ঢাকা, শুক্রবার 20 April 2018, ৭ বৈশাখ ১৪২৫, ৩ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দ্বৈত নাগরিক ছাড়া সকল প্রবাসীর  ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার: দ্বৈত নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র না দেওয়া এবং তাদের ভোটাধিকারও না থাকার দাবি তুলেছেন বিশিষ্টজনরা। তবে দ্বৈত নাগরিক ছাড়া অন্য প্রবাসীদের জাতীয় পরিচয়ত্র প্রদান ও ভোটাধিকারের ব্যবস্থা করার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহবান জানিয়েছে তারা।

গতকাল বৃহস্পতিবার হোটেল সোনারগাঁওয়ে ‘প্রবাসী বাংলাদেশী নাগরিকগণকে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান ও ভোটাধিকার প্রয়োগ’ সংক্রান্ত সেমিনারে এই দাবি জানান তারা। নির্বাচন কমিশন আয়োজিত এ সেমিনারে সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রদূতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা বলেছেন, প্রবাসীদের ভোটার করতে প্রধান সমস্যা দ্বৈত নাগরিকত্ব। ৩০০ আসনের ব্যালট নিয়ে বিদেশে ভোট প্রদানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। আমাদের কাছে যারা এ প্রস্তাব নিয়ে আসে তাদের বিষয়টা বুঝিয়ে বলি। তবে এ ব্যাপারে আজ আলোচনা মাধ্যমে নির্ধারণ হবে কীভাবে প্রবাসীরা ভোটের আওতায় আসবে।

সিইসি বলেন, দেশের সন্তানরা বিদেশে অবস্থান করে দেশকে সমৃদ্ধশালী করছেন। তাদের কীভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগে সাহায্য করা যায়, কীভাবে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া যায় উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে সেই বিষয়ে মূল্যবান বক্তব্য শোনা হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে প্রক্সি ভোট ও পোস্টাল ভোটের নিয়ম আছে। এর মাধ্যমে প্রবাসীরা ভোট দিতে পারেন। আগামী নির্বাচনের আগে এসব পদ্ধতি নিয়ে প্রচারণা চালানো হবে।

সেমিনারে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারপারসন জি এম কাদের বলেন, দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশে পাবলিক অফিসের দায়িত্ব গ্রহণ করতে দেওয়া উচিত নয়। যারা পাবলিক অফিসের দায়িত্ব সামলাবেন তাদের শুধুমাত্র বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে।

তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান। তিনি বলেন, এর আগে দুই-একজন দ্বৈত নাগরিক মন্ত্রী হয়েছেন। এই বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে দেখা উচিত।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ইটালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবদুস সোবহান শিকদার বলেন, প্রবাসী ও অভিবাসী (দ্বৈত নাগরিক) এক বিষয় নয়। ভোটাধিকার প্রবাসীরা পেতে পারেন। কারণ, তারা অন্য দেশের নাগরিক নন। তবে অভিবাসীরা দেশ ছাড়েন অন্য দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে। তারা যে দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন সেখানকার ভোটাধিকারসহ সব সুবিধাই ভোগ করেন। তবে, কে ভোটাধিকার পাবেন; সেটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটা নিয়ে আরও আলোচনা হওয়া উচিত। আমি শুনেছি যুক্তরাজ্যে থাকা বাংলাদেশীরা ভোটাধিকারের বিষয়ে সোচ্চার।’

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ মিশনের উপপ্রধান মাহবুব হাসান সালেহ বলেন, যারা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছে তাদেরকে বাংলাদেশে ভোটাধিকার দেওয়া যায় না।  

সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ জানান, প্রবাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার জন্য সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস প্রস্তুত। তিনি বলেন, আমরা লাখ লাখ বাংলাদেশীকে মেশিন রিডেবল পাসপোর্টে দিয়েছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি আমরা সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশীদের নির্বাচন কমিশনের সময় অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্র দিতে পারবো।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান প্রবাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার করার বিষয়ে বলেছেন, ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। আর আজ আমরা প্রবাসীদের ভোটাধিকার ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে আলোচনা করছি। অথচ এই প্রবাসীদের টাকা সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন অ্যাম্বাসিতে ব্যাংকের শাখা করেছি বহু বছর আগে। প্রবাসীদের টাকা আমাদের কাছে যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ তার ভোটের অধিকার দেয়া ততটুকু গুরুত্বপূর্ণ হয় না।

তিনি বলেন, নাগরিক হিসেবে আমরা সবাই ভোট দেয়ার অধিকারী। আমরা ৪৫ বছর আগে বলেছি তারা  ভোটার। কিন্তু এখনও সেই বিধান নিশ্চিত করতে পারিনি। একটা সরকার না, কত সরকার গেছে কিন্তু এটা হয়নি।

দেশের সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন কাজের সমন্বয়হীনতার কারণে নাগরিক দুর্ভোগের উদাহরণ দিয়ে বলেন, আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা বড় কষ্টকর। প্রবাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার করার ব্যাপারে বড় কাজ না ধরে ছোট ছোট পর্যায়ে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি বলেন, দেশে অনেক সংসদীয় আসন আছে যেখানে ১০, ২০, ৩০ বা ৫০ হাজার প্রবাসী ভোটার আছেন। অথচ সেই সব আসনে হয়তো ১ কিংবা ২ হাজার ভোটের ব্যবধানে কেউ নির্বাচিত হলেন। এই ভুল দূর করা দরকার।

তিনি বলেন, বেসিক সিদ্ধান্ত নিতে এই আলোচনার দরকার নেই। কাজটা কঠিন, সময় সাপেক্ষ এবং নতুন কিছু বার্ডেন (বাধা) হবে। কিন্তু যে পরিমাণ টাকা তারা আমাদের সহায়তা করে তার অতি ক্ষুদ্র অংশ ব্যয় করলেই আমরা প্রয়োজনীয় লোকবল, যন্ত্রপাতি দিয়ে তাদের আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারি। তাদেরকে ভোটার করতে পারি। কাজেই কাজটা কষ্টকর কিন্তু কঠিন না। বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করে দেশটা স্বাধীন করেছে তারা কষ্টকে ভয় পায় না।

এনআইডি (জাতীয় পরিচয় পত্র) উইং মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, প্রবাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার জন্য কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জনবল ও যন্ত্রপাতি সংকট এবং বৈধ নাগরিক নিশ্চিতকরণ। সুপারিশমালায় তিনি বলেন, আমরা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ থেকে কাজটি শুরু করতে পারি।

প্রবাসীদের ভোটাধিকার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি আরেকটি চ্যালেঞ্জ। কারণ, বিদেশে প্রচুর বাংলাদেশী অবস্থান করছে। এছাড়া ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সহিংসতা থামানো ও বিপুল অর্থব্যয় অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

সেমিনারে আরো উপস্থিত ছিলেন চার নির্বাচন কমিশনার  মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম, বেগম কবিতা খানম, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মশিউর রহমান খান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জি এম কাদের, মালেশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত শহিদুল ইসলাম, সৌদিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ