ঢাকা, শুক্রবার 20 April 2018, ৭ বৈশাখ ১৪২৫, ৩ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রমযানে পণ্যের মূল্য

বর্তমান বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সুখবর পাওয়া যে সম্পূর্ণরূপেই কল্পনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে সে কথা সম্ভবত বলার অপেক্ষা রাখে না। এজন্যই কখনো কোনো সুখবর জানা গেলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনমনে সংশয় ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। এরকম এক সুখবরই জানা গেছে একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে। গত বুধবার প্রকাশিত রিপোর্টটিতে জানানো হয়েছে, আগামী মাস মে’র তৃতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হতে যাওয়া এবারের রমযানে পণ্যের মূল্য নাকি মানুষের নাগালের মধ্যেই থাকবে। 

প্রায় অবিশ্বাস্য এমন মন্তব্যের কারণ হিসেবে দৈনিকটি জানিয়েছে, পবিত্র রমযানে প্রধান যে পাঁচটি পণ্যের চাহিদা ও মূল্য অনেক বেড়ে যায় সেই ছোলা, ভোজ্য তেল, চিনি, খেজুর এবং পেঁয়াজের মজুদ নাকি কয়েকগুণ পর্যন্ত বেশি রয়েছে। একযোগে এগিয়ে চলেছে আমদানির কার্যক্রমও। এসবের কিছু কিছু পণ্য এখন বাংলাদেশের পথে রয়েছে এবং রমযান শুরু হওয়ার আগেই সেগুলো বাজারে এসে প্ঁৌছাবে। অর্থাৎ সব মিলিয়েই এমন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে যাতে এবারের রমযানে জরুরি কোনো পণ্যেরই সংকট সৃষ্টি হতে এবং মূল্য বেড়ে যেতে না পারে।  

দৈনিকটির রিপোর্টে উদাহরণ দেয়ার জন্য প্রধান পাঁচটি পণ্যের মজুদ সংক্রান্ত তথ্য-পরিসংখ্যানেরও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, রমযানে ভোজ্য তেলের চাহিদা যেখানে ২ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিক টন হওয়ার কথা, সেখানে মজুদ রয়েছে ২২ দশমিক ৫৯ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ৮ গুণ বেশি। একইভাবে ৮০ হাজার টন ছোলার স্থলে মজুদ রয়েছে ৭ দশমিক ৪৬ লাখ মেট্রিক টন তথা ৮ দশমিক ৩৩ গুণ বেশি। পেঁয়াজের সম্ভাব্য চাহিদা যেখানে ৪ লাখ টন, সেখানে মজুদ রয়েছে ১৭ দশমিক ৯১ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ প্রায় ৩ দশমিক ৪৮ গুণ বেশি। খেজুরের চাহিদা যেখানে ১৮ হাজার টন, সেখানে মজুদ রয়েছে ৬৪ দশমিক ১৪ হাজার টনÑ প্রায় ২ দশমিক ৫৬ গুণ বেশি। চিনির মজুদ অবশ্য খুব বেশি নেই। সম্ভাব্য চাহিদা যেখানে ৩ লাখ টন সেখানে চিনির মজুদ রয়েছে ৪ দশমিক ৩৫ লাখ টন। অর্থাৎ দশমিক ৪৫ গুণ বেশি। প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, এরই মধ্যে চিনির পাশাপাশি অন্য সব পণ্য আমদানির জন্যও ব্যবসায়ীরা এলসি খুলেছেন। সে সব পণ্য অচিরেই দেশের বাজারে পৌঁছে যাবে। সুতরাং এবারের রমযানে কোনো পণ্যেরই সংকট দেখা দেবে না। মূল্য বাড়ারও সম্ভাবনা নেই। 

ওদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও অসৎ ব্যবসায়ীদের কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, মজুদদারি বা কালোবাজারির মতো কোনো কর্মকান্ড যারা চালাবে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তি দেয়া হবে। মন্ত্রী প্রসঙ্গক্রমে জানিয়েছেন, দেশ যদিও মুক্তবাজার অর্থনীতির ফর্মূলাতেই চলবে কিন্তু চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সমন্বয় ও সামঞ্জস্য বিধান করা হবে বলে কোনো পণ্যেরই দাম বাড়বে না। তাছাড়া টিসিবিকে দিয়ে খোলাবাজারে জরুরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করার মাধ্যমেও সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখবে। 

প্রকাশিত রিপোর্টের পাশাপাশি বাণিজ্যমন্ত্রীর আশ্বাস যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক সন্দেহ নেই কিন্তু তা সত্ত্বেও সত্য হলো, পোড় খাওয়া গোরুর মতোই জনগণ আশ্বস্ত বা নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। এর কারণ, এবারই প্রথম নয়, বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো রমযানেই পণ্যের মূল্য জনগণের নাগালের মধ্যে থাকেনি। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে মজুদ ও আমদানির বিষয়ে অনেক কেচ্ছাকাহিনী শোনানোর পরও। প্রতিবারই বরং বাজার পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গেছে, যা দেখে বলার উপায় থাকেনি যে, দেশে সত্যি কোনো সরকার রয়েছে। কারণ, কোনো পর্যায়েই ধমক দেয়ার এবং লম্বা আশ্বাস ও গালগল্প শোনানোর বাইরে মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠার পরও সরকারকে কখনো তেমন নড়াচড়া করতে দেখা যায়নি। মন্ত্রীরা বড়জোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, ধমকের পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন, তারা নাকি ‘কঠোর নজরদারি’ করবেন! মন্ত্রীরা সেই সাথে ‘অসৎ ব্যবসায়ীদের’ ওপর দোষ চাপাতেও পিছিয়ে থাকেননি। 

অন্যদিকে বিশ্লেষকরা বলেছেন, অসৎ নামের ওই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মন্ত্রীদের তথা সরকারের অতি চমৎকার সম্পর্কের পেছনে চাঁদা ধরনের বিশেষ কিছু ‘ফ্যাক্টর’ থাকার কারণেই কথিত ‘কঠোর নজরদারি’ জনগণের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনতে পারেনি। পণ্যের দাম বরং বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এই অভিযোগও সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ‘অসৎ ব্যবসায়ীদের’ জন্য মুনাফা লুণ্ঠনের সুযোগ আসলে সরকারই সৃষ্টি করে দিয়েছে। ব্যবসায়ীরাও সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে যথেচ্ছভাবেই। আর সে কারণেই যথেষ্ট মজুদ থাকা সত্ত্বেও পণ্যের মূল্য চলে গেছে জনগণের নাগালের অনেক বাইরে- যার মাশুল গুণতে গিয়ে সাধারণ মানুষের তো বটেই, নাভিশ্বাস উঠেছে এমনকি মধ্যবিত্তদেরও। 

আমরা মনে করি, এবার যেহেতু হাতে সময় থাকতেই মজুদ সম্পর্কে জানা গেছে এবং বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেও যেহেতু আশ্বাসের কথা শুনিয়েছেন, সেহেতু টাউট ব্যবসায়ীদের প্রশ্রয় ও সহযোগিতা দেয়ার পরিবর্তে সরকারের উচিত কঠোরতার সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা ও পণ্যের মূল্য কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। চিনি, ভোজ্য তেল ও ছোলার মতো জরুরি পণ্যগুলো ওএমএস-এর মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা নিলেও মানুষের উপকার হতে পারে। মনিটরিং করা এবং যথেচ্ছভাবে দাম বাড়ানোর কার্যক্রমকে প্রতিহত না করা গেলে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে স্বাভাবিক নিয়মে। তেমন অবস্থায় বাণিজ্যমন্ত্রীর কঠোর নজরদারির ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কোনো সুফলই মানুষ ভোগ করতে পারবে না। আমরা তাই এখনই উদ্যোগী হওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ