ঢাকা, বুধবার 25 April 2018, ১২ বৈশাখ ১৪২৫, ৮ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এখনও থামেনি স্বজনদের আহাজারি

গতকাল মঙ্গলবার রানা প্লাজা ট্রাজেডি দিবসে নিহত শ্রমিকদের স্বজনরা জুরাইন কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন করে -সংগ্রাম

মোঃ শামীম হোসেন (সাভার সংবাদদাতা) : বহুল আলোচিত রানা প্লাজার ভবন ধস ট্রাজেডির পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনদের আহাজারি থামেনি। গতকাল মঙ্গলবার সকালে রানা প্লাজার সামনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। মঙ্গলবার ভবন ধসের ঘটনায় প্রিয় মানুষটির খোঁজে রানা প্লাজার সামনে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন আসিয়া বেগম। তার মেয়ে শিলা আক্তার রানা প্লাজার ৩য় তলায় নিউ ওয়েব বটমস লিঃ কারখানায় কাজ করতেন। নিজের প্রিয় মেয়ের লাশ এখনও পাননি তিনি। আসিয়ার মতো কুষ্টিয়ার শাহানা বেগমও তার মেয়ের লাশ খুঁজে পায়নি। রানা প্লাজার দুর্ঘটনা তার মেয়েকে কেড়ে নিয়েছে। তিনি জানান, মেয়ের লাশ দেখার সুযোগ না হওয়ায় রানা প্লাজার সামনে প্রতিবছরের এই দিনটিতে এখানে চলে আসেন তিনি।
আসিয়া ও শাহানা বেগমের মতো আরও অনেকেই তাদের পরিবারের প্রিয় মানুষটির এভাবে হারিয়ে যাওয়া মেনে নিতে পারেনি গত পাঁচ বছরেও। মঙ্গলবার সকাল থেকেই রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকের স্বজনেরা সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় জড়ো হতে থাকেন। এসময় ধসে পড়া রানা প্লাজার দিকে তাকিয়ে অঝোড়ে কাঁদতে দেখা যায় স্বজনদের। এসময় নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকের স্বজনেরা ভবন ধসের ঘটনায় দোষিদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও রানার ফাঁসির দাবি জানান।
এদিকে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ভবনটির মালিক  সোহেল রানার ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এসময় তারা রানার ফাঁসি ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। এসময় রানা প্লাজার সামনে নির্মিত অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকের স্বজনেরাও ওই স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। স্বজন ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের দেওয়া ফুলে ভরে যায় শহীদস্মৃতিস্তম্ভ। স্বজনদের আহাজারি আর আর্তনাদে ভারি হয়ে ওঠে  গোটা এলাকা। মিছিল শেষে রানা প্লাজার সামনে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে বিভিন্ন শ্রমিক নেতারা রানা প্লাজার ঘটনার দোষিদের শাস্তি ও সোহেল রানার ফাঁসির দাবি জানান।
গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু তাদের সংগঠনের ৫ দফা দাবি তুলে ধরে বলেন, ‘রানা প্লাজা ট্যাজেডির ৫ বছর অতিবাহিত হলেও এখনও শেষ হয়নি বিচার কাজ। কয়েক দিন আগে রানার মায়ের মাত্র ৬ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে, সেখানে রাজনীতি রয়েছে। এর মাধ্যমে রানার অপরাধের ধামাচাপা দেওয়ার পায়তারা চলছে। তবে বাংলাদেশের জনগণ এটা মেনে নেবে না।’ অবিলম্বে ভবন মালিক রানাসহ দোষিদের ফাঁসির দাবি জানান তিনি।
এছাড়া নিহত শ্রমিকদের স্বরণে শহীদ বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, গণফোরামের সভাপতি ড.কামাল হোসেন, বিশিষ্ট্য কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, তত্তাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সাভারের সংসদ সদস্য ডা.মোঃ এনামুর রহমান, সাভার পৌরসভার মেয়র আলহাজ্ব আব্দুল গণি। এসময় সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ রাসেল হাসান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রণব কুমার ঘোষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে রানা প্লাজার পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে নিহত ও আহত শ্রমিকদের স্বরণে সাভার অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে, রানা প্লাজার পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে রানা প্লাজার সামনে মোমবাতি প্রজ্জলন কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। সোমবার সন্ধ্যায় রানা প্লাজার সামনে শহীদ বেদীতে এ মোমবাতি প্রজ্জলন কর্মসূচি পালন করা হয়। মোমবাতি প্রজ্জলন কর্মসূচিতে এসময় রানা প্লাজার নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা অংশ গ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাজার বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় রানা প্লাজা ধ্বসে পড়ে। ভবনটির ধ্বংসস্তূপ থেকে ১ হাজার ১৩৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। আর এঘটনায় দুই হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। আহত হন দুই হাজারের বেশি শ্রমিক; যাদের অনেকে পঙ্গু হয়ে যান।
এ ঘটনায় সাভার মডেল থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) ওয়ালী আশরাফ ভবন নির্মাণে ‘অবহেলা ও অবহেলাজনিত’ হত্যার অভিযোগে মামলা করেন। দুই বছর পর ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন; মামলায় স্বাক্ষী করা হয় ৫৯৪ জনকে। স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাণঘাতী এ দুর্ঘটনার রেশ এখনও বয়ে চলছেন আহত শ্রমিক এবং হতাহততের পরিবারের সদস্যরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ