ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 April 2018, ৬ বৈশাখ ১৪২৫, ২ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আইপিএলে আলো ছড়াচ্ছেন মুস্তাফিজুর রহমান

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেকটা ধুমকেতুর মতোই আবির্ভাব মুস্তাফিজুর রহমানের। একটার পর একটা ম্যাচে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। যদিও মাঝে কিছুটা সময় খারাপ কেটেছিল তার। এরপর যেন আবারো ফিরেছেন চেনা ছন্দে। আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল)। সেখানে শুরুটা সানরাইজার্স হায়দরাবাদে। প্রথম মৌসুমেই শিরোপা জয়ের অন্যতম নায়ক দ্য ফিজ। পরের বছর উল্টো ছবি। হায়দরাবাদ এই ‘কাটার মাস্টারকে’ খেলায় মাত্র এক ম্যাচ। দলবদলে এবার নাম লিখিয়েছেন মুম্বাই ইন্ডিয়ানসে। প্রথম ম্যাচে খরুচে হলেও মানিয়ে নিয়েছেন এরপর। দ্বিতীয় ম্যাচে ১৯তম ওভার ১ রানে ২ উইকেট নিয়ে প্রায় জিতিয়েই দিয়েছিলেন মুম্বাইকে। সব মিলিয়ে তিন ম্যাচে ৮৮ রানে ৫ উইকেট মুস্তাফিজের। ডট বল ২৯টি, ইকোনমি রেট ৭.৪৩। এমন পারফরম্যান্সের পর মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের ফেসবুক পেজে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে সন্তুষ্টি ঝরেছে তাঁর কণ্ঠে, ‘আমরা এবারের মিশনটা একটু ভিন্ন ছিল। এ বছর প্রথমবার মুম্বাইয়ে খেলছি। আগের দুই বছর ছিলাম হায়দরাবাদে। ড্রেসিংরুমটা নতুন, আছেন অনেক সিনিয়র খেলোয়াড়। আমার বয়সী অনেকেও আছে দলে। সব মিলিয়ে দলের সমন্বয়টা ভালো। কোচ বা সতীর্থরা সহযোগিতা করছেন সবাই। নতুন কোচের সঙ্গে কাজ করলে অনেক কিছু শেখা যায়, আমিও শেখার চেষ্টা করছি।’ প্রতিপক্ষ কাউকে নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে করতে চান নিজের বোলিংটা। কার্যকরী জুটিও গড়তে চান মুম্বাইয়ের পেসার জাসপ্রিত বুমরাহর সঙ্গে, ‘বুমরাহ ডেথ ওভারে খুব ভালো বল করে। ওর সঙ্গে বল করাটা উপভোগ করছি আমি।’ মুস্তাফিজ উপভোগ করলেও তাঁকে ঠিকভাবে রোহিত শর্মা ব্যবহার করতে পারছেন না বলে অভিযোগ ভারতীয় সাবেক পেসার জহির খানের। স্টার স্পোর্টসের ধারাভাষ্যে জহিরের বিশ্লেষণ ছির অনেকটা এরকম, ‘মুস্তাফিজ দুর্দান্ত একজন বোলার। প্রতি ম্যাচে খুব ভালো শুরু করছে সে। ওর বোলিং দেখে মনে হচ্ছে শুরুর দিকে তছনছ করে দেওয়ার মতো বোলার মুস্তাফিজ। কিন্তু রোহিত ইনিংসের শুরুর দিকে মুস্তাফিজ-বুমরাহকে ব্যবহার না করে রেখে দিচ্ছে ডেথ ওভারের জন্য। শুরুর দিকে ওরা উইকেট নিলে কিন্তু শেষ দিকে এমনিতেই চাপে থাকত ব্যাটসম্যানরা।’ ‘দ্য ফিজ’ পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের নামটি দিয়েছিলেন ডেভিড ওয়ার্নার। অসি ক্রিকেটার তখন ছিলেন সানরাইজার্স হায়দরাবাদের অধিনায়ক ছিলেন।  ২০১৬ সালের আইপিএলে মুস্তাফিজ এমন ভয়ঙ্কর বোলিং করেছেন যে হায়দরাবাদকে অভিষেকেই চ্যাম্পিয়ন করে দিয়েছেন! কী দুর্বোধ্য তার কাটার, স্লোয়ার, ইর্কার! অভিষেকের পর দ্রুতই মুস্তাফিজ হয়ে যান ব্যাটসম্যানদের আতঙ্ক! অবশ্য মুস্তাফিজ যে আইপিএল দিয়ে লাইমলাইটে চলে এসেছেন তা কিন্তু নয়। ২০১৫ সালে ঢাকায় ভারতের বিরুদ্ধে ওয়ানডে অভিষেকে প্রথম তিন ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। সেই সফরে মুস্তাফিজের কাটারে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। সাতক্ষীরার এই তরুণ তুকির কাঁধে ভর করেই ভারতের বিরুদ্ধে ওয়ানডেতে প্রথম সিরিজ জয়ের স্বাদ পেয়েছিল বাংলাদেশ। ওই সিরিজের পর মুস্তাফিজ ক্রিকেট বোদ্ধাদের কাছ থেকে পেয়ে যান আরেক ‘কাটার মাস্টার’ নাম! ভারতের বিরুদ্ধে সেই সিরিজটা ছিল বাংলাদেশের মাটিতে। তাই মুস্তাফিজকে বিশ্ব মিডিয়া হয়তো সেভাবে আমলে নেয়নি। ‘ঘরের মাঠে বাঘ’ এতো অনেকেই হতে পারেন! কিন্তু ওই বছর আইপিএলেই মুস্তাফিজ নিজেকে আলাদা করে চেনান। তার ছোঁয়ায় হায়দরাবাদ চ্যাম্পিয়ন হয়, মুস্তাফিজ পেয়ে যান ওই আসরে সেরা উদীয়মান ক্রিকেটারের পুরস্কার। তারপর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন সেলিব্রেটি লিগে মুস্তাফিজকে নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। পাকিস্তান সুপার লিগ, ইংল্যান্ডের টি-২০ ব্লাস্ট কাটার মাস্টারকে চাই-ই চাই! বেচারা মুস্তাফিজ তো আর রোবট নন! তিনি তো রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। তাই বেশি চাপ সহ্য করতে না পেরে ইনজুরিতে পড়ে যান। হায়দরাবাদ নিজেদের স্বার্থে অন্ধ হয়ে গিয়ে মুস্তাফিজের ওপর বেশি চাপ প্রয়োগ করেছিল। তাই ভারত থেকে ফিরেই ইনজুরিতে পড়েছিলেন। তারপর বিশ্রাম নিয়ে আবার সাসেক্সের হয়ে খেলতে ইংল্যান্ডে চলে যান। প্রথম ম্যাচে চিরচেনা সেই ভয়ঙ্কর মুস্তাফিজ। ম্যাচ সেরাও। কিন্তু তারপরই পড়ে যান ইনজুরিতে। যে ইনজুরির কারণে ইংল্যান্ডেই মুস্তাফিজকে অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল। তারপর দীর্ঘ ৬ মাস মাঠের বাইরে। অবশেষে মুস্তাফিজ ইনজুরিতে থেকে ফেরেন বটে, কিন্তু ছন্দে আর ফিরতে পারছিলেন না। আইপিএলের গত আসরে একটি মাত্র ম্যাচ খেলেছিলেন হায়দরাবাদের হয়ে। কিন্তু পারফর্ম করতে পারেননি। তাই এই আসরে কাটার মাস্টারকে আর দলেই রাখেনি দলটি। কিন্তু কী মজার বিষয়, এই আসরে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের জার্সিতে খেলতে নেমে সেই সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধেই নিজেকে যেন পুরনো চেহেরায় ফিরে পেলেন কাটার মাস্টার। যদিও এই ম্যাচে মুস্তাফিজের দল হেরেছে, কিন্তু মুম্বাইয়ের দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছেন তিনি। ৪ ওভার বোলিং করে দিয়েছেন মাত্র ২৪ রান। উইকেট নিয়েছেন ৩টি। ৪-০-২৪-৩ কী অসাধারণ বোলিং ফিগার! বিশেষ করে, নিজের শেষ ওভারটির জন্য বেশি প্রশংসা পাচ্ছেন মুস্তাফিজ। মাত্র ১ রান দিয়ে নিয়েছেন ২ উইকেট। এতেও ঠিক ওভারটির গুরুত্ব বোঝানো সম্ভব হলো না। কেন না শেষ ১২ বলে জয়ের সানরাইজার্স হায়দরাবাদের দরকার ছিল ১২ রান। স্টেডিয়াম থেকে মুম্বাইয়ের দর্শকরাও তখন গ্যালারি ছাড়তে শুরু করেছেন। মুস্তাফিজ ওভারের প্রথম বলে এক রান দিলেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বলে ডট। চতুর্থ বলে উইকেট। পঞ্চম বলে ডট। শেষ বলে আবার উইকেট। এক ওভারেই ম্যাচ মুম্বাইয়ের দিকে ঝুঁকে গেল। কেন না ইনিংসের শেষ ওভারে হায়দরাবাদের দরকার ১১ রান। বাইশগজে তাদের শেষ জুটি। লেজের ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে খুব বেশি কিছু আশা করা কঠিন। মুম্বাই শিবিরে তখন জয় উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে যেন! কিন্তু শেষ ওভারে পারলেন না বোলার বেন কাটিং। রোমাঞ্চকর ম্যাচটি জিতে যায় হায়দরাবাদ। দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের বিরুদ্ধেও দারুণ বোলিং করেছেন মুস্তাফিজ। ৪ ওভারে ২৫ রানে এক উইকেট। কিন্তু দলকে জেতাতে পারেননি। প্রথম তিন ওভারে মাত্র ১৪ রান দিলেও শেষ ওভারে দিয়েছেন ১১ রান। প্রথম দুই বলে ১০ রান দেওয়ার পর টানা তিন বল ডট। শেষ বলটি ডট দিলেই সুপার ওভার হতো। কিন্তু পারেননি মুস্তাফিজ, এক রান দিয়েছেন। টানা তিন ম্যাচে শেষ বলে মুম্বাই হারলেও মুম্বাইবাসী মুস্তাফিজের নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। সাবেক ক্রিকেটাররা কাটার মাস্টারের প্রশংসা করছেন। সবার আলোচনা একটাই- এ যেন সেই মুস্তাফিজ, মাঝের এক আসর আগে যিনি সানরাইজার্স হায়দরাবাদকে চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন। না, না মুস্তাফিজ নয়, এ তো ‘দ্য ফিজ’! ক্রিকেট দলীয় খেলা বলেই কিনা মুস্তাফিজ একা আগুনে পারফর্ম করার পরও তার দল হারছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ