ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 April 2018, ৬ বৈশাখ ১৪২৫, ২ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দেশের হ্যান্ডবলে আস্থা কোথায়?

মোহাম্মদ সুমন বাকী : ফুটবলের বিপরীতে একটি খেলা আছে। সেটা এর মতোই আকর্ষণীয়। যা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে ক্রীড়ার নিয়ম ভিন্ন ধরনের। তা অবাক করা কান্ড! স্টেডিয়াম, মাঠ, বার, বলসহ সবকিছু রয়েছে। পাশাপাশি যোগ হয় আকর্ষণীয় গোল। যা প্লেয়াররা করে থাকেন অন্য কৌশলে। অর্থ্যাৎ একেবারে ফুটবলের বিপরীত দৃশ্যে। এই অবস্থায় হাত দিয়ে গোল করতে হয় খেলোয়াড়দের। সেটা জানা আছে সবার। এমন খেলার নাম হ্যান্ডবল। তা খুবই আকর্ষণীয়। এর উত্তেজনার রেশ মাঠে ফুটে উঠে বার বার। তাই ফুটবলের ন্যায় এ ক্রীড়া এক বাক্যে চমৎকার। হৈ, চৈ, খুশির উৎসবের জোয়ারে দর্শক মেতে উঠে হয় একাকার। এমন চিত্র দেখা গেছে বহুবার। ইতিহাসের পাতা স্বাক্ষী হয়ে জ্বল জ্বল করে। তা বিভিন্ন টুর্নামেন্টের স্মৃতি আকড়ে ধরে। সারা বিশ্বের প্রেক্ষাপটে। যা এই খেলার আস্থা গড়ে। সেটা কি নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে? একটু বিশ্লেষণে যাওয়া যাক। হ্যান্ডবলে আধিপত্য কাদের? এ প্রশ্নের উত্তরে মহাদেশগুলোকে সংযোজন করা যায়। ইউরোপের দাপট চোখে পড়ার মতো। তা ইংল্যান্ড, সুইডেন, হল্যান্ড, রোমানিয়া, আয়ারল্যান্ড, রাশিয়াকে ঘিরে। যাদের নৈপূণ্য বিশ্ব মাতিয়ে রাখে। যা নতুন করে কলমের কলিতে তুলে না ধরলেও হয়। কি বলেন লাল-সবুজ পতাকা দেশের কোটি কোটি ক্রীড়া পাগলপ্রেমি? শারীরিক গঠনে খুবই শক্তিশালী যারা। সে কথা বলা বাহুল্য। তাদের স্ট্যামিনা প্রচুর রয়েছে। তা ময়দানের যুদ্ধে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় সব সময়। ইউরোপ বলে কথা। ফুটন্ত গোলাপের উত্তেজনার ন্যায় সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকে সেখানে। নোংরা বস্তু, আবর্জনার বিন্দু পরিমান দুর্গন্ধ নেই। যা ক্রীড়ার উন্নয়নের পথে দারুণ পরিবেশ। যেখানে প্লেয়ার জন্ম নিয়েছে নজর কাড়ার মতো। সেটা শতভাগ খাঁটি ধারায়।
তা বিশ্ব হ্যান্ডবলকে স্থান দিয়েছে আলোকিত পাতায়। ইউরোপের বাইরে এই খেলার প্রচলন দেখা যায় আমেরিকা এবং ল্যাটিন অঞ্চলের কয়েকটি দেশে। যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ার লক্ষ্যে। এমন ক্ষেত্রে ইউরোপের দলগুলো এগিয়ে আছে। বেশিরভাগ শিরোপা জয় করার জন্য। সেটা সোনালী ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের হ্যান্ডবল বেঁচে রয়েছে শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ার মাঝে। শিরোপা জিতার ফাইটে যাদের বার বার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা গেছে। অসাধারণ নৈপূণ্য দর্শকের মন কেড়ে নিয়েছে। সে তুলনায় অপর দেশ নিউজিল্যান্ড একেবারেই দুর্বল। তাই ইউরোপের সঙ্গে বিশ্লেষণমূলক আলোচনার বিষয়ে পিছিয়ে পড়েছে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের হ্যান্ডবল। যা সত্য কথা। হাত দিয়ে গোল করার এই ক্রীড়ায় অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের একমাত্র ভরসা অস্ট্রেলিয়া। কোনো মতে লড়াই করে যাচ্ছে আফ্রিকা। অংশগ্রহণ করে হ্যান্ডবল বাঁচিয়ে রেখেছে তারা। বিশ্ব হ্যান্ডবল বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ফুটে উঠে তা। সকলের বোধগম্য সেটা। যাদের এক ধাপ ওপরে এশিয়া। নিঃসন্দেহে বলা যায় এমন কথা।
টুর্নামেন্টের সাফল্য পাবার বিচারে সুপার পাওয়ার টিমের তালিকায় নাম লিখিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীন, চাইনিজ তাইপে, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, হংকং এবং ইন্ডিয়া। আকর্ষণীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শক্তিশালী তারা। অবশ্য এশিয়ান ঘরনার প্রেক্ষাপটে সেটা। বিশ্ব ও অন্য মহাদেশ ভিত্তিক টুর্নামেন্টে হাত বলের গোলের খেলায় লড়াইও কম করে না। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। গত দুই যুগ ধরে। যা প্রকাশ পায় বিভিন্ন মিডিয়ায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর নব্বই দশকের মাঝপথে যুব কমনওয়েলথ টুর্নামেন্টে আলোর সন্ধান পায় লাল-সবুজ পতাকায় ঘেরা প্রমিলা টিম। যারা রানার্স আপ হয়ে তাক লাগিয়ে দেয় সারা বিশ্বকে! তা ছিলো কল্পনার বাইরে।
অথচ মাঠের লড়াইয়ে সেটা ঘটে যায়। রাশিদা, স্বপ্না, শিখাদের উদ্ভাসিত নৈপূণ্যের কারণে। যারা দ্রুত তারকা খ্যাতি পেয়ে যান। যা আলাদ্বীনের চেরাগ হাতের মুঠোয় বন্দী হবার মতো। সে সময়টা বাংলাদেশের হ্যান্ডবলে স্বর্ণ যুগ বলে আখ্যায়িত হয়েছে। পুরুষ দল দারুণ খেলেছে। দুর্ভাগ্যের কারণে ফাইনালে নাম লেখাতে পারেনি। তাই তাদের জন্য দুঃখ করা ছাড়া উপায় ছিলো না তখন। স্বপ্না, শিখা, রাশিদারা হিরোইন বনে যায় যখন। সিনে জগতে নয় তা! কৌশল এবং শারীরিক শক্তি ব্যয় করে খেলার ময়দানের যুদ্ধে ঘটায় সেটা। আক্রমণভাগে চমৎকার নৈপূণ্য প্রদর্শন করেন স্বপ্না। দারুণ স্কোরার তিনি। এক কথায় চমৎকার। যেখানে সুপার পারফরম্যান্সের ধারায় রাশিদা আবিষ্কার। পরিশ্রমী খেলায় তুলনা নেই যার। তীব্র লড়াইয়ের ম্যাচে যা ফুটে উঠেছে বার বার। শিখা ছিলেন অন্যতম আলোচিত প্লেয়ার। স্বপ্না, রাশিদাকে সঙ্গী বানিয়ে সে খ্যাতি অর্জন করে সুপার তারকার পদবী গায়ে লাগিয়ে। প্রচার পায় বিশ্ব ক্রীড়া ভুবনে। সেটা বাইশ বছর আগের কথা। দেশের হ্যান্ডবলের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে স্মৃতি হয়ে আছে তা। এরপর এই খেলা দিন দিন পিছিয়ে পড়ে। এমন সাফল্য রূপ কথার গল্প হয়ে কলমের লেখনিতে স্থান পেয়েছে। যা ফুটে উঠে চলতি বিংশ শতাব্দীতে। কি বলেন ক্রীড়া প্রেমিরা? বর্তমানে হ্যান্ডবলের আগের জৌলুস নেই। ক্রীড়াটির অবস্থান ঢাকা কেন্দ্রিক। সারাদেশে ৬৪ জেলা। সেটা খেলার অঙ্গন নিয়ে পরিবেষ্টিত। তা নতুন কিছু নয়। যা বাংলাদেশের সূচনালগ্ন হতে দেখা যাচ্ছে। সেটা বজায় আছে এখন পর্যন্ত। প্রশ্ন জাগে, কয়টি জেলায় মাত্র ছয় বছর অন্তর হ্যান্ডবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়? তা অপ্রিয় সত্য কথা! প্রতিবছর আয়োজনের বিষয়টি বাদ দেয়া যাক। হ্যান্ডবল ফেডারেশন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা কি বলেন? ঢাকার বাইরে প্রতিযোগিতা নেই। সে জন্য প্রতিভাবান প্লেয়ার তৈরি হচ্ছে না। তাই এ খেলার অধঃপতন ঘটেছে। যা স্বীকার করতে হবে সবাইকে। অলিম্পিক এবং এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ দল পিছনের বেঞ্চের ছাত্র। তাদের নৈপূণ্য সেটা আভাস দেয় বার বার। বর্তমানে খুবই নাজুক অবস্থা।
খেলাটির জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। ২০১৮ কমনওয়েলথ গেমস বড় প্রমাণ। যেখানে বাংলাদেশ টিমের নাম গন্ধ নেই। গত শতাব্দীর নব্বই দশকের তুলনায় বর্তমানে হ্যান্ডবলের পজিসন ভালো নয়। দেশের কোথাও খেলা নেই। চাঁদপুর জেলার মতলব থানার ফরাজিকান্দা দক্ষিনাপুর যুব সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ মোশারফ হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, হ্যান্ডবল গোলের খেলা। সে জন্য পছন্দ করি। মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামে এর টুর্নামেন্ট দেখেছি। তা ভালো দিক। কিন্তু শিকড় ঠিক না থাকলে সেটা কি ধরে রাখা যাবে? দুঃখের বিষয় হচ্ছে চাঁদপুর জেলায় এই ক্রীড়া সেই জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি এখন পর্যন্ত। এর কারণ বিভিন্ন থানা এলাকায় হ্যান্ডবলের প্রচার ও প্রসার ঘটেনি। অথচ ক্রীড়া সংস্থা নামে কমিটি আছে! তাদের কাজ কি? তারা কখনো মাঠে উপস্থিত হয়েছেন ম্যাচ দেখার জন্য! একজন দর্শকের মতে, হতাশার সুরে জিজ্ঞাসা এবার, লাল-সবুজ পতাকা দেশের হ্যান্ডবলের আস্থা কোথায়? দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই খেলা মুখ থুবরে পড়ে থাকতে দেখে উপরোল্লিখিত প্রশ্ন করেন নোয়াখালী জেলার চাটখিল, আমিষা পাড়ার ক্রীড়া প্রেমি খোকন!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ