ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 April 2018, ৬ বৈশাখ ১৪২৫, ২ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খোকসার কাঠমিস্ত্রি জসিমের ‘কমিউনিটি লাইব্রেরি’

আমির হামযা, খোকসা : এতো সীমাবদ্ধতার মধ্যে তার ছোটবেলার সেই কষ্টের কথা অনুভব করে ২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর নিজের বসতবাড়ির পাশেই গড়ে তুলেছেন ‘কমিউিনিটি লাইব্রেরি’। কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের পাইকপাড়া মির্জাপুর গ্রামে কোন রকম সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই গড়েছেনে তাঁর প্রাণের এ পাঠাগারটি। এখন পর্যন্ত তাঁর পাঠাগারে বইয়ের সংগ্রহ প্রায় ৫০০ এর অধিক। সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১২ জনে। তিনি বই কেনেন নিজ খরচে, সদস্য সংগ্রহও করেন বিনা পয়সায়। ‘কমিউনিটি লাইব্রেরি’ সদস্য হতে কোনো ফিস লাগে না। সদস্যরা নানারকম বই পড়তে পারেন বিনামূল্যে। ধারও নিতে পারেন।

তার বিশ্বাস, গ্রামের কম শিক্ষিত মানুষগুলো বই পড়ার মাধ্যমে অন্য এক উচ্চতায় যেতে পারবেন। এ পাঠাগারে যারা পড়তে আসেন বা বই ধার নেন তারা বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, বৃন্ধ-বৃদ্ধা সকলেই তাঁর পাঠাড়ারের সদস্য হতে পারেন। তাঁর ভাষায়, ‘শুধুমাত্র স্কুলের ছেলেমেয়েরা নয়, যারা অনার্সে পড়ে তারও আমার পাঠাগার থেকে বই নেয়। এমনকি বয়স্ক এবং যেসব মেয়ের কিছুদিন হলো বিয়ে হয়েছে তারা সবাই আসে, বই নিয়ে যায়। আমার মতো খেটে খাওয়া মানুষরাও আসেন।’ সবার জন্য উন্মুক্ত হলেও তিনি মূলত অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত মানুষদের বইয়ের প্রতি টান বাড়ানোর জন্যই এই পাঠাগারটি স্থাপন করেছেন। স্বল্প আয় তার উপর ঘাড়ে সংসারের বিশাল বোঝা, আছে প্রতিবন্ধী ছোট ভাই, এত সীমাবদ্ধতা মধ্যেই তিনি এ মহৎ কাজটি কীভাবে পরিচালনা করেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ উদ্যোগটার কথা আমি আগে কখনোই চিন্তা করিনি। মূলত চিন্তার করার সাহসও পায়নি। কারণ আমার মতো একজন দরিদ্র মানুষের জন্য এ চিন্তা করাও যেন পাপ! কিন্তু না আমি একসময় সব চিন্তাভাবনা ঝেরে ফেলে উদ্যোগ নিয়েই ফেলি পাঠাগার নির্মাণের। তবে ছোটবেলায় বই পড়ার নেশা থাকলেও বই কেনার সামর্থ ছিল না আমার। তাই অনেক কষ্ট করে অন্যের কাছ থেকে বই ধার করে নিয়ে পড়তাম। অনেক কষ্ট হতো। সেই কষ্ট থেকেই আমার ‘কমিউনিটি লাইব্রেরি’র পথচলা শুরু হয়। পথা চলা শুরু করি আমার পড়া ১০ বই নিয়ে।’ নিজের আয়ের একটি অংশ দিয়ে বই কিনলেও মাঝে মাঝে তিনি প্রযুক্তির আশ্রয়ও নেন। 

বই সংগ্রহে সরকারি-বেসরকারি কোনো সাহায্য সহযোগিতা না পেলেও একজনের পরামর্শে তিনি খোকসা উপজেলা নির্বাহী অফিসার এর কাছে চিঠি লিখলেও ইউএনও’র দপ্তর থেকে কোন উত্তর পাননি। তবে এতে মোটেও হতাশ নন বলে জানান জসিম। দেশে প্রতিবন্ধী ভাতা চালু থাকলেও তাঁর প্রতিবন্ধী ছোট ভাইয়ের নাম সেই খাতায় নেই। টিনের চাল ও বেড়া দিয়ে নির্মিত পাঠাগারটি মেঝে পাকা। পাঠাগারটির মাসিক খরচ সম্পর্কে তিনি জানান, ঘর ভাড়া ২০০, বিদ্যুৎ বিল ১০০ এবং একটি জাতীয় দৈনিক রাখেন, যার জন্য তাকে আরও ৩০০ টাকা খরচ করতে হয়। সবার কাছে সহযোগিতা চান, আর সে সহযোগিতাটি হলো লাইব্রেরিতে মানুষের আসা-যাওয়া যেন বাড়ে।

জসিম উদ্দিন বলেন, আজকালের মানুষগুলো শুধু সার্টিফিকেটের জন্য বই পড়ে, কী হবে এসএসসি, এইচএসসি পাশ করে, যদি সঠিক জ্ঞানই না থাকলো? দেশে অনেক সামর্থবান, বিত্তশালী, বড় বড় গবেষক, শিক্ষাবিদ আছেন কিন্তু কেউ এমনভাবে শিক্ষা জীবন থেকে অঙ্কুরেই ঝরে যাওয়া কাঠমিস্ত্রি জসিম উদ্দিনের মতে করে ভাবেননি। জসিম উদ্দিন বিত্তবান উদ্দেশ্যে বলেন, তার যেন আমার এই মহৎ উদ্দেশ্যে সফল করতে তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ