ঢাকা, শনিবার 21 April 2018, ৮ বৈশাখ ১৪২৫, ৪ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর জন্য কোটি কোটি মানুষের ওপরে সরকার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে

গতকাল শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে নাগরিক কমিটির সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ আবুল মকসুদ -সংগ্রাম

# বারবার গ্যাসের দাম বাড়ানো সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন
স্টাফ রিপোর্টার : নাগরিক কমিটির এক সেমিনারে বিশিষ্টজনরা অভিযোগ করে বলেছেন, সরকার একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর জন্য কোটি কোটি মানুষের জীবনের ওপরে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। এটাকে আমরা মনে করি, শুধু অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা তা না, এটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। তারা বলেন, বারবার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করে সরকার মানুষের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করছে । ছোট ছোট গোষ্ঠীর স্বার্থে সরকার কোটি কোটি মানুষের জীবনযাপনের মূল্যবৃদ্ধি করছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘন।’
গতকাল শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ভোক্তার স্বার্থ উপযোগী ও পরিবেশবান্ধব এলএনজি ও এলপিজির যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের দাবিতে এক নাগরিক সভার আয়োজন করা হয়। সভায় নাগরিক কমিটির পক্ষে সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। সেমিনারে  সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর, পরিকল্পনাবিদ স্থাপতি মোবাশ্বের হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইসলাম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম, কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশের (সিপিবি) সভাপতিমন্ডলীর সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স প্রমুখ।
সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা সরকারি কর্মকর্তাদের কাজ নয়। এটা রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কাজ।’ এ সময় তিনি গ্যাসের দাম বৃদ্ধি বন্ধ করার দাবি জানান।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের মহাজন-ব্যবসায়ীদের মতো আচরণ করছে। সরকার পার্টনারশিপ ব্যবসায়ী হয়ে গেছে। বছরে দুবার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করছে। সরকার কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করছে। উন্নয়নের নামে পরিবেশ নষ্ট করছে।’
 তিনি বলেন, ‘সরকার একটি ক্ষুদ্রগোষ্ঠীর জন্য কোটি কোটি মানুষের জীবনের ওপরে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। এটাকে আমি মনে করি, শুধু অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা তা না, এটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
আবুল মকসুদ বলেন, রাষ্ট্রের সম্পদ ন্যায্যমূল্যে পাওয়া এটা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকারের জায়গা সরকার, অন্যায্যভাবে হস্তক্ষেপ করছে। এটার শিকার হবে জনগণ। এই হস্তক্ষেপের কারণ হলো অব্যবস্থাপনা, অপচয় আর দুর্নীতি। এই তিন অপশক্তি মানুষের ওপরে মূল্যবৃদ্ধির যে বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে, তা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
আবুল মকসুদ আরও বলেন, ‘এসব মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপারে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) মেরুদন্ড শক্ত নয়। এই মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া হয়েছে, যা তাঁদের কাজ নয়। এই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিষয়। স্বেচ্ছাচারিতা করে গ্যাসের দাম বাড়ালে শিল্প, বাণিজ্য, আবাসিকসহ সব ক্ষেত্রে তার বিরূপ প্রভাব পড়বে। এটাই আমাদের উদ্বেগের বিষয়। আশা করি, সরকার জনগণের স্বার্থ উদ্ধার করবে।’
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থাপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করে সরকার আমদানি গ্যাসের বৃদ্ধি করা দাম যৌক্তিক করছে। তিনি বলেন, ‘সাগর জয় করে সরকার নানা উৎসব করছে। কিন্তু সাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনের দিকে তাদের নজর নেই।
তিনি জানান, ভারত ও মিয়ানমার সাগর থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও শুরু করতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশের গ্যাস ভারত ও মিয়ানমারের দিকে চলে যাচ্ছে।’ এসব দিকে কেন সরকারের নজর নেই প্রশ্ন রাখেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইসলাম বলেন, ‘গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবেশ দূষণ নৈরাজ্যের দিকে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সরকার একসময় বলছে দেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে। আবার একই মুখে বলছে গ্যাস শেষের দিকে। মূলত নিজেদের স্বার্থে সরকার এমন বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।’
সরকার বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কেনে তিন ডলারে। আর দেশী কোম্পানির কাছ থেকে কেনে এক ডলারে, এমন তথ্য তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, ‘গ্যাসের দাম সঠিক করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ন্যায় সমতা দরকার হবে।
অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, সারা বিশ্বেই গ্যাসের দাম নির্ধারণ অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। সরকার বিভিন্ন মহলের চাপে পড়ে দাম নির্ধারণ করছে। কিন্তু দাম নির্ধারণের আগে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে শুনানি করতে হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাবের) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, বিইআরসির আইন লঙ্ঘিত হলেও জ্বালানি বিভাগ এলপিজির মূল্যহার বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারণ হতে দিচ্ছে না। গ্যাস খাতে রাজস্ব ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও গ্যাসের মূল্যহার বেড়েই চলছে। তিনি আরও বলেন, ‘গ্যাস চুরি ও ঘুষ-দুর্নীতি বাড়ছে। এসব চুরি, ঘুষ, দুর্নীতি, বৈষম্য কোনো প্রতিকার না করে এলএনজি আসার অজুহাতে আবারও গ্যাসের মূল্যহার গড়ে ৭৫ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে। এ বৃদ্ধি অন্যায় ও গণনিপীড়নের শামিল। আমরা এ বৃদ্ধির প্রতিবাদ ও বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।’
বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, যদি এলএনজি ও এলপিজির দাম বাড়ানো হয় তাহলে সরকারের বিশাল একটি রাজস্ব ঘাটতি দেখা যাবে। কারণ, সরকারের একটা বিশাল রাজস্ব আসে এই খাত থেকে। ইতিমধ্যেই দাম যা রয়েছে, তাতে বিশ্বে প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ