ঢাকা, বুধবার 25 April 2018, ১২ বৈশাখ ১৪২৫, ৮ শাবান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পাখির বাসা

আখতার হামিদ খান : [পাখি আমাদের পরিবেশের পরম আত্মীয়। পাখির পাখা মেলে আকাশে উড়ে বেড়ানো আর কলকাকলি মুগ্ধ করে মানুষকে। সেই পাখির বাসা বানানোর শিল্পটিও এক অপার ভাস্কর্য শৈলী যেন।]
পাখিরা প্রকৃতিকে সাজিয়ে রাখে মধুর কলকাকলিতে। পাখি প্রকৃতির এক অপরূপ সৃষ্টি। পাখিরা যেমন বিচিত্র বর্ণের এবং বিচিত্র গোত্রের, তেমনি এদের আচার-আচরণ এবং বাসা নির্মাণের কৌশল এক অপার ভাস্কর্য শৈলী যেন। কিছু কিছু পাখির বাসার নির্মাণ শৈলী এতোই অপরূপ যে দেখে বিশ্বাস করাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায় একটা ছোট্ট পাখি সুনিপুণ কারিগরের মতো শুধু তার ঠোঁট দুটো ব্যবহার করে কিভাবে এতো সুন্দর এবং নিখুঁত বাসা বানাতে পারে।
পাখির বাসা বিজ্ঞানীদের নিকট এখনো এক অপার বিস্ময়। পাখিদের বাসা শুধু সৌন্দর্যের দিক থেকেই নয় বরং কোনো কোনো পাখির বাসা মানুষের রসনা তৃপ্তিতেই সহায়তা করেছে। সারাংগান সুইফট পাখির বাসার স্যুপে অত্যন্ত মূল্যবান এক উপাদেয় খাদ্যের স্থান দখল করে নিয়েছে।
ইন্দোচীন, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরয় দ্বীপগুলোতে উঁচু পাহাড়ের গুহায় পাহাড়ের পাথুরে দেয়ালে সালাংগান সুইফট পাখিরা বাসা বানায়। এরা সাধারণত: একটি গুহায় অনেক পাখি এক সাথে একটি কলোনী গেড়ে বসবাস করে। অন্য পাখিদের মতো এরা খড়কুটো দিয়ে বাসা বানায় না। এরাবাসা তৈরি করে মাকড়সার মতো নিজের মুখে লালা দিয়ে। এই শিল্পী পাখিরা যথেষ্ট বড় নয়, আকৃতিতে আমাদের অতি চেনা গাং শালিকের মতো। এদের গায়ের পালকের রং খয়েরি এবং বরফ সাদায় মিশেল। এদের বাসা গোলাকার এবং সাইজে পাঁচ থেকে ছয় মিটার। এরা বাসা তৈরির সময় দু’ পায়ের নখ দিয়ে পাহাড়ের খাড়া দেয়াল আঁকড়ে ধরে এবং পাথরের গায়ে নিজের মুখের আঠালো লালা ঢেলে দেয়। এভাবে লালা ঢেলে পুরু শুকনো বাসা তৈরি করে সালাংগান সুইফট। প্লাস্টিক সাদৃশ্য বাদামি রংয়ের বাসা তৈরিতে একটি পাখির সময় ব্যয় হয় প্রায় ৪০ দিন।
সালাংগান সুইফট
পাখিদের লালায় তৈরি বাসাগুলো দিয়ে যে স্যুপ হয় তা অত্যন্ত সুস্বাদু। এজন্য স্যুপ বাসাগুলোর মূল্য অত্যন্ত বেশি বলে এক শ্রেণীর বাসা সংগ্রহকারী লম্বা লম্বা মই এবং আকশী দিয়ে এসব বাসা সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। মানুষদের অত্যাচারে সালাংগান সুইফট পাখিদেরকে একটি প্রজনন মৌসুমে দু’থেকে তিনবার পর্যন্ত বাসা তৈরি করতে হয়। একাধিকবার বাসা নির্মাণের ক্ষেত্রে পাখিরা মুখের আঠালো লালা দিয়ে খড়কুটো জুড়ে খুব দ্রুত বাসা বানায় ডিম পাড়ার তাগিদে। সেজন্য পাখির বাসার স্যুপের ক্ষেত্রে প্রথম বাসাটি সবচাইতে মূল্যবান। এই সুস্বাদু বাসা তৈরির কারণে সুইফট পাখিদের বংশবৃদ্ধির হার অনেক কমে গেছে। কারণ বাসা সংগ্রহ করতে গিয়ে মানুষ এদের বাচ্চা ও ডিম নষ্ট করে ফেলছে ব্যাপক হারে।
মজার এবং নীল রঙে সাজানো আকর্ষণীয় বাসা বানায় অস্ট্রেলিয়ার বোয়ার বার্ড। এই জাতের পুরুষ পাখির রঙ উজ্জ্বল নীল এবং মেয়ে পাখিদের রঙ উজ্জ্বল হালকা সবুজ। এদের মধ্যে পুরুষ পাখিরা ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে ইংরেজি ইউ অক্ষরের ডালপালা দিয়ে সুন্দর বাসা বানায়।
দূর থেকে বাসাকে দেখলে মনে হবে ডালপালায় নিপুণ কারিগরের হাতে তৈরি একটি পর্ণকুিটর। এই বাসার চার পাশে নীল রঙের পাথর এবং ফুল দিয়ে সাজিয়ে বাসার পাশে সুরেলা গান গেয়ে মেয়ে পাখির অপেক্ষায় থাকে পুরুষ পাখি। মেয়ে পাখি এসে বাসাটি ঘুরে ফিরে দেখে। বাসা পছন্দ হলে বাসার কর্তার সাথে ভাব করে ঘর সংসার পাতে। অনেক ক্ষেত্রে বাসা পছন্দ না হলে মেয়ে পাখিটি উড়ে যায় অন্য সঙ্গীর সন্ধানে। আর পুরুষ পাখিটি বাসাটিকে আরো মনোরম সাজে সাজাতে তৎপর হয়ে ওঠে এবং আর এক সঙ্গীর অপেক্ষায় থাকে। সুন্দর বাসা তৈরির ক্ষেত্রেই শুধু বোয়ার বার্ডের সুখ্যাতি নয়, বরং এদের আর একটি মজার বৈশিষ্ট্য হলো নীল রং প্রীতি। নীল রঙের নুড়ি, পাথর ফুল থেকে শুরু করে সে যা কিছুই পাবে, তাই দিয়ে সাজিয়ে রাখবে বাসা।
বাবুই
বাবুই পাখি হচ্ছে বাসা বানানোর সুনিপুণ কারিগর। উঁচু তাল, খেজুর এবং সুপারি গাছের পাতা চিরে সেই পাতার সাথে নির্মাণ করে অপূর্ব শিল্পকর্মের এক ঝুলন্ত বাসা। দু’ঠোঁটে চিকন করে চিরে ঘন করে বুনে সে বাসাটি তৈরি করে। বাসার এক পাশে থাকে ডিমের স্থান, বাসায় ঢোকার মুখটা লম্বা এবং গোলাকার। বাসা যাতে ঝড় বাতাসে বেশি না দোলে সেজন্য বাবুই ঠোঁটে করে কাদা এনে বাসায় লেপে দেয়। এতে বাসা ভারী হয়, সেজন্য দোলে কম। মাঝখানে দাঁড়যুক্ত কিছু উন্মুক্ত বাসাও বানায় বাবুইরা, ওগুলো হচ্ছে পুরুষ বাবুইদের অবসর কাটানোর বৈঠকখানা। ছোট্ট পাখি বাবুই শুধু উন্নত মানের কারিগর নয়, বরং সৌখিন পাখি। আফ্রিকার বাবুই পাখিরা আবার আলাদাভাবে ঝুলন্ত বাসা তৈরি করে না। এদের বাসাগুলো থাকে একটার সাথে তার একটা জোড়া লাগানো। তবে প্রতিটি পরিবারের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা খোপ। এভাবে এক সাথে ৫০টা থেকে ১৫০টি পর্যন্ত বাবুই দম্পতি এক সাথে বাসা বানিয়ে থাকে। বাসাগুলো অনেকটা আমাদের পালিত কবুতরের খোপের মতো।
তবে এরা বাসা বানানোর সময় প্রতিটি দম্পতি নিজ নিজ কক্ষ বানিয়ে নেয়ার পর, তার সাতে অন্যজন বাসা বানাতে শুরু করে। আফ্রিকান বাবুইরাও বাসা বানায় দু’ ঠোঁটে পাতা চিরে পরিপাটি বুননে। এদের বাসা দেখলে মনে হয় গাছের ডালে কুঁড়েঘর। যাযাবার সোয়ালো পাখিরা বাসা বানায় নিরিবিলি সমুদ্রের কোনো কোরাল দ্বীপে। সেখানে মাটিতে বর্ণালী কোরাল দ্বীপের ভিজা মাটি জমিয়ে জমিয়ে উঁই ঢিবির মতো বাসা বানায়। পাশাপাশি অনেক বাসা দেখতে লাগে সুন্দর, যেন কুম্ভকারদের শিল্প কর্মে তৈরি সন মাটির উঁই ঢিবি। সোয়ালো পাখিরা ছোট হলেও শিল্পকর্মে যে কতোটা দক্ষতা বাসা না দেখলে বোঝার উপায় নেই।
টুনটুনি
ছোট্ট পাখি টুনটুনিকে বলা হয় জি পাখি। এরা দু’ ঠোঁটে অপূর্ব কৌশলে গাছের বড় বড় দুটো পাতা জুড়ে দিয়ে সেই দুই পাতার ফাঁকে নরম পালক এবং তুলো দিয়ে বাসা বানায়। পাতা দুটো জোড়ানোর কাজে এরা সবুজ এবং কিচন চেরা চেরা পাতা ব্যবহার করে। এছাড়া টুনটুনিরা বাসা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমন ঝোপ বা গাছ নির্বাচন করে যে গাছের পাশ দিয়ে গেলেও সহজে বোঝার উপায় থাকে না যে- ওই গাছের দু’টি পাতার আড়ালে রয়েছে টুনটুনির বাসা।
মৌটুসি
ফুলের মধুপানকারি পাখি মৌটুসি তৈরি করে অপূর্ব সুন্দর ঝুলন্ত বাসা। ডাল পাতার সূক্ষ্ম আঁশ দিয়ে ঠোঁট দিয়ে বুনে বুনে লেবুর আকৃতির বাসা বানায়। বাসাটি ঝুলে থাকে ঝোপের কোনো গাছের ডালে। বাসার ভেতর থাকে নরম পাখির পালক এবং তুলো।
ফ্লেমিংগো
ফ্লেমিংগো পাখি বাসা বানায় জলভূমিতে পানির সময়। পানি যেখানে কম সেখানে কাদা জমিয়ে জমিয়ে গোলাকার বাসা বানায়। পানি থেকে এক ফিট উঁচু এই বাসাগুলো। এই পাখিগুলো সাধারণত: এক সাথে কলোনী গড়ে তোলে তিনশ’ থেকে চারশ’ পাখি থাকে। মাটির বাসা বানায় ফ্লেমিংগো একটার গায়ের সাথে আর একটা গা লাগিয়ে। এদের কাদা মাটির বাসাগুলো পরিপাটি এবং যেন মাটি দিয়ে সুন্দর করে নিকানো।
মাছরাঙা
মাছরাঙা, গাহ শালিকসহ অনেক পাখি মাটিতে গর্ত করে বাসা বানায়। এরা ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে খাড়া নদী বা পাহাড়ের গায়ে গর্ত করে দু’ থেকে আড়াই ফিট লম্বা। গর্তের মুখটা সরু হলেও গোড়াটা থাকে প্রশস্ত এবং পরিচ্ছন্ন। আবার কাঠঠোকরা, ধনেশ, টিয়ে, বানিয়ার বউ, নীলকণ্ঠ পাখিসহ অনেক পাখি আছে যারা গাছের গায়ে ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে গর্ত করে সেখানে বাসা করে। এক্ষেত্রেও গর্তের মুখটা ছোট হলেও ভেতরটা প্রশস্ত। পেঁচা ও এ জাতের অনেক পাখি গাছের কোঠরে বাসা বানালেও এরা নিজেরা কোনো পরিশ্রম করে গর্ত করে না। বরং গাছের দু’ ডালের ফাঁকে বা মরা ডালে স্বাভাবিকভাবে তৈরি গর্তে ওরা খড় কুটো এনে বাসা বানায়।
এছাড়া ফিঙে, ঘুঘু, দোয়েল, শাকিল, পাপিয়াসহ অন্য যে সব পাখি গাছের ডালে খড়কুটোয় উন্মুক্ত গোলাকার বাসা বানায় সেগুলোও যথেষ্ট শিল্পসম্মত এবং পরিপাটি। ছোট ছোট ডালপালা দিয়ে তৈরি বাসাগুলো দেখতেও কম আকর্ষণীয় নয়।
পাখি বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, সাধারণত: ছোটখাটো সুন্দর পাখিরা বাসা বানানোর ক্ষেত্রে যত্নশীল এবং বাসাগুলোও শিল্প সম্মত। আবার বড়ো এবং শিকারি পাখিরা বাসা তৈরির ক্ষেত্রে যথেষ্ট যত্নবান নয়। এদের বাসাগুলো বড় বড় ডালপালায় অগোছালোভাবে তৈরি। বাজ, ঈগল, শকুন, কাকসহ এ জাতীয় পাখিরা বাসা তৈরি করে তাড়াহুড়ো করে। তবু দু’টি ঠোঁট দিয়ে বাসা তৈরির এই দক্ষতা এটা নেহায়েত কম নয়। কেউ ওদের শিখিয়ে দেয়নি বাসা তৈরির এই শৈল্পিক দক্ষতা, ওরা তা পেয়েছে সৃষ্টিকর্তা থেকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ