ঢাকা, শনিবার 21 April 2018, ৮ বৈশাখ ১৪২৫, ৪ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিশেষ সুবিধা দিতেই সরকারি দলের দাবি পূরণ করছে ইসি

# মন্ত্রী-এমপিকে প্রচারণার সুযোগ দিতে বিধি সংশোধনের উদ্যোগ
# আপত্তি সত্ত্বেও ইভিএম ক্রয়
# বিএনপির প্রস্তাব নিয়ে বৈঠকে আলোচনা নেই
মিয়া হোসেন : নির্বাচনে বিশেষ সুবিধা দিতেই নির্বাচন কমিশন (ইসি) ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের দাবি একের পর এক পূরণ করে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছে। এদিকে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি আমলে নিচ্ছে না ইসি। গাজীপুর ও খুলনা সিটি করর্পোরেশন নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা ও ইভিএম ব্যবহার না করার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তা নাকচ করে দিয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম ব্যবহার করার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে ইসি। অপরদিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সেনা মোতায়েনের বিপক্ষে এবং ইভিএম ব্যবহার করার পক্ষে। এমন কী তারা সিটি নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারণার সুযোগ দেয়ারও দাবি জানিয়েছে। আর এ দাবি জানানোর এক সপ্তাহের মধ্যে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে ইসি। এ জন্য সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আচরণবিধি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। অপর দিকে গাজীপুরের এসপিকে প্রত্যাহারসহ বিএনপির পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি জানানো হলেও তা ইসির বৈঠকে আলোচনায় স্থান পায়নি বলে ইসি সূত্র জানিয়েছে।
ইসি সূত্রমতে, আগামী ১৫ মে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গাজীপুর ও খুলনা সিটি করর্পোরেশন নির্বাচন। এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পৃথক দু’টি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনের সাথে সাক্ষাত করে তাদের দাবি জানিয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপির প্রতিনিধি দল ইসির সাথে বৈঠক করে গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে। সেই সাথে এসব নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার জন্য অনুরোধ করেছে। পাশাপাশি গাজীপুরের বির্তকিত পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদকে প্রত্যাহারসহ একগুচ্ছ দাবি জানিয়েছে বিএনপি।
অপর দিকে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচ টি ইমাম ইসির সাথে বৈঠক করে মন্ত্রী-এমপিদের নির্বাচনে প্রচারণার সুযোগ দিতে আচরণবিধি সংশোধনের দাবি জানায়। সেদিন বৈঠকের পর তিনি বলেন, আচরণবিধি নিয়ে বাস্তবে অনেকগুলো সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। মন্ত্রীদের গতিবিধি, সিটি কর্পোরেশনে এমপিরা যেন এলাকায় যেতে পারেন। গাজীপুর-খুলনায় অনেক এমপি রয়েছেন, তাদের ওপর যেন নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা হয়।
বিএনপির সাথে বৈঠকের সময় তাদের দাবির প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েন করবে না বলে সেদিনই বিএনপিকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। আর ইভিএম ব্যবহার না করা সংক্রান্ত বিএনপির দাবিও পূরণ করেনি ইসি। ইতোমধ্যে গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচনে ব্যবহারের জন্য প্রাথমিকভাবে ২ হাজার ৫৩৫ সেট মেশিন কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এসব ইভিএম বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির কাছ থেকে কিনতে চিঠি দিয়েছে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি। আর অন্যান্য দাবির বিষয়ে এখনো ইসির বৈঠকে আলোচনা হয়নি বলে জানা গেছে।
এদিকে আওয়ামী লীগের দাবি অনুযায়ী মন্ত্রী-এমপিদের স্থানীয় নির্বাচনের প্রচারণায় অংশ নেয়ার সুযোগ দিতে সিটি করপোরেশন নির্বাচন আচরণবিধি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। তারই অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন বৈঠক করেছে। বৈঠকে বিষয়টি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, এমপিরা অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির আওতায় আছেন। এটা যদি ইউপি পৌরসভায় প্রযোজ্য হলেও সিটি কর্পোরেশন এলাকা বিরাট এলাকায় যদি নির্বাচন হয় যারা অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তাদের বাইরে থাকতে হয়। এ বিষয়টি বিবেচনা করেই সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আলোচনাটা হয়েছে। এমপিরা কোনো অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কি না বা সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কি না- এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনাররা একটা কমিটি গঠন করেছেন কবিতা খানমের নেতৃত্বে আইন ও বিধিমালা সংস্কারে যে কমিটি আছে ওই কমিটি উনারা ইস্যুটি পর্যালোচনা করে একটা রিপোর্ট দেবেন। এরপরে বিষয়টি উনারা কমিশনে উত্থাপন করবেন।
আওয়ামী লীগের চাপে এই উদ্যোগ কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, চাপে না। যেকোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের স্টেক হোল্ডার। তাদের নিয়ে কাজ করতে হয়। তাদের নিয়ে পরামর্শ করে আলাপ-আলোচনা করে তাদের সুবিধা অসুবিধাগুলো আমরা বিবেচনা করি। আবেদন-নিবেদন করলে ইসি বিষয়গুলো বিবেচনা করে।
গাজীপুরের এসপির বিষয়ে বিএনপির দাবির প্রসঙ্গে সচিব বলেন, বিএনপির অভিযোগ ঢালাও। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না দেয়া হলে একজন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না।
মন্ত্রী এমপিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সিটি ভোটে প্রচারের সুযোগ দেওয়ার বিপক্ষে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর জোট ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের (ইডব্লিউজি) পরিচালক আব্দুল আলীম।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নির্বাচন একপেশে করতেই আওয়ামী লীগের চাপে নির্বাচন কমিশন এসব করছে। নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের প্রচারণায় অংশ নেয়ার ব্যাপারে ইসি সিদ্ধান্ত নিলে তা হবে অগণতান্ত্রিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এর আগে ২০১৫ সালে দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্তের পর মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারের সুযোগ দেয়া না দেয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে তৎকালীন কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন। প্রাথমিকভাবে মন্ত্রী-এমপিদের নাম উল্লেখ না করে সরকারি সুবিধাভোগীদের প্রচারের (সরকারি যানবাহন, প্রচারযন্ত্র বাদ দিয়ে) সুযোগ করে দিয়ে খসড়া তৈরি করে। এ নিয়ে তুমুল সমালোচনার মধ্যে সরকারি সুবিধাভোগীদের সফর ও প্রচারণায় অংশ নেয়ায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আচরণবিধি চূড়ান্ত করা হয়। এ ধারাবাহিকতায় সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও মন্ত্রী-এমপিদের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আচরণবিধি করা হয়। এ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ দেখায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
ইভিএম নিয়ে বির্তক
নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা নিয়ে সবসময়ই বির্তক ছিল। গত ওয়ান ইলেভেনের এটিএম শামসুল হুদা কমিশন স্থানীয় নির্বাচনে ইভিএমের প্রচলন ঘটান। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহায়তায় প্রথমে ২০১০ সালে ৫৩০ ইভিএম মেশিন কেনা হয়। নির্বাচনে ব্যবহার করতে গিয়ে দেশের প্রধান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তুত করা ইভিএমে নানা যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। পরে ২০১১ সালে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) প্রস্তুতি করা ৭০০ ইভিএম কিনলেও এগুলো পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত ছিল না। হুদা কমিশন ২০১১ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচনে ২১নং ওয়ার্ডে বুয়েটের ইভিএম ব্যবহার করে। পরে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন, টাঙ্গাইল পৌরসভা ও নরসিংদী পৌরসভায় এ প্রযুক্তি ব্যবহার হয়।
পরে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রকিব উদ্দীন কমিশন দায়িত্ব নেয়। তাদের মেয়াদে রাজশাহী সিটিতে ২০১৩ সালে ইভিএম ব্যবহার করে পুরো বিতর্কের মধ্যে পড়ে যায়। তবে নতুন ইভিএমের প্রচলন চালু রেখে যায়। আর ফেব্রুয়ারিতে খান মো. নুরুল হুদার কমিশন দায়িত্বে এসে কমিটি করে পুরানো ইভিএমকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। নতুন প্রবর্তিত ইভিএমে রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ১৪১নং কেন্দ্রের ছয়টি কক্ষে ব্যবহার করে। কিন্তু পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত ছিল না। পুরানো ইভিএমের মতো ত্রুটি নিয়ে নির্বাচন শেষ করতে হয়। পরবর্তী সময় সুরক্ষিত ইভিএম তৈরিতে যত ধরনের সম্ভাব্য উপায় রয়েছে তা খতিয়ে দেখে মাঠে নেমে পড়ে ইভিএমের কারিগরি টিম।                             

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ