ঢাকা, শনিবার 21 April 2018, ৮ বৈশাখ ১৪২৫, ৪ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঝুঁকিতে সামষ্টিক অর্থনীতি

এইচ এম আকতার, কামাল উদ্দিন সুমন : আগামী মাসে দেশের শিল্প কারখানায় যুক্ত হচ্ছে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। ব্যবসায়ীদের আশংকা, এলএনজি ব্যবহারের ফলে ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়বে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এলএনজি ব্যবহারের কারণে গ্যাসের দাম বেড়ে যাবে হঠাৎ করে কয়েকগুন। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না তারা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এলএনজি বাংলাদেশে নতুন। এ ব্যবস্থা চালু হলে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হঠাৎ করে আমদানি করা এলএনজির দোহাই দিয়ে জ্বালানীর দাম বৃদ্ধি করা হলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বালাদেশ।
সূত্র জানায়, আগামী ২৫ এপ্রিল দেশে আসতে যাচ্ছে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। তরল থেকে একে ফের গ্যাসে রূপান্তর করে সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে ৫ থেকে ১০ দিন লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা। সে হিসাবে মে মাসেই এলএনজি পৌঁছে যাবে গ্রাহকের কাছে। প্রথম পর্যায়ে চট্টগ্রামে এই গ্যাস সরবরাহ করা হবে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জ্বালানি সংকট দূর করতে দেশে প্রথমবারের মতো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তরল আকারের এই গ্যাস আসবে কাতার থেকে। প্রথমে প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন (৩০ কোটি) ঘনফুট এলএনজি আসবে। পর্যায়ক্রমে সরবরাহ বাড়িয়ে ৫০০ মিলিয়ন (৫০ কোটি) ঘনফুট করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি এই এলএনজি আমদানি করবে। প্রথমবার এক্সিলারেট এনার্জি তাদের রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিটে এক লাখ ৩৮ হাজার ঘনমিটার এলএনজি বাংলাদেশে নিয়ে আসবে। এর আগে ২২ বা ২৩ এপ্রিল এই ইউনিট বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিকভাবে আমদানি করা এলএনজি চট্টগ্রাম অঞ্চলে সরবরাহ করা হবে। চট্টগ্রামে এলএনজি সরবরাহ শুরু করা হলেও এর প্রভাব পড়বে সারাদেশেই। কারণ, বর্তমানে চট্টগ্রামে ২৩০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে হয়। এই গ্যাস তখন দেশের অন্য অঞ্চলগুলোতে সরবরাহ করা হবে। এতে সারাদেশেই গ্যাসের ঘাটতি কিছুটা হলেও কমে আসবে। এছাড়া, দ্বিতীয় পর্যায়ে সামিটের আমদানি করা এলএনজি আসার কথা অক্টোবরে। সেই আমদানি শুরু হলে তা সরবরাহ করা হবে দেশের মধ্যাঞ্চলে।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব জনেন্দ্রনাথ বলেন, ‘এলএনজি এলে চট্টগ্রামে আর গ্যাস দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। এলএনজির কিছু অংশ জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ করা যাবে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলে গ্যাসের সরবরাহ বাড়বে।’
খনি থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস তুলে চাপ প্রয়োগে সংকুচিত করে তরলে রূপান্তরকে এলএনজি বলা হয়। এই এলএনজি জাহাজে করে দেশে আনা হবে। এরপর রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিটের মাধ্যমে আবার গ্যাসে রূপান্তর করে গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।
তরলীকৃত গ্যাসভর্তি জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর পর রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিটের মাধ্যমে তরল এই গ্যাস আবার বায়বীয় আকারে আনা হবে। এরপর সঞ্চালন লাইন হয়ে গ্রাহকের পাইপলাইনে গ্যাস পৌঁছাতে সবমিলিয়ে ১৫ দিনের মতো সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘এলএনজির আমদানি বর্তমান সরকারের একটি বড় উদ্যোগ। এতে দেশের গ্যাস ঘাটতি কিছুটা হলেও কমবে। এখন পর্যন্ত যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন হলে আগামী কয়েক বছরেরর মধ্যে দেশে প্রায় ২০০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি হবে। এতে গ্যাসের ঘাটতি যেমন পূরণ হবে, তেমনি গ্যাসের দামও সমন্বয় করতে হবে সরকারকে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এক্সিলারেটের পর বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমে এলএনজি আনবে আরও তিনটি কোম্পানি। সামিট, রিলায়েন্স, হংকং সাংহাই মানজালা। প্রত্যেকেই ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট করে গ্যাস বাংলাদেশ আনবে। এক্সিলারেটের সঙ্গে ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই চুক্তি স্বাক্ষর করে পেট্রোবাংলা। চুক্তি অনুযায়ী, এ মাসেই তাদের এলএনাজি আমদানির কথা ছিল।
২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল সামিটের সঙ্গে চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। তাদেরও এ বছরের অক্টোবরে এলএনজি আনার কথা রয়েছে। এছাড়া রিলায়েন্স ও হংকং সাংহাই মানজালার সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এরমধ্যে রিলায়েন্স ২০১৯ সালের জুন মাসে এবং মানজালার ২০২০ সালের জুন মাসে এলএনজি আমদানির সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ (জিটিসিএল) জানায়, এরই মধ্যে মহেশখালী আনোয়ারা-১ নামের পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। মহেশখালী থেকে আনোয়ারা (২ নম্বর সঞ্চালন লাইন), আনোয়ারা থেকে ফৌজদারহাট, চট্টগ্রাম থেকে ফেনী, ফেনী থেকে বাখরাবাদ এবং কটুম্বপুর থেকে মেঘনাঘাট সঞ্চালন লাইনগুলো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিদেশ থেকে আসা এলএনজিভর্তি জাহাজটি অবস্থান করবে সমুদ্রের বেশ খানিকটা ভেতরে। যেখানকার গড় গভীরতা ৩২ থেকে ৩৫ মিটার। এরই মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই, আবহাওয়া, ঝুঁকি এবং স্থায়িত্ব পরীক্ষার জন্য সেখানে রাখা হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একটি জাহাজ। যেখানে নোঙর করবে এক্সিলারেট এনার্জির বিশেষ এফএসআরইউ। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি এফএসআরইউতে এলএনজি থাকবে ১ লাখ ৩৮ হাজার ঘনমিটার। যা সেখান থেকেই রূপান্তর করে গ্যাস পাওয়া যাবে ২৯০ কোটি ঘনফুটের মতো। এই গ্যাস দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট হারে গ্রিডে দেয়া হলে একেকটি জাহাজে চলবে ছয় দিনের কম। আর, কাতার থেকে রওনা হয়ে এই পর্যন্ত আসতে সময় লাগবে আরো দশ থেকে ১২ দিন। তাই, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ রাখতে হলে, জাহাজ চলাচল, নোঙরসহ কড়া নজরদারির আওতায় আনতে হচ্ছে সার্বিক ব্যবস্থাপনা।
এলএনজি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এফবিবিসিআই’র সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, এলইজি বাংলাদেশে নতুন। এ ব্যবস্থা চালু হলে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হঠাৎ করে আমদানি করা এলএনজির দোহাই দিয়ে জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধি করা ঠিক হবে না। দাম বৃদ্ধির কারণে আর্ন্তূজাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বালাদেশ।
তিনি আরও বলেন, দাম বৃদ্ধি করতে হলে কয়েক কিস্তিতে তা করতে হবে। তা না হলে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের প্রতিকূলতার মধ্যে পড়বে। বিশেষ গার্মেন্টস এবং স্পিনিং মিল মালিকদের কথা সরকারের মাথায় রাখতে হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এ দুই শিল্পের কাজের অর্ডার নেয়া হয়ে থাকে এক দু’বছর আগ থেকেই। হঠাৎ করে দাম বৃদ্ধি পেলে তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বে।
কনজুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাবের) জ্বালানী উপদেষ্ঠা ড. অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, হঠাৎ করে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেলে শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একইভাবে ঝুঁকিতে পড়তে পারে দেশে সামষ্টিক অর্থনীতি। দেশের অর্থনীতি নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারে। এর বোঝা তখন কে নিবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধি করা দরকার। কিন্তু তা না করে সরকার উচ্চ মূল্যে কুয়েত থেকে এলএনজি আমদানি করছে। যা কোনভাবে যুক্তিক বলে মনে হচ্ছে না। বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশে উচ্চ মূল্যের এলএনজি কতটুকু ব্যবহারযোগ্য তা খতিয়ে দেখা উচিৎ। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীরা হতাশ।
যদি এলএনজি দিতেই হয় তাহলে এখাতে মোটা অংকের ভর্তুকি দিতে হবে। যা এখাতে সরকারের ভর্তুকি আরও বাড়িয়ে তুলবে। আর এ কারণে বিকল্প হিসেবে সরকারের উচিৎ হবে আমদানি নির্ভর না হয়ে অভ্যন্তরীণ খাতে থেকে গ্যাস উত্তোলন করা। তা না হলে উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার যে বীজ পবন করছে সরকার তা ভেস্তে যেতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ