ঢাকা, বুধবার 25 April 2018, ১২ বৈশাখ ১৪২৫, ৮ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হতাশা-বঞ্চনা থেকে কোটাবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে

জিবলু রহমান : [পাঁচ]
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগের এক অংশের সাথে আলোচনার পরও শিক্ষার্থীরা কেন আন্দোলন করলো-তা নিয়ে ১১ এপ্রিল ২০১৮ জাতীয় সংসদের প্রধানমন্ত্রী উম্মা প্রকাশ করেছেন। সরকারদলীয় সাংসদ জাহাঙ্গীর কবির নানকের বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘কয়েক দিন ধরে ইউনিভার্সিটিগুলোতে ক্লাস বন্ধ। পড়াশোনা বন্ধ। এরপর আবার ভিসির বাড়ি আক্রমণ। রাস্তাঘাটে যানজট। মানুষের কষ্ট। সাধারণ মানুষের কষ্ট। সাধারণ মানুষ বারবার কষ্ট পাবে কেন? এই বারবার কষ্ট বন্ধ করার জন্য, আর বারবার এই আন্দোলনের ঝামেলা মেটাবার জন্য কোটাপদ্ধতি বাতিল। পরিষ্কার কথা। আমি এটাই মনে করি, সেটা হলো বাতিল।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খুব দুঃখ লাগে যখন দেখলাম, হঠাৎ কোটা চাই না। কোট সংস্কারের আন্দোলন। আন্দোলনটা কী? লেখা পড়া বন্ধ করে দিয়ে রাস্তায় বসে থাকা। রাস্তায় চলাচল বন্ধ করা। এমনকি হাসপাতালে রোগী যেতে পারছে না। কর্মস্থলে মানুষ যেতে পারছে না। লেখাপড়া-পরীক্ষা বন্ধ করে বসে আছে। এ ঘটনা যেন সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল। ডিজিটাল বাংলাদেশ আমিই গড়ে তুলেছিলাম। আজকে ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইউটিউব, যা কিছুই ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলো তো আমাদেরই করা। আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষা দেব, সে শিক্ষা দিয়েছিলাম। কিন্তু গঠনমূলক কাজে ব্যবহৃত না হয়ে সেটা গুজব ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একটা ছেলের মাথায় আঘাত লেগেছে। হঠাৎ একজন স্ট্যাটাস দিয়ে দিল যে সে মারা গেছে। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমেয়ে সব বেরিয়ে গেল।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনকারীদের একটি দাবিতে বলা আছে, যেখানে কোটায় পাওয়া যাবে না, মেধা থেকে দেওয়া হবে। এটা তো হচ্ছে। আমার দুঃখ লাগে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো প্রফেসর বা অন্য বিশ্ববিদ্যালয় শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, তাঁরা আবার একই সুরে কথা বলছেন। তাঁরা দেখেনই নাই আমরা মেধাতালিকা থেকে নিয়োগ দিচ্ছি। না হলে ৭৭ ভাগ কোথা থেকে। কোটায় যারা পাচ্ছে, তারাও মেধাবী। তার মানে শতভাগ মেধাবী। তারপরও আন্দোলন। তাহলে ঠিক আছে, আজকে সকালে আমার কাছে যখন ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এল, আমরা তিন দিন ধরে ঘুমাতে পারছি না। এই  চৈত্রের রোদের মধ্যে ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় বসে আছে, এই রোদে বসে থাকলে তো তাদের অসুখ-বিসুখ হবে। রাস্তা বন্ধ করে রাখছে। এমনি তীব্র যানজট, রোগী যেতে পারছে না হাসপাতালে, গাড়িতেই মারা যাচ্ছে। কেউ অফিস-আদালতে যেতে পারছে না। জেলা কোটা আছে। জেলায় জেলায় যে ইউনিভার্সিটি, সেখানেও তারা রস্তায় নেমে গেছে। জেলায় যারা, তারাও চায় না। এরাও চায় না। তাহলে আমি বলে দিয়েছি বলো, কোনো কোটাই থাকবে না। কোনো কোটার দরকার নেই। ঠিক আছে, বিসিএস যেভাবে পরীক্ষা হবে, মেধার মাধ্যমে সব নিয়োগ হবে। এতে তো আপত্তি থাকার কথা নয়। আমরা কোনো শ্রেণি যাতে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে লক্ষ রেখে আমাদের সংবিধানে আছে, সেদিকে লক্ষ রেখে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, নারীরা-এখন দেখি মেয়েরাও নেমে গেছে রাস্তায়। ধরে নেব তারা কোটা চায় না। যখন আলোচনা হয়েছে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে, বৈঠকে বলে দিয়েছে তারা কোটা চায় না। আমি খুব খুশি। আমি নারীর ক্ষমতায়নে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা চায় না, তাহলে দরকারটা কী। কোটাপদ্ধতিরই দরকার নেই। যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, তাদের অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারব। এই আন্দোলন যারা করেছে, যথেষ্ট হয়েছে, এখন তারা ক্লাসে ফিরে যাক। ভিসির বাড়ি যারা ভেঙেছে, লুটপাট করেছে, লুটের মাল কোথায় আছে, কার কাছে আছে, ছাত্রদেরই তো বের করে দিতে হবে। যারা ভাঙচুরে জড়িত, তাদের অবশ্যই বিচার হতে হবে। ইতিমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। ছাত্র-শিক্ষকের সহযোগিতা চাই। এত বড় অন্যায় আমরা মেনে নিতে পারি না। এখনো শিক্ষক যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের সম্মান করি। গুরুজনকে অপমান করে প্রকৃত শিক্ষা হয় না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাত একটার সময় হলের গেট ভেঙে মেয়েরা বেরিয়ে এল। শুধু একটি গুজবের ওপর। সে ছেলে যখন বলল আমি মরি নাই, বেঁচে আছে, তখন তাদের মুখটা থাকে কোথায়। এই স্ট্যাটাসটা কে দিল? কেন দেওয়া হলো। এই যে মেয়েরা বেরিয়ে এসেছে, অঘটন ঘটলে কে দায় নিত। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক হলো ভিসির বাড়িতে আক্রমণ। আমরা তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। সব আন্দোলনে সেখানে ছিলাম। স্কুল-কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি আন্দোলন করতে। কখনো ভিসির বাড়িতে গিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ভাঙচুর করতে পারে, সে ভাঙচুরটা কী? ছবি দেখে মনে পড়ছিল ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যেভাবে আমাদের ৩২ নম্বরে ভাঙচুর করেছিল, ঠিক একই কায়দায়। এমনকি লকার ভেঙে গয়নাগাটি চুরি করা, টাকাপয়সা চুরি করা থেকে শুরু করে বাথরুমের কমোড খুলে রাখা, ভেঙে চুরমার করে দেওয়া। ভিসি, তাঁর স্ত্রী, ছেলেমেয়ের ওপর আঘাত পর্যন্ত করতে গিয়েছিল। যদিও অন্য ছেলেরা তাঁকে বাঁচিয়েছে। ছেলেমেয়েদের ভয়ে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে তাদের। একতলাদোতলা সব তছনছ। শুধু তা-ই নয়, তারা ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সিসি ক্যামের ভেঙেছে। রেকর্ডিং বক্সটা পর্যন্ত সরিয়ে নিয়ে গেছে। কত পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না বা ছাত্র বলে আমি মনে করি না। কারণ কোনো শিক্ষার্থী তার শিক্ষককে এভাবে অপমান করতে পারে না, আঘাত করতে পারে না। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। সব থেকে জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েছে। আমরা তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। এটা কী ধরনের কথা।’
প্রধানমন্ত্রীর মনে রাখা উচিত ছিল, দেশটাতো সবার। সকলকে নিয়ে আলোচনা করে ফলাফল বের করা উচিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী হলের গেট ভেঙে মেয়েরা বের হওয়ার খবর পেলেন কিন্তু ছাত্রলীগের একনেত্রীর কর্মকান্ডের খবর তাকে কেউ দিল না। ভিসির বাসভবনে হামলার বিষয়টি  প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে এসেছে। এ প্রসঙ্গে সচেতন সমাজ কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। যেমন-
১. ঘটনার সময় পুরো এলাকাজুড়ে পুলিশ-গোয়েন্দারা ব্যাপক তৎপর থাকলেও কেউ বলতে পারছে না কেন কারা মুখোশ পড়ে হামলায় অংশগ্রহণ করলো।
২. এত সুরক্ষিত স্থানে হামলা ও ৪০ মিনিটের ওপরে তাণ্ডব চালিয়ে দুর্বৃত্তরা কিভাবে পার পেল? কিভাবে কোনপথে তারা ক্যাম্পাস থেকে বের হলো?
৩. ভিসি নিজেও বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এই হামলা চালিয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। যারা আন্দোলন করেছেন তারা স্পষ্টভাবে এই হামলা ও ভাঙচুরের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেছেন। সেখানে ভিসির বাসভবনে হামলার প্রশ্নই আসে না।
ভিসির বাসভবনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার ব্যাপারে শাহবাগ থানায় চারটি মামলা হয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কামরুল আহসান বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে একটি মামলাটি দায়ের করেছেন। শাহবাগ থানায় ১০ এপ্রিল ২০১৮ দায়েরকৃত এই মামলাটির নম্বর ২০। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, অজ্ঞাতনামা শতাধিক দুর্বৃত্ত এই হামলা চালিয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে ভিসির প্রাণনাশের চেষ্টা ও আনুমানিক দেড় কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে দুষ্কৃতকারীরা ওই রাতে দু’টি গাড়ি পুরোপুরি পুড়ে ফেলেছে এবং আরো দু’টি ভাঙচুর করেছে।
ভিসির বাসভবন সুরক্ষিত। স্বাভাবিক সময়েও তার বাসার সামনে পুলিশের একটি ভ্যান থাকে। যেখানে সব সময় অন্তত ২০ জন পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নিরাপত্তা রক্ষী মোতায়েন থাকে সার্বক্ষণিক। এ ছাড়া গোয়েন্দাদের নজরদারি থাকে। আর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভিসির বাসার নিরাপত্তা আরো জোরদার করা হয়েছিল। মোতায়েন ছিল গোয়েন্দা সদস্যরাও।
প্রশ্ন জেগেছে এর মধ্যেও কিভাবে দুষ্কৃতকারীরা ভিসির বাড়িতে প্রবেশ করল। ভিসির বাড়িতে এভাবে ৪০ মিনিটের বেশি সময় ধরে তাণ্ডব চললো, ভাঙচুর হলো, আগুন জ্বললো; কিন্তু কেউ টের পেল না! রাস্তার পাশেই বাসভবনটি। এত ঘটনা কারো চোখে পড়লো না! তা-ব চালানোর এত সময় পেল কোত্থেকে? হামলাকারীরা মুখোশ আর হেলমেট পরা ছিল কেন? অনেকেই বলেছেন, পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে? এমনকি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও অনেক সদস্য এই পরিকল্পনার কথা বলেছেন? তাহলে কারা এই পরিকল্পনা করেছিল?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ