ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 April 2018, ৬ বৈশাখ ১৪২৫, ২ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শুটিংয়ের উপর ভরসা আর কতকাল?

অরণ্য আলভী তন্ময় : আরো একটি কমনওয়েলথ গেমসের আসর শেষ হয়েছে। বাংলাদেশও একরাশ হতাশা নিয়ে দেশে ফিরে এসেছে। তবে আগের মতোই আলো ছড়িয়েছে শুটিং ডিসিপ্লিন। দুটি রৌপ্য জিতে মান রেখেছেন লাল সবুজ পতাকার। তবে আর কতকাল এই শুটিং দেশের মান রাখবে সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এক শুটিং বিক্রি করে আর কতদিন চলবেন বাংলাদেশের ক্রীড়া কর্মকর্তারা। আন্তর্জাতিক গেমসে শুটিং ছাড়া অন্য কোনো ডিসিপ্লিনে পদক পায় না বাংলাদেশ, এটা যেন ক্রীড়াপ্রেমী বেশিরভাগ মানুষেরই প্রশ্ন। ঘরের মাঠের সাউথ এশিয়ান গেমস (এসএ)। সেখানেও শুটিং ছাড়া অন্য ডিসিপ্লিনগুলোর তেমন সাড়াজাগানো পারফরম্যান্স নেই। কমনওয়েলথ গেমসে এ যাবত পাওয়া আটটি পদকই এসেছে শুটিং থেকে। অথচ শুটারদের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোর উদ্যোগ নেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কিংবা বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ)। ২০২০ টোকিও অলিম্পিককে স্বপ্নের সারথি বানিয়ে শুটিং ফেডারেশন নিজেদের উদ্যোগে কর্মসূচি গ্রহণ করছে। কিন্তু শুটিংয়ের উন্নতির জন্য প্রয়োজন ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা। অথচ সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নেই সেই পৃষ্ঠপোষকতা। গেমস এলেই মন্ত্রণালয়, ক্রীড়া পরিষদ ও বিওএ’র এক শ্রেণীর কমকর্তা মেতে ওঠেন প্রমোদভ্রমণে, অ্যাথলেটরা হয়ে পড়েন গৌণ। যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এই রীতি, বাংলাদেশ পদক পাক কিংবা না পাক তাতে তাদের হৃদয়ে এতটুকু আঁচড় কাটে না, সরকারি টাকায় বিদেশ ঘুরতে এসে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে হেসেখেলে বেড়ানোটাই এসব কর্মকর্তার মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে। শুধু শুটিংয়ের ওপর নির্ভর আর কতদিন? কমনওয়েলথ গেমসে একটাই ইভেন্ট যেখানে বাংলাদেশের পদক জেতার সম্ভাবনা থাকে। এবার অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টে একুশতম কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশ বক্সিং, কুস্তি, ভারোত্তোলন, সাঁতার ও অ্যাথলেটিকেস অংশ নিলেও গেমস শুরুর আগে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা স্পষ্টভাবেই মিডিয়াকে জানিয়ে দেন শুটিংকে ঘিরেই বাংলাদেশের যত আশা। কারণ তিনি জানতেন আর কোনো ডিসিপ্লিনে পদক জেতার সম্ভাবনা নেই। যা যৌক্তিক মহাসচিব তাই বলেছেন। অযথা অন্য ডিসিপ্লিন নিয়ে আশার কথা শোনাননি। শেষ পর্যন্ত তাই হয়েছে, শুটিং থেকেই পদকের দেখা মিলেছে। আবদুল্লাহ হেল বাকি ও শাকিল আহমেদ দেশকে রুপা উপহার দিয়েছেন। বাকির যে অবস্থা ছিল তাতে কমনওয়েলথ গেমসে দলে থাকারই কথা ছিল না। সেই বাকিই কিনা ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে দেশকে টানা দ্বিতীয়বার রুপা উপহার দিলেন। ২০১৪ গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসেও একই ইভেন্টে তিনি রুপা জেতেন। যেখানে কমনওয়েলথ গেমসে অংশ নেওয়ার কথা ছিল না সেখানে রুপা পেয়ে খুশি বাকি। তারপরও কষ্ট থেকে গেছে তার। কেননা এবার অল্পের জন্য সোনা হাত ছাড়া হয়ে গেছে বাকির। যাক বাকি রুপা জেতার পর অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন এবার আর শুটিংয়ে পদক আসবে না। সেই ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত করলেন শাকিল আহমেদ। গত এস এ গেমসে শুটিংয়ে একমাত্র সোনা জয়ী এই প্রতিযোগী দেশকে দ্বিতীয় রুপা উপহার দিলেন। ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে ২৮ বছর পর পদকের খরা কাটাল শাকিল। ১৯৯০ সালে অকল্যান্ড কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার পিস্তল দলগত ইভেন্টে দেশকে প্রথম সোনা এনে দেন আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তার নিনি। শাকিলের এই সাফল্য প্রশংসার দাবি রাখে। সোনা না আসুক গোল্ড কোস্টে দুই রুপা এসেছে তাও কম প্রাপ্তি নয়। ২০০২ ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে আসিফ হোসেন সোনা জেতেন। শুটিং থেকেই কমনওয়েলথ গেমসে বার বার পদকের তালিকায় নাম উঠছে বাংলাদেশের। ভারোত্তোলনে মাবিয়া আক্তার সীমান্ত এবার প্রথমবার কমনওয়েলথ গেমসে অংশ নিয়ে তামা প্রায় জিতেই নিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে ৬ষ্ঠ স্থান দখল করেন। গত এস এ গেমসে সোনা জয়ী আলোচিত মহিলা এই ক্রীড়াবিদ। বাকি ডিসিপ্লিনের প্রতিযোগীরা হিটেই আউট। তাহলে কী শুটিং ছাড়া কমনওয়েলথ গেমসে অন্য কোনো ডিসিপ্লিন থেকে পদক আসবে না? আরেকটি প্রশ্ন ক্রীড়ামোদীদের মুখে ঘুরপাক খাচ্ছে। সবারই এক কথা শুটিংয়ের সাফল্য কি শুধু কমনওয়েলথ গেমসে সীমাবদ্ধ থাকবে? কমনওয়েলথের মতো বড় গেমসে যখন পদক জেতা সম্ভব হচ্ছে তখন এশিয়ান বা অলিম্পিক গেমসে পারছে না কেন? এ ব্যাপারে ১৯৯০ সালে কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশকে প্রথম সোনা এনে দেওয়া আবদুস সাত্তার নিনির সঙ্গী আতিকুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রশ্নটা বার বার আসছে। বাংলাদেশের শুটাররা যে মেধাবী তার প্রমাণ দিচ্ছে কমনওয়েলথ গেমস বা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্য এনে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এশিয়ান বা অলিম্পিক গেমসেও আমাদের শুটাররা পদক জিতবে। তবে তাদের রাস্তাটা তো তৈরি করে দিতে হবে। কমনওয়েলথ গেমসে আমরাই তো প্রথম সোনা এনেছি। তারপরও বলবো এশিয়ান বা অলিম্পিক গেমস ততটা সহজ নয়। এখানে পদক জিততে অনেক সাধনা ও পরিকল্পনা নিতে হয়।’ আতিক বেশ আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘সাফল্যের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু শুটারদের আমরা প্রোপার ট্রেনিং বা সুযোগ সুবিধা দিচ্ছি কি না সেই চিন্তা কি কেউ করেছেন? আমি অন্য দেশের কথা বাদ দিলাম, প্রতিবেশী ভারতের কথা বলি, শুটিং উন্নয়নে ওদের বাজেট কোটি কোটি টাকা। বলতে পারেন আকাশছোঁয়া। আর আমাদের টাকার পরিমাণটা উল্লেখ করতেই লজ্জা পাচ্ছি। কেননা যে টাকা তাতে ঠিকমতো অনুশীলনের কার্যক্রম একমাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। আমাদের শুটাররা কতটা অসহায় দুই দেশের বাজেটের তুলনা করলেই প্রমাণ মিলবে।’ আতিকের মতে বর্তমান শুটারদের নিয়ে চার বছরে পরিকল্পনা নেওয়ায় হোক। উন্নত প্রশিক্ষণ উন্নতমানের আর্মস ও গুলি দেওয়া হোক। ভালোভাবে জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দেওয়া হোক। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি এসব সুযোগ সুবিধা দেওয়া হলে চার বছরের মধ্যে এশিয়ান বা অলিম্পিক গেমসে শুটিং থেকে পদক আসবেই। সামান্য ফ্যাসিলিটিজ দিয়ে এশিয়ান কিংবা অলিম্পিকে পদকের আশা করাটা পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয়। কমনওয়েলথ নয় আমি যে সম্ভাবনা দেখছি তাতে ঠিকভাবে এগোতে পারলে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ