্য, ২০১৫ ও ২০১৭ সালে দুটি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলতে অসম্মতি জানায় বিসিসিআই। আইসিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আগামী ১ থেকে ৩ অক্টেবর দুবাইয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। তবে এই প্যানেলের নেয়া সিদ্ধান্তের বিপক্ষে আর কোন আপীল করা যাবেনা।’
দুই দেশের মধ্যকার ক্রিকেট ম্যাচ না হলেও খেলোয়াড়দেও মধ্যে কিন্তু সম্পর্ক ভালইছিল। কিন্তু সম্প্রতি সেই সম্পর্কে যেন ফাটল ধরছে। আইপিএল নিয়ে আফ্রিদিও একটি মন্তব্য নিয়ে তুমুল হৈচৈ চলছে।
টি-২০ বিশ্বকাপের সময় ভারত কেনিজের ‘সেকেন্ড হোম’ বলে পাকিস্তানীদের তোপের মুখে পড়েছিলেন শহীদ আফ্রিদি। সাবেক তারকা অল-রাউন্ডারের কণ্ঠে প্রায়শ প্রতিবেশী দেশের প্রশংসা ঝরত। সেই তিনিই এবার কাশ্মীর ইসুত্যে বিস্ফোরক মন্তব্য করে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। আফ্রিদি টুইটারে লিখেছেন, ‘ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে ভয়াবহ, উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার কণ্ঠস্বর চাপা দিতে দমন মূলক নীতিতে নিরীহদের গুলি করে মারা হচ্ছে। অবাক হয়ে ভাবি কোথায় গেল রাষ্ট্রসংঘ, অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো! কেন এই রক্তপাত থামাতে তারা সচেষ্ট নয়?’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘যদি তারা আমাকে ডাকেও, তবু আইপিএল খেলতে যাব না। আমার এর দরকার নেই। সেটির প্রতি আমি আগ্রহী নই, কখনও ছিলাম না।’এরপরই শুরু হয়ে যায় কথার যুদ্ধ। উল্লেখ্য, এরই মধ্যে শুরু হয়ছে জনপ্রিয় ঘরোয়া টি-২০ ক্রিকেট ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগের (আইপিএল) ১১তম আসর।
পাকিস্তানের সাবেক তারকা অলরাউন্ডারের কড়া সমালোচনা করেন ভারতীয় ক্রিকেটাররা। গৌতম গাম্ভীর, বিরাট কোহলি, কপিল দেব থেকে শুরু করে কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকরও বাদ যাননি। শিখর ধাওয়ান লিখেছেন, ‘আগে নিজের দেশের হাল ধরো। নিজের মতামত নিজের কাছে রাখ। নিজের দেশের জন্য আমরা যা করছি, সেটাই ঠিক। আগে কি করতে হবে, আমরা জানি। তোমাকে এসব ব্যাপারে ভাবতে হবে না।’ শিখর ধাওয়ানের পরপরই এক সংবাদ মাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাতকারে শচীন বলেন, ‘আমাদের দেশের ব্যাপারে কোন বহিরাগতের মন্তব্য করার দরকার নেই। ওখানে (কাশ্মীর) থাকা ভারতীয় প্রতিনিধিরা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা রাখেন।’ এর আগে ব্যাঙ্গালুরুতে আইপিএলে প্র্যাকটিসের সময় ভারতীয় অধিনায়ক বিরাট কোহলি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘একজন ভারতীয় হিসেবে আমি সবসময় দেশের ভাল চাইব। দেশের স্বার্থে পাশে দাঁড়াব। যদি কেউ এর বিরোধিতা করে তবে তাকে সমর্থন করার প্রশ্নই আসে না।’ যে কোন পরিস্থিতিতে দেশের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন থাকবে বলে জানান এই ভারতীয় সফল তারকা। বাঁ হাতি ব্যাটসম্যান সুরেশ রায়না লিখেছেন, ‘কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা ভারতেরই থাকবে। আমাদের পূর্বপুরষেরা এখানেই জন্মেছেন। আমি আশা করব, আফ্রিদি ভাই পাকিস্তান আর্মিকে আমাদের কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ ও যুদ্ধের প্রস্তুতি বন্ধ করতে বলবেন। আমরা শান্তি চাই।’
এদিকে পাকিস্তানের দলপতিও ছেড়ে কথা বলেননি। সত্যি কথা যেমনই হোক, সেটি বলতে সরফরাজ আহমেদের জুড়ি নেই। পাকিস্তান অধিনায়ক এবার সরাসরিই আক্রমণ করলেন বিরাট কোহলি এবং মহেন্দ্র সিং ধোনিকে। ভারতীয়রা গালাগাল করলেও সেটা নিয়ে কিছু হয় না, এমন ক্ষোভ তার। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ক’দিন আগে শেষ হওয়া টেস্ট সিরিজের সময় কোহলি মাঠে বাজে ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, স্ট্যাম্প মাইক্রোফোনেও সেটি ধরা পড়ে। সম্প্রতি পাকিস্তানে এক নিউজ চ্যানেলে সাক্ষাতকা রদিতে গিয়ে এই প্রসঙ্গে ভারতীয়দের একেবারে ধুয়ে দিয়েছেন সরফরাজ।
তিন ভার্সনের পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক বলেন, ‘এটাই ব্যাপার। যখন কোহলি এমন বলে, মানুষ পছন্দ করে। কিন্তু যখন আমরা বলি, মানুষ বলে- দেখুন তারা গালাগাল করছে। জনাব, তারাও প্রচুর গালাগালি করে। এমনকি সাধারণ কথা বলতে গেলেও তারা গালি দেয়। আমরা ধোনিকেও এমন করতে দেখেছি।’ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে ভারতকে উড়িয়ে দিয়ে শিরোপা জিতে পাকিস্তান। ওই ম্যাচে ভারতীয় গালি দেয়ার সুযোগই পায়নি উল্লেখ করে সরফরাজ বলেন, ‘চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে আমরা তাদের এসব ভাবারই সুযোগ দেইনি। ফাখর জামান ১০-১৫ ওভারেই ম্যাচটা তাদের হাত থেকে নিয়ে নেয়।’ সম্প্রতি কাশ্মীর ইস্যুতে অত্যন্ত দৃঢ়চেতা বক্তব্য দিয়ে ভারতীয়দের রোশানলে পড়েছেন শহীদ আফ্রিদি। তবে কাশ্মীরে সাধারণ মানুষের ওপর ভারতীয় সেনাবাহিনী যে বর্বোরচিত আচরণ করছে, সাবেক অধিনায়ক তার এমন অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেননি। সরফরাজ যদিও এ নিয়ে কোন মন্তব্য করেননি।
পাকিস্তন আর ভারতের ক্রিকেটাররা যখন বাকযুদ্ধে লিপ্ত তখন কোচ ব্যস্ত দলগঠন নিয়ে। গত বছর অক্টোবরে অনেকটা চমক জাগিয়ে ওয়ানডে অভিষেক হয়েছিল। চাচা গ্রেট ইনজামাম-উল-হকের (প্রধান নির্বাচক) মান রাখতে অভিষেক ম্যাচেই সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন ইমাম-উল-হক। বাঁহাতি এই ওপেনার এবার জায়গা করে নিলেন আভিজাত্যের টেস্ট দলেও। আসন্ন আয়ারল্যান্ড এবং ইংল্যান্ড সফরকে সামনে রেখে পাকিস্তান যে ১৬ সদস্যের দল ঘোষণা করেছে, তাতে চমক হিসেবে এসেছে ইমাম-উল-হকের নাম। তার মতো টেস্ট আঙ্গিনায় একেবারে নতুন মুখ হিসেবে জায়গা পেয়েছেন ইতোমধ্যে সংক্ষিপ্ত ফরমেটে আলো ছড়ানো ফখর জামান ও দুই নবাগত সাদ আলী আর উসমান সালাহ উদ্দিন। তবে জায়গা হয়নি পেসার ওয়াহাব রিয়াজ আর লেগ স্পিনার ইয়াসির শাহর। ওয়াহাব বাদ পড়েছেন অফফর্মের কারণে, ইয়াসির নিতম্বের ইনজুরিতে ভুগছেন। আয়ার ল্যান্ডের ডাবলিনে একটি টেস্ট খেলবে পাকিস্তান। টেস্টটি শুরু হবে ১১ মে। স্ট্যাটাস পাওয়ার পর আইরিশদের এটি ঐতিহাসিক প্রথম টেস্ট। এরপর ইংল্যান্ড সফর।
এদিকে অবসর নেয়ার পর এবার পাকিস্তান ক্রিকেটকে কিছু দিতে চান দেশটির কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান ইউনিস খান। ক্যারিয়ারে ১১৮ টেস্টে দেশের হয়ে রেকর্ড সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৯৯ রান সংগ্রহকারী খান ২০১৭ সালের মে মাসে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টানেন। তার নেতৃত্বেই ২০০৯ সালে টি-২০ বিশ্বকাপ শিরোপা জয় করে পাকিস্তান। দেশকে কিছু ফিরিয়ে দেয়ার ইচ্ছে সবসময়ই ব্যক্ত করেছেন তিনি। অনেকভাবে দেশকে সাহায্য করার ইচ্ছে থাকলেও তিনি সম্ভবত কোচিং সেবাদিতেই বেশি আগ্রহী। যে কারণে এ সপ্তাহে লাহোরে লেভেল-থ্রি কোচিং কোর্সেস শুরু করতে যাচ্ছেন সাবেক তারকা এ ব্যাটসম্যান। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) আয়োজিত এ কোর্স পরিচালনা করবেন অস্ট্রেলিয়ানরা।
সম্প্রতি শেষ হওয়া পাকিস্তান সুপার লীগের (পিএসএল) তৃতীয় আসরে রানার্স আপ হওয়া পেশোয়ার জালমির মেন্টর ও ব্যাটিং কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ৪০ বছর বয়সী খান। খেলোয়াড়ী জীবনে তার বিশাল অভিজ্ঞতা যে কোন দলের ব্যাটিং কোচ হওয়া তার জন্য সহায়ক হবে। এই প্রজন্মের যে কোন খেলোয়াড়ের কোচ হওয়ার জন্য ক্যারিয়ারে ১১৮ টেস্ট, ২৬৫ ওয়ানডে ও ২৫টি টি-২০ ম্যাচ খেলা ইউনিসের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ