ঢাকা, মঙ্গলবার 24 April 2018, ১১ বৈশাখ ১৪২৫, ৭ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রদর্শনের ভালোবাসার অবসান চাই

সাকি : সাত আট মাসের ফুটফুটে মেয়েটি বসে বসে খেলছে পাশে বসে আছে মেয়েটির ফুপু, কিছুদিন হলো মেয়েটি ঠিকমত বসতে শিখেছে, হাত পা নেড়ে নেড়ে এটা ওটা ধরতে চায়, ধরে.. ফেলে দেয়, মেয়েটির বাবা অনেকক্ষন ধরে দেখছিলেন আর আনন্দে বুক ভরে যাচ্ছিল, মেয়েটির খিলখিল হাসিতে বাবার আনন্দ বাধ ভাঙলো এবার তিনি কাছে গিয়ে মেয়েটাকে বুকে জরিয়ে নিলেন, কোলে তুলে আদর করছেন এমন সময় পিছন থেকে মেয়েটির দাদি ঘরে ঢুকলেন আর তাতেই মেয়েটির বাবা লজ্জায় মেয়েকে রেখে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
যে মেয়েটির কথা বলছিলাম তিনি আমার বড় বোন, আমার বাবা মায়ের কোল আলো করা প্রথম সন্তান। হঠাৎ কেন ঘটনাটি বললাম? আবার বাবা মেয়েকে আদর করছেন এতে লজ্জা পাওয়ারই বা কি হলো? হ্যা এই ঘটনা বলার কারণ আছে, আমার বড় বোনের সাথে আমার বয়সের অনেক গ্যাপ, দু জন দু জেনারেশনের আর তাই সে সময়কার কথা তুলে ধরতেই ঘটনাটি বলা। সে সময় ভালোবাসার প্রকাশ আর এই সময়ে ভালোবাসার প্রকাশ যেন আকাশ পাতাল তফাৎ।
ভালোবাসা...
শব্দটা শুনলে আমাদের চোখে কোন দৃশ্য ভেসে আসে? ঠিক কোন ধরণের দৃশ্য, স্মৃতি বা অনুভুতি আমরা শব্দটার সাথে যুক্ত করি? সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা? আধো আধো বোলের টলোমলো পায়ের মেয়ের দিকে তাকানো বাবার বুকের ভেতরের অনুভূতিটা? মায়া-মমতা, দায়িত্ব, বিশ্বাস আর শ্রদ্ধার ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্ক? ভাই এর জন্য বোনের কিংবা বোনের জন্য ভাইয়ের হৃদয় নিংড়ানো অনুভুতি টা?
সত্যিকার অর্থে আপনি কি চোখ বুজলে এরকম কিছু দেখতে পান নাকি ভালোবাসার এমন ছবি যে ভালোবাসায় প্রথম চোখাচোখি, ক্যান্ডেল লাইট ডিনার, নানা লোকেশানে সেলফি, আর ফেসবুকের “কমপ্লিকেটেড রিলেশানশিপ” ? উত্তরটা মনে হয় আমাদের সবারই জানা। ভালোবাসা শব্দটার অনেক রকম অর্থ হয়। কিন্তু আজ আমরা যখন এ শব্দটা শুনি তখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একটা সংকীর্ণ, সীমাবদ্ধ ছবি আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।
বলছিলাম আমার বাবার কথা, আমার বাবা চাচা কিংবা তখনকার মানুষগুলো ভালোবাসতেন মন থেকে কিন্তু তার প্রকাশ থাকত কম আর এর রেশ টা রয়ে যেত বছরের পর পর বছর যা সম্পর্ক মযবুত রশিতে বেধে রাখত যা ছিড়ে যাবার বা হারিয়েহ যাওয়ার আশংকাতে কখনোই পড়ত না।কিন্তু আমাদের সময়ে যত্রতত্র ভালোবাসার অতিরিক্ত প্রকাশ কিন্তু তাতে মিশে আছে নানা আশংকা, হারাবার ভয় এবং দৃশ্যমান হাজারো লাখো দুর্ঘটনা....
কেন এমন হলো? আমাদের আর আমাদের পূর্বসুরীদের মধ্যে
ভালোবাসার এ সংজ্ঞায় তফাৎ কেন? দু প্রজন্মের হার্ট কি দুরকম? একটু চিন্তা করলেই এর উত্তর পেয়ে যাবো।এর কারন হচ্ছে আমরা ভালোবাসা শিখেছি বছরের পর বছর ধরে দেখা বলিউড-হলিউড মুভি, বাংলা নাটক-সিনেমা-টেলিফিল্ম আর সার্বিকভাবে মিডিয়া ও আধুনিক শিল্পের মাধ্যমে। প্রতিদিন ভালোবাসায় রং ঢং ঢেলেছেন হাল আমলের ঔপন্যাসিক, নাট্যকার আর চিত্রপরিচালকেরা। দশকের পর দশক ধরে আমাদের মাথার ভেতরে প্রদর্শনেচ্ছাই হলো রিয়েল ভালোবাসা এ ভাবধারা তৈরি করে দিয়েছে।
অন্যদিকে আমরাও খুশি মনে একে মেনে নিয়েছি। শুধু মেনে নিয়েছি এটুকুই না, এই "ভালোবাসা”-কেই আমরা অনেকে জীবনের মহান ও পবিত্র লক্ষ্যগুলোর একটি বানিয়ে নিয়েছি। কৈশোর ও যৌবনে পদার্পনের সময় এ “ভালোবাসা” পাবার আকাঙ্ক্ষা আমাদের কচি মনগুলোকে করে তুলছে অশান্ত। আর এর ফল আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
লাখো ঘটনার একটি বলি, ২০১৮ এর ১৪ ই ফেব্রুয়ারি তথাকথিত ভালোবাসা দিবসের দিন ভালোবাসার জন্য খুন হলেন নবম শ্রেনীর ছাত্র। এই হলো আজকের ভালোবাসার পরিনতি।আর একটু বলি প্রতিদিন খোদ রাজধানীতে আদালতের মাধ্যমে ডিভোর্স নিচ্ছে প্রায় অর্ধশত দম্পতি। আর এর কারণই হচ্ছে বর্তমান ভালোবাসার প্রদর্শনেচ্ছা। লোকদেখানো বৈচিত্র্যবিলাসী সম্পর্কের রেশ বেশীসময় স্থায়ী হয় না আর তার ফল স্বরূপ খুন, ধর্ষণ, আত্মহত্যা, রক্তারক্তি নিত্যকার ঘটনা হয়ে দেখা দিয়েছে।
আমরা এই লোকদেখানো ভালোবাসার মাধ্যমে তৈরি করছি অসুস্থ মানসিকতা আর বিকৃত রুচির এক বিপর্যস্ত প্রজন্ম।এর থেকে দ্রুত বের হয়ে না আসলে আমাদের ধংশ অনিবার্য। ভালোবাসা কখনোই লোকদেখানো প্রদর্শনেচ্ছার বিষয় নয়, ভালোবাসা আসে শ্রদ্ধা আর সম্মান থেকে এর জন্য প্রয়োজন নেই নির্দিষ্ট কোন দিন, ক্ষণ। পারিবারিক মূলোবোধ থেকে তৈরি হোক ভালোবাসা যা সমাজকে করবে স্থিতিশীল, পারিবারিক বন্ধন রাখবে অটুট আর রাষ্ট্রকে করবে সুস্থির সুশৃংখল আর শান্তিময়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ