ঢাকা, বুধবার 25 April 2018, ১২ বৈশাখ ১৪২৫, ৮ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য বেআইনী -মির্জা ফখরুল

গতকাল মঙ্গলবার নয়াপল্টন বিএনপি কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: নাগরিকত্ব প্রত্যাহার বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘বেআইন’ অভিহিত করেছে বিএনপি। দলটি বলেছে, যুক্তরাজ্যে সাময়িকভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার সকালে দলের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, সরকার ও সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বক্তৃতা ও বিবৃতিতে এটা স্পষ্টতঃই প্রমাণিত হয় যে, দেশে তারেক রহমানের জীবন নিরাপদ নয়। এই অবস্থায় তিনি (তারেক রহমান) বিশ্বের অসংখ্য বরণ্য রাজনীতিবিদ, সরকার বিরোধী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতোই সাময়িকভাবে বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন এবং সঙ্গতকারণেই তা পেয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই তিনি যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র বিভাগে তার পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। সে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার পাসপোর্ট জমা রেখে তাকে ট্রাভেল পারমিট দেয়া হয়েছে। যখনই তিনি দেশে ফেরার মতো সুস্থ হবেন তখনই তিনি দেশের অন্যান্য নাগরিকের মতোই পাসপোর্টের জন্য আবেদন জানাতে এবং তা অর্জন করতে পারবেন। সেটি উনি ফেরত পাবেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা দৃঢ়তার সাথে স্পষ্টভাষায় দেশবাসীকে বলতে চাই, জননেতা তারেক রহমান জন্মসূত্রে বাংলাদেশের একজন গর্বিত নাগরিক। তিনি তার প্রিয় দেশের নাগরিক ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন ইনশাল্লাহ। ২০০৮ সালে সেপ্টেম্বরে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাওয়ার পর এই প্রথম বিএনপির পক্ষ থেকে তারেক রহমানের লন্ডনের অবস্থানের বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য জানানো হলো।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মির্জা ফখরুল বলেন, জন্মসূত্রে তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিক। ‘ জন্মসূত্রে’ নাগরিকের বিষয়টি আমাদের সংবিধানেও পরিষ্কার করে লেখা আছে যে জন্মসূত্রে যারা বাংলাদেশের নাগরিক তাদের নাগরিকত্ব কোনোভাবে অন্যকোনো জটিল অবস্থা না হলে সেটা যায় না। পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব এক বিষয় না। দেশের ১৬ কোটি মানুষের পাসপোর্ট নেই তাই বলে কি এই মানুষরা বাংলাদেশের নাগরিক না?
তারেক রহমানের পাসপোর্ট যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের মাধ্যমে লন্ডন হাই কমিশনে জমা দেয়ার একটি নথি দেখিয়ে বিনাভোটে ক্ষমতা দখলকারী সরকারের বর্তমান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তারেক রহমানের নাগরিত্ব বিষয়ে যে অদ্ভুত, যুক্তিহীন ও বেআইনি মন্তব্য করেছেন তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। কী কী কারণে একজন নাগরিক জন্মসূত্রে প্রাপ্ত নাগরিকত্ব হারাতে পারেন- এটাও যিনি জানেন না। তেমন একজন ব্যক্তির শুধু এই ধরনের অনির্বাচিত সরকারের মন্ত্রী পদেই থাকা সম্ভব এবং তা জাতির জন্য লজ্জ্বাজনক।
তিনি বলেন, স্রেফ রিটেনশন অর্থাৎ জমার জন্য বৃটিশ স্বরাষ্ট্র বিভাগ থেকে তার (তারেক রহমান) পাসপোর্ট যদি লন্ডন হাইকমিশনে পাঠানো হয়ে থাকে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে তার কোনো আইন বা যুক্তিতে প্রমাণিত হয় না যে, তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছেন। এই ধরনের উদ্ভট ধারণাকে তত্ত্ব কিংবা তথ্য হিসেবে সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন কিংবা ফেইসবুকে প্রচার রাজনৈতিক মূখর্তা ও উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।
বিএনপি মহাসচিব বলেন. তারেক রহমান মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশের তিন বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র শুধু নন, তিনি দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির সর্বোচ্চ একজন জনপ্রিয় নেতা। দেশের এই গর্বিত নাগরিকের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রলাপ বকা ও অপপ্রচার চালানো অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।
এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে যে আইনি নোটিশ দেয়া হয়ে, দেশের জনগণ তার জবাব জানার জন্য অপেক্ষা করছে। দেশের জনগণ যখন দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ও অব্যাহত উর্ধ্বগতিতে বিপর্যস্ত, গুম-খুন-চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ, শেয়ার বাজার ও ব্যাংক লুটেরাদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও দেশনেত্রী মুক্তি আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ ঠিক সেই সময়ে এসব অপরাজনীতি দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা জনগণের ক্ষোভের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেবে বলে আমরা মনে করি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলনে বৃটিশ স্বরাষ্ট্র বিভাগের যে চিঠি দেখিয়েছেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, দেশের জনগণ ক্ষোভের সাথে লক্ষ্য করেছে যে, তাদের কষ্টার্জিত বিপলু পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে লন্ডনে সফরকারী বিশাল বহরের একমাত্র অর্জন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সংগ্রহ করা তারেক রহমানের ২০০৮ সালে ইস্যু করা পাসপোর্টের তিনটি পাতা এবং বৃটিশ স্বরাষ্ট্র বিভাগের যা নিয়ে আমাদের যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে, সেই বিভাগের অসংখ্য ভুলে ভরা এক লাইনের রহস্যজনক একটি ফটোকপি। এই চিঠি নিয়ে যথেষ্ট রহস্য রয়েছে। কি বিচিত্র এই সরকার। কি দুর্বল তাদের অপকৌশল।
তিনি আরও বলেন, অবৈধ ফখরুদ্দিন-মঈন ইউ সরকারের নৃশংস রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে পঙ্গু অবস্থায় ২০০৮ সালে জামিনে তারেক রহমান লন্ডনে যান। পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় এখনো তিনি সেখানে অবস্থান করছেন। ইতোমধ্যে তার অনুপস্থিতিতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা মামলায় কারাদ- দেয়া হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব বলেন, সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে শুরু করে মন্ত্রী, নেতা-পাতি নেতারা প্রতিনিয়ত তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করছেন। কিন্তু, এসবের বিরুদ্ধে তারেক রহমানের জবাব যেন জনগণ শুনতে না পারেন, সেজন্য দেশের  প্রচার মাধ্যমে তার বক্তব্য প্রকাশ ও প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তারেক রহমানের আইনজীবী দলের আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যুক্তরাজ্যে যে এসাইলাম সিক করেছেন, সেই এসাইলামে বৃটিশ আইনের ১৭ ধারা মোতাবেক উল্লেখ আছে যে, পাসপোর্ট অথবা গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট কারো কাছে যাবে না। শুধুমাত্র যিনি হোল্ডার তার কাছে যাবে। অন্য কোনো থার্ড পার্টির কাছে যাবে না। অতত্রব পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যে দাবি করছেন পাসপোর্ট বাংলাদেশ হাইকমিশনে জমা দেয়া হয়েছে। এটা রহস্যজনক ও সন্দেহজনক। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট যে, বৃটিশ আইন অনুযায়ী তারেক রহমানের পাসপোর্টটা বাংলাদেশ হাইকমিশনে যাওয়ার কথা নয়।
এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তারেক রহমান সাহেবের নাগরিকত্ব ছেড়ে দেয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং ভবিষ্যতে নিঃসন্দেহ তিনি সরকারের নেতৃত্ব দেবেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলু, আবদুল আউয়াল মিন্টু, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
মহাসচিবের বিবৃতি: বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে সোমবার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি’র উদ্যোগে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে ব্যাপক লাঠিচার্জ ও গ্রেফতারের পাশাপাশি গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের উপরও চড়াও হয়। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ বাংলা টিভির রিপোর্টার আরমান এবং একজন ফটোগ্রাফারকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। যদিও পরবর্তীতে সাংবাদিকদের চাপের মুখে তাদেরকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। সাংবাদিকদের ওপর এই ন্যক্কারজনক আচরণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বর্তমান আওয়ামী সরকারের আমলে কেবলমাত্র বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরাই নয়, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের নিরাপত্তাও চরম হুমকির মুখে। সরকারের অপশাসন ও অন্যায় কর্মকান্ডের চিত্র জাতির সামনে তুলে ধরাকে বাধাগ্রস্ত করতেই বাংলা টিভির রিপোর্টার এবং একজন ফটোগ্রাফারকে আটক করে পুলিশ। একটা সরকারের নৈতিকতা ও মানবিকতার স্খলণ কতটা নিম্ন পর্যায়ে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এমন ন্যক্কারজনক আচরণ সংঘটিত করতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। একটা জাতির মুখপাত্র সাংবাদিকদের ওপর এমন আচরণে আবারও প্রমাণিত হয় যে, দেশে আইন-কানুনের বালাই নেই। গতকাল ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি’র শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিল থেকে বাংলা টিভির রিপোর্টার আরমান এবং একজন ফটোগ্রাফারকে গ্রেফতার ও থানায় নিয়ে যাবার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে সাংবাদিকদের ওপর এধরণের নিন্দনীয় আচরণ বন্ধের জোর দাবি করছি।”
অপর এক বিবৃতিতে রাজশাহী প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (রুয়েট) এর কর্মচারী ও রাজশাহী শ্রমিক দল নেতা আব্দুস সালামকে আওয়ামী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দ্বারা নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা, ধিক্কার ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমীর। বিএনপি মহাসচিব বলেন, অবৈধ রাষ্ট্রক্ষমতার জোরে বর্তমান সরকার তাদের লালিত সন্ত্রাসীদের দিয়ে বিরোধী মত ও আদর্শের নেতাকর্মীদের হত্যা করে রক্ত নিয়ে উল্লাসে মেতে উঠেছে। জনগণকে ভীত সন্ত্রস্ত রেখে আবারও প্রহসন ও জোর জবরদস্তির নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার লক্ষ্যেই প্রতিদিন বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদেরকে হত্যা, গুম, অপহরণের কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে বর্তমান নিষ্ঠুর সরকার। রাজশাহী প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (রুয়েট) এর কর্মচারী ও রাজশাহী শ্রমিক দল নেতা আব্দুস সালামও সরকারের সেই নিষ্ঠুর, বর্বর ও পৈশাচিকতার শিকার। এধরনের নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনার কী ভাষায় প্রতিবাদ জানাবো তা আমার জানা নেই। আমি অবিলম্বে আব্দুস সালামকে হত্যাকারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত আব্দুস সালামের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গ, আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ