ঢাকা, মঙ্গলবার 24 April 2018, ১১ বৈশাখ ১৪২৫, ৭ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মোদিকে চমস্কিসহ ৬০০ শিক্ষাবিদের চিঠি

২৩ এপ্রিল, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি : ভারতে ধারাবাহিক যৌন নিপীড়নের ঘটনায় বর্তমান বিজেপি শাসিত সরকারকে দায়ী করেছেন ভারতসহ বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা ৬ শতাধিক শিক্ষাবিদ। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লেখা এক খোলা চিঠিতে তারা দাবি করেছেন, তার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর থেকেই ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ নারীদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করে তোলা হয়েছে। কাঠুয়া আর উন্নাহর সাম্প্রতিক ধর্ষণের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পক্ষে পর্যাপ্ত নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্বের খ্যাতনামা ওই শিক্ষাবিদেরা। খোলাচিঠিতে তারা এই পরিস্থিতির অবসান কামনা করেছেন।

ক’দিন আগে কাশ্মিরের কাঠুয়া ও উন্নাওতে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দায়ী করে গত সপ্তাহে তাকে চিঠি লিখেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীরা। এবার তাদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে মোদিকে খোলা চিঠি লিখেছেন ভারতসহ বিভিন্ন দেশের ৬৩৭ জন শিক্ষাবিদ। এদের মধ্যে অন্তত ২০০ জন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য আর অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। বিবৃতিদাতাদের মধ্যে রয়েছেন খ্যাতনামা মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক ও রাজনীতিবিশ্লেষক নোম চমস্কি, ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নৃবিজ্ঞানী লিলা আবু লুঘোদ এবং আসামে জন্ম নেওয়া মার্কিন ইতিহাসবিদ প্রসেনজিত দুয়ারার মতো বুদ্ধিজীবী।

বিভিন্ন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত চিঠিটির অনুলিপি থেকে জানা যায়, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সাউথ ব্লকের ঠিকানায় ২১ এপ্রিল তারিখে ওই চিঠিটি লেখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে এতে বলা হয়েছে, ‘আমরা ভারতের এবং বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদ ও স্বাধীনধারার গবেষক। গত ১৬ এপ্রিল ৪৯ জন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী আপনাকে যে খোলা চিঠি দিয়েছিল তার সঙ্গে সংহতি জানিয়ে এবং তাদের অনুভূতিকে স্বীকৃতি দিয়ে আমরাও আপনাকে লিখছি।’

শিক্ষাবিদেরা ওই চিঠিতে লিখেছেন, এসব সরকারি চাকরিজীবী এবং অগণিত ভারতীয় নাগরিক এবং ব্যাপক অর্থে বলতে গেলে বিশ্বের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আমরা কাঠুয়া ও উন্নাওয়ের ঘটনা এবং পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের গভীর ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশ করছি। তারা অভিযোগ তুলেছেন, দুটি জঘন্য ঘটনার ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর প্রশাসনের পক্ষ থেকে সন্দেহভাজনদেরকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা, পরবর্তীতে যুক্তি প্রয়োগ, বিচ্যুতি ও ভিন্ন খাতে প্রবাহের জন্য গভীর অপচেষ্টা চালানো হয়েছে; যার প্রমাণ মিডিয়ায় আপনার মুখপাত্রের দেওয়া প্রতিক্রিয়া থেকেই পাওয়া যায়। ‘সর্বশেষ আপনি দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে সম্প্রতি যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তা অপর্যাপ্ত, ছকবদ্ধ এবং এতে ঘটনার শিকার হওয়াদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিতের সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা নেই।’ বলা হয়েছে ওই চিঠিতে।

শিক্ষাবিদেরা তাদের চিঠিতে বলেছেন, কাঠুয়া এবং উন্নাওয়ের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়, দলিত, আদিবাসী ও নারীদের নিশানা করে হামলা চালানোরই ধারাবাহিকতা এটি। ২০১৫ সালে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে, জম্মু কাশ্মিরের উধামপুরে, ২০১৫-২০১৬ সালে ছত্তিশগড়ের বিজাপুর ও সুকমাতে, ২০১৬ সালে মধ্যপ্রদেশের হারদাতে, ২০১৬ সালে ঝাড়খন্ডের লাতেহারে, ২০১৬ সালে গুজরাটের উনাতে, ২০১৭ সালে হরিয়ানার রোহটাকে, ২০১৭ সালে দিল্লিতে, একই বছর উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে এবং এখন জম্মু কাশ্মির ও উত্তর প্রদেশে ধারাবাহিকভাবে ছড়িয়ে পড়া ঘটনায় গো রক্ষক এবং অন্যরা ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নকে সহিংসতার হাতিয়ার করেছে। তাদের অভিযোগ, ‘এসব ঘটনার বেশিরভাগই সংঘটিত হয়েছে বিজেপি শাসিত রাজ্যে।

প্রায় সবগুলো ঘটনাই সংঘটিত হয়েছে বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর। আমরা বলছি না আপনার দলই এইসব সহিংস ঘটনা ঘটিয়েছে। আমরা বলছি না, রাজ্য সরকারগুলো আপনার দলের মদদেই এসব ঘটিয়েছে। তবে এইসব ঘটনায় বিজেপির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপরিহার্য সংযোগ অস্বীকার করার উপায় নেই।’

ওই শিক্ষাবিদদের মতে, সমাজের পিছিয়ে পড়া ও দূর্বল অংশকে সহায়তা করার বিষয়টি সরকারের যথেষ্ট মনোযোগ পেয়েছে; এমন আলামত নেই বললেই চলে। জঙ্গল এবং এর সম্পদে আদিবাসী ও যাযাবরদের যৌথ  অধিকার, কিংবা [জঙ্গলে তাদের অধিকার বিষয়ক] আইন লঙ্ঘনকে নিরুৎসাহিত করার মতো সুরক্ষামূলক কোনও পদক্ষেপও নিতে দেখা যায়নি।

চিঠিতে ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল এলাহাবাদ হাইকোর্টের এক পর্যবেক্ষণকে উদ্ধৃত করে বলা হয়: “এটি যদি রাজ্য পুলিশের আচরণ হয়, তবে অভিযোগ দায়েরের জন্য ঘটনার শিকার ব্যক্তি কার কাছে যাবে? আপনারা যদি বার বার এ অবস্থান নেন তবে আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বলতে বাধ্য হব যে রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে।”

শিক্ষাবিদরা লিখেছেন, ‘আমরা আপনাকে এ চিঠি লিখছি নিজেদের দায়িত্ববোধের পরিসর থেকে। যেন নীরবতার অপরাধে আমরা অপরাধী হয়ে না পড়ি। যেন এই শিশুর ক্ষতবিক্ষত শরীর আর ধর্ষণের শিকার হওয়া আরেক তরুণীই নিপীড়নের সবশেষ উদাহরণ হয়।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ