ঢাকা, মঙ্গলবার 24 April 2018, ১১ বৈশাখ ১৪২৫, ৭ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হতাশা-বঞ্চনা থেকে কোটাবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে

জিবলু রহমান : [চার]
এখন রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দিয়ে যেভাবে সংস্কারের দাবিকে মোকাবিলা করা হলো, তাতে করে ভবিষ্যতে এ নিয়ে আরও অসন্তোষের পথকেই উন্মুক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বিভক্ত দেশে আরও একধরনের বিভক্তির সুযোগ থেকে ক্ষমতাসীনেরা হয়তো লাভবান হবেন বলেই মনে করছেন; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে দেশের জন্য তা যে ইতিবাচক হবে না, সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়...।’ (সূত্র : চাকরিতে কোটা বাতিল নয়, সংস্কারেই সমাধান, আলী রীয়াজ, দৈনিক প্রথম আলো ১৪ এপ্রিল ২০১৮)
আওয়ামী সমর্থিত দৈনিক সমকালে শেখ রোকন লিখেছেন, (কোটার কাচঘরে আ’লীগের লাভ-ক্ষতি, ১২ এপ্রিল ২০১৮) ‘... আন্দোলনটি গড়ে উঠেছিল নিছক সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে। প্রতিবছর কয়েক লাখ করে শিক্ষিত তরুণ দেশের কর্মবাজারে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। এর মধ্যে একটি বড় অংশ অবতীর্ণ হয় সরকারি চাকরি, বিশেষত সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে গৃহীত ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন সংস্থার চাকরি প্রতিযোগিতায়। কমবেশি ৫৬ শতাংশের বেশি বিভিন্ন কোটার জন্য নির্ধারিত থাকায়, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী অনেকে পরীক্ষায় ভালো করেও শেষ পর্যন্ত সোনার হরিণের দেখা পায় না। তাদের ক্ষোভ এই কোটা পদ্ধতির ওপর গিয়ে জমা এবং ক্রমে অন্যদের মধ্যেও সংক্রমিত হচ্ছিল। ফলে মাঝেমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটা পদ্ধতির সংস্কার নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলে আসছিল। এ বছরের শুরু থেকে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ ব্যানারে শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নানা কর্মসূচি।  ৮ এপ্রিল তারা ‘ঐতিহাসিক’ শাহবাগ মোড়ে অবস্থান গ্রহণ করে। রাতে পুলিশ তাদের পিটিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর আন্দোলন ও কর্মসূচি ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন দানা বাঁধা এবং তা ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা নতুন নয়। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলন, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তো আমাদের ইতিহাসেরই অংশ।
আন্দোলনকারীদের আরেকটি সাফল্য তারা সব মতের লোকজনকে নিজেদের দাবির যৌক্তিকতা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যুক্তি দিয়েই। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক সমিতি তাদের দাবির যৌক্তিকতা মেনে নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিও দিয়েছে। এমনকি এই আন্দোলনের ডামাডোলে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন আক্রান্ত হয়েছিল, তিনিও ১১ এপ্রিল রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সহমত প্রকাশ করে। তিনি বলেছেন, ‘কোটা সংস্কারের খুবই প্রয়োজন আছে, আমরা বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানিয়েছি।’
দুর্ভাগ্যবশত, আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা বা মন্ত্রী কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিশেষ চরিত্র ও শক্তি অনুধাবনে অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। এর সংবেদনশীলতা ও স্পর্শকাতরতা ধরতে পারেননি। তাদের বক্তব্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের যেমন বিক্ষুব্ধ করেছে, তেমনই আহত করেছে সাধারণ নাগরিকদেরও...।’
দীর্ঘ দিনের আওয়ামী বঞ্চনা-নির্যাতন-দখলের বিরুদ্ধে তারুণ্যের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে আওয়ামী মিথ্যাচার মিডিয়ার অবজ্ঞার মুখে শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে।  আওয়ামী লীগের নেতারাও দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি চাকরির কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণায় বিএনপির ষড়যন্ত্র ভেস্তে গেছে। আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ ১২ এপ্রিল ২০১৮ এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ত্বরিৎ ঘোষণায় বিএনপির চক্রান্ত ভন্ডুল হয়ে গেছে। এবার বিএনপি চেয়েছিল আন্দোলনকে সহিংস রূপ দিতে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঘিরে সারাদেশে নাশকতা ও তান্ডব চালাতে। মওদুদ আহমেদ সাহেবরা কোটা অন্দোলনকে পুঁজি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লাভ হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরকারের জয় হয়েছে। বিএনপি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।’ (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক ১৩ এপ্রিল ২০১৮)
আসিফ নজরুল লিখেছেন, ‘আমাদের সংবিধানে আছে, মানুষে-মানুষে বৈষম্য করা যাবে না। নারী-পুরুষে বৈষম্য করা যাবে না, ধর্ম-বর্ণভেদে করা যাবে না। আমাদের সংবিধানপ্রণেতারা জন্মস্থানভেদে বৈষম্যও নিষিদ্ধ করে গেছেন। সে অনুযায়ী, দেশের কোনো বিশেষ জেলায় জন্মস্থান হলে কেউ বাড়তি সুবিধা পেলে তা হবে অন্যদের জন্য বৈষম্য। সংবিধান অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে অনগ্রসর (সংবিধানের ভাষায় পশ্চাৎপদ) মানুষের জন্য রাষ্ট্রকে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে বলেছে। যেমন নারীদের জন্য সরকারি চাকরিতে কোটার ব্যবস্থা। তবে সেটিও বলেছে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, অর্থাৎ তাঁদের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত। অথচ বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। আমাদের দেশে সরকারি চাকরিতে কোটার ব্যবস্থা আছে এমন বহু মানুষের জন্য, যাঁরা কোনোভাবেই অনগ্রসর মানুষ হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন না। এই কোটাও আবার এত বেশি হারে (মোট চাকরির ৫৫ শতাংশ), যার নজির কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কোটা নিয়ে তাই মাঝে মাঝেই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এ দেশের তরুণ সমাজে। নানান যুক্তি দেখিয়ে কোটার পক্ষে দাঁড়ানোর কিছু মানুষও আছে সমাজে। কিন্তু এদের এসব যুক্তির কোনো সারবত্তা নেই সংবিধান, ন্যায়নীতি বা বৈশ্বিক প্রবণতার মানদ-ে।
সংবিধানের ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে, নারী কিংবা সমাজের অনগ্রসর শ্রেণি হিসেবে ‘উপজাতিদের’ জন্য একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় কোটা থাকতে পারে। সংবিধানের ২৯ (৩) অনুচ্ছেদ নাগরিকদের ‘অনগ্রসর অংশের’ জন্য চাকরিতে বিশেষ কোটা প্রদান অনুমোদন করেছে, ‘অনগ্রসর অঞ্চলের’ জন্য নয়। ফলে জেলা কোটার সাংবিধানিক ভিত্তি নেই বলা যায়। সংবিধান অনুসারে মুক্তিযোদ্ধা কোটারও কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। সমাজের সব শ্রেণির মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে, তাই মুক্তিযোদ্ধারা, বিশেষ করে তাঁদের সন্তানেরা ঢালাওভাবে অনগ্রসর অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন না।
মুক্তিযোদ্ধা কোটার ক্ষেত্রে আরেকটি আপত্তি করা হয়-এতে জালিয়াতি বা দুর্নীতির সুযোগের কারণে। মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও টাকা বা সম্পর্কের জোরে ভুয়া সার্টিফিকেট জোগাড় করে সরকারি চাকরি বাগিয়ে নেওয়া সম্ভব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের। আর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা যে দেশে রয়েছে, তার একটি বড় প্রমাণ বিভিন্ন আমলে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি। এসব আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে কি না বা পরবর্তী সময়ে আরও যাঁদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে, তাঁরা আদৌ মুক্তিযোদ্ধা কি না, এই সংশয় কখনো দূর হয়নি।
১৯৭২ সালের সংবিধানে মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা সম্পর্কে কিছু বলা নেই। এই সংবিধান প্রণীত হয়েছিল যে গণপরিষদে, সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চাকরিতে কোটা প্রদানের কথা উত্থাপিত হয়নি। গণপরিষদে কেবল সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদের অধীনে নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান প্রসঙ্গে পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা ও নিহত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় (বাংলাদেশ গণপরিষদের বিতর্ক, দ্বিতীয় খ-, ১৯৭২, পৃষ্ঠা ৪৭০-১)। সামাজিক নিরাপত্তার উদার ব্যাখ্যা করলে শুধু পঙ্গু বা নিহত মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের জন্য চাকরিতে কোটা সংরক্ষণ তাই বৈধ হতে পারে, অন্যদের জন্য নয়।
বঙ্গবন্ধুর সময়ে অবশ্য ১৯৭২ সালে প্রণীত ইন্টেরিম (বা অন্তর্বর্তীকালীন) রিক্রুটমেন্ট পলিসিতে মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০ শতাংশ কোটার কথা বলা হয়। এটি ইন্টেরিম বলার মানেই হচ্ছে কোটা স্বল্পসময়ের জন্য প্রযোজ্য রাখার চিন্তা ছিল তখন। ১৯৭৭ সালে তৎকালীন পে ও সার্ভিস কমিশনের একজন বাদে বাকি সব সদস্য সরকারি নিয়োগে কোটাব্যবস্থার বিরোধিতা করেন। কমিশনের ওই সদস্য অবশ্য ১৯৮৭ থেকে পরবর্তী ১০ বছরে ধীরে ধীরে কমিয়ে তা বিলুপ্ত করার পক্ষে মত দেন। কিন্তু ১৯৯৭ সালেই এই কোটাব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারিত করে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের এর আওতাভুক্ত করা হয়, পরে তাঁদের পাওয়া না গেলে তাঁদের জন্য নির্ধারিত পদগুলো শূন্য রাখার নীতি গৃহীত হয়। আরও পরে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত করা হয় কোটাধারীদের স্বার্থে।
কোটাব্যবস্থার সমর্থকেরা অন্যান্য দেশেও কোটা আছে বলে যুক্তি দেখান। কিন্তু আমার জানামতে, আমাদের মতো ঢালাও কোটাব্যবস্থা অন্য কোথাও নেই। ভারতের উদাহরণ দিই। ভারতে কোটাপদ্ধতি পরিচিত রিজারভেশন বা সংরক্ষণ নামে। সেখানে সংবিধান অনুসারে শুধু তালিকাভুক্ত নিম্নবর্গ ও উপজাতি শ্রেণিদের জন্য সরকারি চাকরি, জনপ্রতিনিধিত্ব এবং উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কোটার ব্যবস্থা রয়েছে। পরে মানডাল কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে ১৯৯২ সাল থেকে সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক দিয়ে অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত পেশার মানুষের (যেমন কৃষিশ্রমিক, নাপিত, ধোপা ইত্যাদি) সন্তানদের জন্যও কোটার ব্যবস্থা করা হয়।
২০০৬ সালের এক জরিপ অনুসারে সুবিধাবঞ্চিত এসব মানুষ ভারতের মোট জনসংখ্যার ৪১ শতাংশ হলেও তাদের জন্য কোটা রাখা হয়েছে ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে শিডিউলড কাস্ট ও ট্রাইব জনগোষ্ঠী ২৯ শতাংশ, বিপরীতে কোটা রয়েছে ২২ শতাংশের মতো। সেই তুলনায় বাংলাদেশে নারী ও উপজাতি জনগোষ্ঠীর জন্য কোটার পরিমাণ কম হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে এটি অনেক বেশি। তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা দুই-আড়াই লাখ হলেও তাঁদের সন্তানদের জন্য সরকারি চাকরিতে কোটা রয়েছে ৩০ শতাংশ! ন্যায়পরায়ণতার স্বার্থে বাংলাদেশে কোটাব্যবস্থার সংস্কার আনা জরুরি। বর্তমান কোটাব্যবস্থায় শুধু যে বেসামরিক প্রশাসনের মান খর্ব হচ্ছে তা-ই নয়, এতে সমাজে চরম বৈষম্য ও অবিচার সৃষ্টি হচ্ছে-যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে দেশের জন্য যুদ্ধাহত ও নিহত হয়েছেন।
এসব মুক্তিযোদ্ধাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে শুধু তাঁদের সন্তানদের জন্য সমানুপাতিক কোটা রাখার দায়িত্ব অবশ্যই রাষ্ট্রকে পালন করতে হবে। অন্যান্য কোটার মধ্যে জেলা কোটা বাতিল করা উচিত। নারী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কোটা অব্যাহত রাখা উচিত, প্রতিবন্ধীদের জন্য সীমিত কোটার ব্যবস্থাও সরকার করতে পারে। তবে কোনো বিচারেই কোটাধারীর সংখ্যা মোট নিয়োগের এক-তৃতীয়াংশের বেশি হওয়া উচিত হবে না।’ (সূত্র : সরকারি নিয়োগ-চাকরিতে কোটা বিরোধিতার যুক্তি, আসিফ নজরুল, দৈনিক প্রথম আলো ৫ মার্চ ২০১৮)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ