ঢাকা, রোববার 22 April 2018, ৯ বৈশাখ ১৪২৫, ৫ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কেসিসি’র ২৮৯টি ভোট কেন্দ্র পাহারায়  থাকবে পাঁচ হাজার পুলিশ

 

খুলনা অফিস : খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত রাখতে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পক্ষ থেকে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, পলাতক আসামী গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে এ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।  শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে এ অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযান টানা ১০দিন অর্থাৎ ৩০এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। এরপর দুই-তিন দিন বিরতি দিয়ে আবার শুরু হয়ে ১৫মে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত চলবে। এদিকে খুলনার ২৮৯টি ভোট কেন্দ্র পাহারা দেয়ার জন্য পাঁচ হাজার পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী ২৪ এপ্রিল প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ করার পরপরই প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী প্রচারণায়  নেমে পড়বেন। নির্বাচনী প্রচারণা ও ভোটের আগের দিন এবং ভোটের দিন সন্ত্রাসী অস্ত্রধারীরা বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে প্রতিপক্ষ প্রার্থী ও ভোটারদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে প্রভাবিত করতে পারে এমন অনুমানের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হবে। সকল প্রার্থী তাদের নির্বাচনী প্রচারণা ও ভোটাররা যাতে নির্বিঘেœ ভোট প্রদান করতে পারে সে লক্ষ্যে কেএমপির পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সন্ত্রাসী অস্ত্রধারীদের কারণে নির্বাচন যাতে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সে লক্ষ্যে প্রাণান্ত চেষ্টা চালাবে কেএমপি। বিশেষ অভিযানের পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন প্রবেশদ্বারে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, জিরোপয়েন্ট, রূপসা ঘাট, জেলখানা ঘাট, আইডব্লিউটিএ ঘাট, পথের বাজার, আড়ংঘাটা বাইপাস রোড, খালিশপুরের বিভিন্ন ঘাট এলাকা। সূত্র জানায়, নগরীর আটটি থানা যথাক্রমে খুলনা সদর, সোনাডাঙ্গা, খালিশপুর, দৌলতপুর, খানজাহান আলী, আড়ংঘাটা, হরিণটানা ও লবণচরা থানা এলাকায় নিয়মিত যে ফোর্স রয়েছে সেখানে আরও বেশি ফোর্স নিয়োগ দেয়া হয়েছে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করার জন্য।

অপরদিকে আগামী ১৫মে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন উপলক্ষে নগরীর ২৮৯ ভোট কেন্দ্রে নিñিদ্র নিরাপত্তা দিতে পাঁচ হাজার পুলিশ মোতায়েন থাকবে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে দুই থেকে আড়াই হাজার পুলিশ সদস্য এবং অবশিষ্ট পুলিশ সদস্য অন্যান্য জেলা থেকে এনে প্রয়োজন মেটানো হবে। পুলিশের সাথে আনসার সদস্যরা থাকবেন সহায়তায় এবং বিজিবি স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে। এছাড়াও থাকবে র‌্যাবের টহল। নির্বাচনে কোনো প্রকার সহিংসতাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে কেএমপির সূত্রে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষ পুলিশ সুপার (সিটিএসবি) রাশিদা বেগম বলেন, কেসিসি নির্বাচন উপলক্ষে শুক্রবার থেকে নগরীর আট থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযানে সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, পলাতক আসামী ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের গ্রেফতার করা হবে। এছাড়া আগামী ১৫মে খুলনার ২৮৯টি ভোট কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণের লক্ষ্যে পাঁচ হাজার পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ ও সাধারণ ভোট কেন্দ্র হিসেবে চি‎িহ্নত কেন্দ্রগুলোতে কতজন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবে তা’ এখনো নিশ্চিত হয়নি। কোন ভোট কেন্দ্রে কত সংখ্যক পুলিশ থাকবে তা’ আগামী ২৬ এপ্রিল নির্বাচন অফিসারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভার পর ঠিক হবে।

ইতোমধ্যে ২৮৯টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ২২৬টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৬৩টি কেন্দ্রকে সাধারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে কেএমপির পক্ষ থেকে ২২৬টি আসনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে পাঁচ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী মেয়র প্রার্থীরা হলেন, আওয়ামী লীগ মনোনীত দলের খুলনা মহানগর সভাপতি ও সাবেক এমপি তালুকদার আব্দুল খালেক, বিএনপি মনোনীত দলের মহানগর সভাপতি ও সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জাতীয় পার্টি মনোনীত দলের মহানগর সদস্য সচিব এস এম শফিকুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত দলের মহানগর সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা মুজাম্মিল হক ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) মনোনীত দলের মহানগর সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বাবু। সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৩১টি ওয়ার্ডে ১৮১জন এবং সংরক্ষিত ১০টি নারী কাউন্সিলর পদে ৪৪জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ২৮৯টি ভোট কেন্দ্রে চার লাখ ৯৩হাজার ৯৩জন ভোটার ভোট দেবেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৪৮ হাজার ৯৮৬ জন এবং নারী ভোটার দুই লাখ ৪৪হাজার ৭জন। নির্বাচনে ২৮৯টি ভোট কেন্দ্রে ভোট কক্ষ থাকবে এক হাজার ৫৬১টি এবং ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা থাকবেন ৪ হাজার ৯৭২জন।

৩৪ কাউন্সিলর প্রার্থীর নামে মামলা বিচারাধীন : খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে যাচাই-বাছাই শেষে ২২৩ প্রার্থীকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বশিক্ষিত বা স্বাক্ষর করতে পারেন এমন প্রার্থীর সংখ্যা ৪৪ জন। স্নাতক ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী ৫৬ জন। আর ৩৪ জনের নামে হত্যাসহ নানা মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সাধারণ কাউন্সিলর পদে থাকা ১৮২ জনের অধিকাংশই ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ঠিকাদারির সঙ্গে যুক্ত। নির্বাচন অফিসে জমা দেয়া হলফনামা থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। হলফনামা পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে, সাধারণ ওয়ার্ডের ১৮২ জন কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে ৯ জন মাস্টার্স, ৩৮ জন স্নাতক, ৩৩ জন এইচএসসি, দু’জন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী, ৩৮ জন এসএসসি, দু’জন দশম শ্রেণি, একজন নবম শ্রেণি, ১৯ জন অষ্টম শ্রেণি, দু’জন সপ্তম শ্রেণি, একজন পঞ্চম শ্রেণি, ৩৭ জন স্বাক্ষর করতে পারেন। ৩২ জনের নামে হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

আর সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৪১ প্রার্থীর মধ্যে তিন জন মাস্টার্স, ছয় জন বিএ, তিন জন এইচএসসি, ছয় জন এসএসসি, ১৩ জন অষ্টম শ্রেণি, একজন সপ্তম শ্রেণি, একজন পঞ্চম শ্রেণি, সাত জন স্বাক্ষর করতে পারেন। আর দুই জনের নামে আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

কেসিসি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার ও খুলনা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ইউনুস আলী বলেন, যাচাই-বাছাই শেষে ত্রুটিপূর্ণ, আপত্তিকর তথ্য-উপাত্ত থাকা, ঋণখেলাপি, আয়কর রিটার্ন সমস্যা থাকা, অসম্পূর্ণ মনোনয়নপত্র, মামলায় পলাতক থাকাসহ বিভিন্ন জরুরি বিষয়গুলো যাচাই করার পর এসব প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। ২৩ এপ্রিল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার শেষে ২৪ এপ্রিল প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। তারপরই নির্বাচনি প্রচারে নামতে পারবেন প্রার্থীরা, যা ১৩ মে পর্যন্ত অব্যাহতভাবে চলবে। প্রচারের সময় অবশ্যই প্রার্থীদের নির্বাচনি আচরণবিধি অনুসরণ করতে হবে। কারণ, মাঠে ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের কোনও অভিযোগ বা প্রমাণ দৃশ্যমান হলেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সেখানে তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ নেবেন।

ইশতেহারে প্রধান্য পাবে জলাবদ্ধতা ও যানজট : খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে প্রার্থীরা এখন ব্যস্ত আছেন নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করতে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দু’দলের মেয়র প্রার্থীদের ইশতেহারে প্রাধান্য পাচ্ছে জলাবদ্ধতা, যানজট নিরসন, মশক নিধন, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ খাল দখলমুক্ত করা, রাস্তাঘাট নির্মাণসহ নানা বিষয়। এ কাজে নাগরিক নেতাদের পরামর্শও নিচ্ছেন তারা। মূলত প্রতীক বরাদ্দের পরই ইশতেহার ঘোষণার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রচারে নামবেন মেয়র প্রার্থীরা।

২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক ২৪ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন। ওই ইশতেহারে নাগরিক পরামর্শ সভা, সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত করা, রাস্তাঘাট উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলাবদ্ধতা দূর করা, শিক্ষার সম্প্রসারণ, আইটি ভিলেজ স্থাপন, টাউন সার্ভিস চালু, ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন গুরুত্ব পায়। এবারের ইশতেহারেও এগুলোসহ কিছু নতুন বিষয় স্থান পাবে বলে জানা গেছে। যা ভোটারদের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটবে।

বিএনপি প্রার্থীর ইশতেহার তৈরির কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে। বর্তমান মেয়র ও নগর বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইশতেহার তৈরির কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে মনি তার ইশতেহারে ২১টি দফা ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওই ইশতেহারের মতো এবারও নাগরিক পরিকল্পনার প্রবর্তন, গুণীজন সংবর্ধনা, সড়ক উন্নয়ন ও বর্জ্য, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, ক্ষুদ্র যানবাহনের লাইসেন্স প্রদান, সিটি করপোরেশন এলাকা সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয় ঠাঁই পাচ্ছে। পাশাপাশি নতুন কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন,  ‘আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে। আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হলেই আমরা নাগরিকদের কাছে ইশতেহার তুলে দেব। খুলনার মানুষের প্রাণের দাবিগুলো ইশতেহারে স্থান পাবে।’

নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেছেন,  ‘প্রচার শুরুর প্রথমদিন ইশতেহার ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইশতেহারে চমক থাকবে। এজন্য আমাদের নেতারা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।’

প্রতীক বরাদ্দের আগেই প্রচারণায় উদ্বেগ : খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের আগেই নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা ও ভোট চাওয়ার ঘটনা নির্বাচন কমিশন উদ্বেগের সাথে মনিটরিং করছে। যা নির্বাচনী আচরণবিধির ৫ ধারার লঙ্ঘন বলে রিটার্নিং অফিসার জানিয়েছেন। এ অবস্থায় তিনি সকল প্রার্থী ও তার দল এবং প্রতিনিধিদের আচরণবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

রিটার্নিং অফিসার মো. ইউনুস আলী বলেন, পত্রিকার পাতায় প্রতিদিনিই বিভিন্ন দলের খবর ছবিসহ প্রকাশ হচ্ছে। তাদের কর্মকা-ের ব্যানারে দলীয় প্রতীক ব্যবহার ও নির্বাচনের নানা কথা থাকছে। সেখান থেকে নিজ পক্ষের প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্যও আহবান জানানো হচ্ছে। যা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আচরণ বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে তিনি মনে করেন। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আচরণবিধিমালার ৫ ধারায় (প্রচারণার সময়) বলা হয়েছে কোন প্রার্থী বা তাহার পক্ষে কোন রাজনৈতিক দল, অন্য কোন ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান প্রতীক বরাদ্দের পূর্বে কোন প্রকার নির্বাচনী প্রচার শুরু করিতে পারিবেন না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ