ঢাকা, রোববার 22 April 2018, ৯ বৈশাখ ১৪২৫, ৫ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়ার রায়ে নিরপেক্ষতা চায় যুক্তরাষ্ট্র

স্টাফ রিপোর্টার : সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায়ে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার আহ্বান পূনর্ব্যক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হওয়ার কারণে কারো কারাদ- হতে পারেনা বলেও মনে করে দেশটি।

২০১৭ সালের বার্ষিক মানবাধিকার রিপোর্ট প্রকাশ উপলক্ষে শুক্রবার ওয়াশিংটনের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ফরেন প্রেস সেন্টারে আয়োজিত এক বিশেষ ব্রিফিং এমন অবস্থানের কথা জানান স্টেট ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র এডভাইজর এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রম বিষয়ক ব্যুরো প্রধান এ্যাম্বেসেডর মাইকেল জি কোজাক।

বিশেষ ওই ব্রিফিংএ সদ্য প্রকাশিত রিপোর্টকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশী সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারী জানতে চান- আপনাদের রিপোর্ট অনুসারে ১৬২ জন ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। এমনিভাবে বছরের প্রথম ১০ মাসে ১১৮ জন বিচারবর্হিভূত হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেই চলেছে। গণতান্ত্রিক চর্চা সম্পর্কে বলা হয়েছে বিরোধীদের সভা-সমাবেশের অধিকার খুব সীমিত, বিশেষত প্রধান বিরোধীদল বিএনপি সমাবেশ করার সুযোগ পাচ্ছেনা। রিপোর্টে বলা হয়েছে বিগত ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন প্রধান বিরোধীদল বিএনপি বয়কট করেছে। মূলত শুধু বিএনপিই বয়কট করেনি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও বয়কট করেছে। কেনোনা যুক্তরাষ্ট্র, ইইউসহ সকলে নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল পাঠানো স্থগিত করে। আমরা তখনো দেখেছি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। যাকে একতরফা নির্বাচন হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রধান বিরোধী নেত্রী কারাগারে আটক রয়েছেন। এই বিষয়গুলো সার্বিক ভাবে আপনারা কীভাবে মূল্যায়ন করছেন? বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার হিসাবে দেশটিতে গণতন্ত্র প্রত্যাবর্তনে যুক্তরাষ্টের ভূমিকাই বা কি?

জবাবে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম শীর্ষ এই কূটনীতিক বলেন, আমার ধারণা আপনি রিপোর্টটি ভালো করে পড়েছেন। আজকে প্রকাশিত রিপোর্টটি গত ক্যালেন্ডার বছরের রিপোর্ট। যার মধ্যে ওই সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। এর পরে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। যা আপনিও বলেছেন। আগামী বছরের রিপোর্টে তা উঠে আসবে। মাইকেল কোজাক বলেন, নির্বাচন আসন্ন। আমরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছি এবং যা হতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে।

অবাধ প্রতিযোগিতা, উন্মুক্ততা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এটি একটি উপায়। আমরা ক্রসফায়ারের ঘটনা নিয়ে প্রতিনিয়ত সরকারের সঙ্গে কথা বলছি। এটি সাধারণত একটি বিতর্কের বিষয় যা কিনা একটি বৈধ সামরিক কর্মকা-ের মধ্যে ক্রসফায়ারে নিহত হয়। কিন্তু এটা আমাদের উদ্বেগের বিষয়। আমরা এই বিষয়ে মানুষদের সাথে কথা বলি।

আরেকটি বিষয় যা বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, যদি আমাদের কাছে তথ্য থাকে যে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিট ক্ষমতার অপব্যবহার করছে তখন আমরা প্রশিক্ষণ ও সরজ্ঞামাদি প্রদান বন্ধ রাখি। যতক্ষণ না সরকার অপরাধীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসে।

খালেদা জিয়ার কারাদ- প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মাইকেল কোজাক বলেন, জিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচারের আহ্বান আমরা জানিয়েছি এবং শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হওয়ার কারণে কারো কারাদ- হতে পারে না।

তিনি বলেন, আমরা নানা উপায়ে মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করি। একেক দেশে একেক রকম ব্যবস্থা নেয়া হয়। যেমন- বিবৃতি প্রদান, সরঞ্জামাদি প্রদান না করে এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় উত্সাহিত করা। কখনও কখনও লোকেদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যাতে তারা তাদের মানবাধিকার কর্মক্ষমতা উন্নত করে। সুতরাং সার্বিকভাবে নানা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে আমরা সমস্যা সমাধানের পথে অগ্রসর হচ্ছি। তবে রিপোর্ট সমস্যা সম্পর্কে, সমাধান সম্পর্কে নয়।

রোহিঙ্গদের মানবিক বিপর্যয় ও যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান থাকা সত্তেও মিয়ানমার সরকারের আন্তর্জাতিক চাপ অগ্রাহ্য করার বিষয়ে বাংলাদেশী সাংবাদিক শিহাব উদ্দিন কিসলুর করা অপর এক প্রশ্নের জবাবে এ্যাম্বেসেডর মাইকেল বলেন, নিঃসন্দেহে এটা এথনিক ক্লিনজিং বা জাতিগত নিধন। ভয়াবহতম বিপর্যয়। এখান থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নেই। আমরা ইতোমধ্যে এই ঘটনায় দায়ী সিনিয়র জেনারেলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছি। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির জন্য করণীয় সকল কিছুই যুক্তরাষ্ট্র করবে উল্লেখ করে বিপুল সংখ্যক শরণার্থী গ্রহণ করায় বাংলাদেশের উদারতার প্রশংসা করেন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র এই নীতিনির্ধারক।

মানবাধিকার লংঘন ও সভা-সমাবেশের অধিকার সংকুচিত 

বাংলাদেশে বিচারবর্হিভূত হত্যাকা-, গুম, অপহরণ, নির্যাতন আর বে-আইনী গ্রেফতার থামছে না। দেশটিতে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাধীন কর্মকা- পরিচালানার সুযোগ সংকুচিত করা হয়েছে। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত মানবাধিকার প্রতিবেদন-২০১৭ এর বাংলাদেশ অংশে এ তথ্য উঠে এসেছে। রিপোর্টে বাংলাদেশে চলমান গুম, অপহরণ, বিরোধী নেতাকর্মীদের উপর দমন-নিপীড়ন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নির্যাতন, স্বাধীন মত প্রকাশ বাধা ও শ্রম অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত চিত্র তোলে ধরা হয়।

রিপোর্টে বলা হয়, সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ একটি উদার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলেও দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ একটি নির্বাচনে পুননির্বাচিত হয়ে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকার দেশ পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে চলমান আইনের শাসনের কড়া সমালোচনা করে রিপোর্টে বলা হয়, দেশটিতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত হত্যাকা- বা ক্ষমতার অপব্যবহারের খুব অল্পই আমলে নেয় সরকার।

এতে বলা হয়, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা হারিয়ে গেছে। আর তাই কোনো সন্ত্রাসীকা- নিয়ে কোনো অভিযোগও তারা করতে উৎসাহ বোধ করেনা। সরকার ও তার সহযোগীরা বিচারবর্হিভূত হত্যাকা-ে জড়িত অভিযোগ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির সংবিধানে জীবনের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এমন অসংখ্য প্রতিবেদন রয়েছে যেগুলো প্রমাণ করে যে, বিচারবর্হিভূত হত্যাকা-ে সরকার ও তার সহযোগিরা জড়িত।

এতে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অভিযান বা গ্রেফতারের সময় সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সরকার এগুলোকে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অভিযানের সময় সংঘটিত ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ বা পাল্টা হামলার ফল উল্লেখ করে তা ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করে। মানবাধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম এগুলোর অধিকাংশই বিচারবর্হিভূত হত্যা হিসেবে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে রিপোর্টে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের হাতে ক্রসফায়ারে ১৬২ জন নিহত হয়েছে। তবে অধিকার বলছে, বছরের প্রথম ১০ মাসে নিহত হয়েছে ১১৮ জন।

বাংলাদেশে চলমান গুমের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে মানবাধিকার রিপোর্টে বলা হয়, মানবাধিকার সংস্থা আর গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে দেশটিতে গুম এবং অপহরণ চলমান রয়েছে। এর অনেকগুলো আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সংস্থাসমূহের দ্বারা ঘটে থাকে। এধরনের অপরাধ দমন কিংবা তদন্তে সরকারে নেয়া ভূমিকা নামকাওয়াস্থে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে গত বছর ৬০ জনকে গুম করা হয়।

অপহরণের চিত্র তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ২০১৬ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত তিন বিরোধী নেতার ছেলেদের আটক করে। এর মধ্যে এর মধ্যে হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে ছেড়ে দিলেও এখনো নিখোঁজ মির আহমেদ বিন কাশেম ও আমান আযমী। ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা তাদের এক রিপোর্টে জানায় ৪০ জনকে গুম করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে বে-আইনী গ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে।

খালেদা জিয়ার মতো নেত্রীর বিরুদ্ধেও মতপ্রকাশের জন্য বিগত বছরে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ বলছে, সরকার শুধু সন্দেহভাজন জঙ্গিদের গুম করছে না একি সঙ্গে গুম করছে সুশীল প্রতিনিধি এবং বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদেরও। বাংলাদেশে মুক্ত মত প্রকাশ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্টে।    

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ